ঢাকা ০১:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘প্যান্ডোরার বাক্স’ বিশ্ব অর্থনীতির আড়ালে থাকা নথি ফাঁস করেছে, সারা বিশ্বে আলোচনা

বিশ্ব অর্ধেকেরও বেশি সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে সারা বিশ্বের গুটিকয়েক মানুষ। এই তথ্যগুলো অনেক দিন ধরে সংবাদমাধ্যমে আসছে। এর আগে পানামা পেপারস ফাঁসের ঘটনায় সেটি লক্ষ করা গেছে। তবে, এবার প্যান্ডোরা পেপারস বিশ্ব অর্থনীতির আড়ালে থাকা এমন কিছু নথি ফাঁস করেছে, যা ইতিমধ্যে সারা বিশ্বে আলোচনা তৈরি করেছে। দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও বৈশ্বিক কর ফাঁকি দেওয়ার ঘটনাগুলোর পাশাপাশি এবার সবচেয়ে বড় যে ঘটনাটি ফাঁস হয়েছে ধনী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কীভাবে বৈধভাবেই নানা গোপন কোম্পানি গঠন করেছেন তারই তথ্য।

‘ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস’ (আইসিআইজে) প্রকাশ করেছে বিশ্বের প্রভাবশালীদের গোপন সম্পদের খবর। অর্থনীতির এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ‘প্যান্ডোরা পেপার্স’ এ দেখা যাচ্ছে- সারা বিশ্বের ৩৫ সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রনেতা, ৯৫টিরও বেশি দেশের ৩০০ সরকারি কর্মকর্তা, সেনা কর্মকর্তা, শ খানেক ব্যবসায়ী নেতা, রক তারকা, বিনোদন জগতের তারকা বিলিয়নিয়ারের গোপন সম্পদের খবর।

৯৫ হাজার অফশোর ফার্মের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ নথি নিয়ে সাড়ে ছয়শর বেশি সাংবাদিকের পরিশ্রমে খুলেছে এই প্যান্ডোরার বাক্স। প্যান্ডোরা পেপার্সের ১ কোটি ২০ লাখ নথি ধারণে লাগছে ২ দশমিক ৯ টেরাবাইট ডেটা। এটিই গোপন নথি ফাঁসের এখন অবধি সবচেয়ে বড় ঘটনা।

ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, বেলাইজ, পানামা, সাইপ্রাসের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ১৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

গ্রিক উপকথার একটি চরিত্র প্যান্ডোরা। প্যান্ডোরার প্রেমে পড়ে যান এপিমেথেউস। এপিমেথেউস-প্যান্ডোরার বিয়েতে প্যান্ডোরাকে দেবরাজ জিউস উপহার দেন এক অপূর্ব বাক্স কিন্তু নিষেধ করে দেন- এটি খুলতে। যত দিন এটি বন্ধ থাকবে তত দিনই সুখে-শান্তিতে এপিমেথেউস ঘর করতে পারবে প্যান্ডোরা এটাও বলেন তিনি। দেবরাজ জিউসের নিষেধাজ্ঞা পরাস্ত হয় দেবরাণী হেরার দেয়া উপহার কৌতূহল এর কাছে। বিয়ের উপহার একবার দেখতে প্যান্ডোরা বাক্সটি খোলামাত্র বাক্সবন্দী রোগ-জরা-হিংসা-দ্বেষ-লোভ-মিথ্যা ইত্যাদি সব স্বর্গীয় নিচুতা ছড়িয়ে পরে মানুষের পৃথিবীতে, প্যান্ডোরা যখন বাক্সটা বন্ধ করতে পারে তখন শুধু আশা রয়ে যায় সেই বাক্সে। এভাবেই পৃথিবীর প্রথম ও একমাত্র সর্বগুণে গুণান্বিত স্বর্গীয় মানবী পৃথিবীর জন্য নিয়ে আসে নারকীয় দুর্ভোগ।

সেই দেবীর গোপন বাক্সের মতোই প্যান্ডোরা পেপার্সে এক এক করে এবার বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে বৈশ্বিক ধনকুবেরদের গোপন অর্থনৈতিক নথি।

বিবিসি প্যানোরামা, ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান এবং আরো কিছু মিডিয়া অংশীদার মিলে বিশ্বের ১৪টি কোম্পানির দলিলপত্র প্রকাশের পর পরই বিশ্বের বড় বড় নেতা, রাজনীতিবিদ ও ধনকুবেরদের গোপন সম্পদ ও লেনদেনের তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

নথিতে দেখা যাচ্ছে মোনাকোয় ভ্লাদিমির পুতিনের গোপন সম্পদের খবর, জর্ডানের বাদশাহর গোপনে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ৭ কোটি পাউন্ডের সম্পদ, টনি ব্লেয়ারের কর ফাঁকি দিয়ে অফিস ভবন কেনা, চেক প্রধানমন্ত্রীর ফ্রান্সের দক্ষিণে ১ কোটি ২০ লাখ পাউন্ডের দুটো ভিলা কেনার ক্ষেত্রে অফশোর কোম্পানিকে কাজে লাগানো। এছাড়া আজারবাইজানের ক্ষমতাসীন অলিয়েভ পরিবারের অর্থ লুকাতে একটি বিশাল অফশোর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এই পরিবার এবং তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা যুক্তরাজ্যে ৪০ কোটি পাউন্ডের সম্পত্তি কেনাবেচার জড়িত থাকার তথ্যও উঠে এসেছে।

এছাড়াও অন্যান্যদের মধ্যে আছেন কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াত্তা ও তার পরিবারের ছয় সদস্য, যাদের অফশোর কোম্পানি আছে। গোপন সম্পদ এবং লেনদেনের তালিকায় আরও আছেন সাইপ্রাস এবং ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট।

উল্লেখ্য, এর আগে পানামা পেপার্স বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অর্থ পাচারের চিত্র সামনে এসেছিল। ২০১৬ সালে যখন পানামা পেপার্স প্রকাশ পায় তখনই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল এটি ‘গল্পের অর্ধেকটা’ মাত্র।  সেখানেও উঠে এসেছিল বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়া, সেই অর্থ পাচার করা কিংবা অবৈধ আয়ের টাকায় ক্ষমতার মালিক হওয়ার ঘটনা। বিশ্বের প্রায় দেড় শ রাজনীতিবিদের গোপন তথ্য ছিল সেখানে, যাদের ৭২ জন ছিলেন বিভিন্ন সময়ের রাষ্ট্রনায়ক। পানামা পেপার্স প্রকাশের পরপরই আয়ারল্যান্ড ও পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেকায়দায় পড়েছিলেন।

পানামা পেপার্সে একটি কোম্পানির ১ কোটি ১৫ লাখ নথি ছিল।

Tag :

‘প্যান্ডোরার বাক্স’ বিশ্ব অর্থনীতির আড়ালে থাকা নথি ফাঁস করেছে, সারা বিশ্বে আলোচনা

Update Time : ০৬:১১:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ অক্টোবর ২০২১

বিশ্ব অর্ধেকেরও বেশি সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে সারা বিশ্বের গুটিকয়েক মানুষ। এই তথ্যগুলো অনেক দিন ধরে সংবাদমাধ্যমে আসছে। এর আগে পানামা পেপারস ফাঁসের ঘটনায় সেটি লক্ষ করা গেছে। তবে, এবার প্যান্ডোরা পেপারস বিশ্ব অর্থনীতির আড়ালে থাকা এমন কিছু নথি ফাঁস করেছে, যা ইতিমধ্যে সারা বিশ্বে আলোচনা তৈরি করেছে। দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও বৈশ্বিক কর ফাঁকি দেওয়ার ঘটনাগুলোর পাশাপাশি এবার সবচেয়ে বড় যে ঘটনাটি ফাঁস হয়েছে ধনী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কীভাবে বৈধভাবেই নানা গোপন কোম্পানি গঠন করেছেন তারই তথ্য।

‘ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস’ (আইসিআইজে) প্রকাশ করেছে বিশ্বের প্রভাবশালীদের গোপন সম্পদের খবর। অর্থনীতির এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ‘প্যান্ডোরা পেপার্স’ এ দেখা যাচ্ছে- সারা বিশ্বের ৩৫ সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রনেতা, ৯৫টিরও বেশি দেশের ৩০০ সরকারি কর্মকর্তা, সেনা কর্মকর্তা, শ খানেক ব্যবসায়ী নেতা, রক তারকা, বিনোদন জগতের তারকা বিলিয়নিয়ারের গোপন সম্পদের খবর।

৯৫ হাজার অফশোর ফার্মের প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ নথি নিয়ে সাড়ে ছয়শর বেশি সাংবাদিকের পরিশ্রমে খুলেছে এই প্যান্ডোরার বাক্স। প্যান্ডোরা পেপার্সের ১ কোটি ২০ লাখ নথি ধারণে লাগছে ২ দশমিক ৯ টেরাবাইট ডেটা। এটিই গোপন নথি ফাঁসের এখন অবধি সবচেয়ে বড় ঘটনা।

ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, বেলাইজ, পানামা, সাইপ্রাসের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ১৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

গ্রিক উপকথার একটি চরিত্র প্যান্ডোরা। প্যান্ডোরার প্রেমে পড়ে যান এপিমেথেউস। এপিমেথেউস-প্যান্ডোরার বিয়েতে প্যান্ডোরাকে দেবরাজ জিউস উপহার দেন এক অপূর্ব বাক্স কিন্তু নিষেধ করে দেন- এটি খুলতে। যত দিন এটি বন্ধ থাকবে তত দিনই সুখে-শান্তিতে এপিমেথেউস ঘর করতে পারবে প্যান্ডোরা এটাও বলেন তিনি। দেবরাজ জিউসের নিষেধাজ্ঞা পরাস্ত হয় দেবরাণী হেরার দেয়া উপহার কৌতূহল এর কাছে। বিয়ের উপহার একবার দেখতে প্যান্ডোরা বাক্সটি খোলামাত্র বাক্সবন্দী রোগ-জরা-হিংসা-দ্বেষ-লোভ-মিথ্যা ইত্যাদি সব স্বর্গীয় নিচুতা ছড়িয়ে পরে মানুষের পৃথিবীতে, প্যান্ডোরা যখন বাক্সটা বন্ধ করতে পারে তখন শুধু আশা রয়ে যায় সেই বাক্সে। এভাবেই পৃথিবীর প্রথম ও একমাত্র সর্বগুণে গুণান্বিত স্বর্গীয় মানবী পৃথিবীর জন্য নিয়ে আসে নারকীয় দুর্ভোগ।

সেই দেবীর গোপন বাক্সের মতোই প্যান্ডোরা পেপার্সে এক এক করে এবার বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে বৈশ্বিক ধনকুবেরদের গোপন অর্থনৈতিক নথি।

বিবিসি প্যানোরামা, ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান এবং আরো কিছু মিডিয়া অংশীদার মিলে বিশ্বের ১৪টি কোম্পানির দলিলপত্র প্রকাশের পর পরই বিশ্বের বড় বড় নেতা, রাজনীতিবিদ ও ধনকুবেরদের গোপন সম্পদ ও লেনদেনের তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

নথিতে দেখা যাচ্ছে মোনাকোয় ভ্লাদিমির পুতিনের গোপন সম্পদের খবর, জর্ডানের বাদশাহর গোপনে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ৭ কোটি পাউন্ডের সম্পদ, টনি ব্লেয়ারের কর ফাঁকি দিয়ে অফিস ভবন কেনা, চেক প্রধানমন্ত্রীর ফ্রান্সের দক্ষিণে ১ কোটি ২০ লাখ পাউন্ডের দুটো ভিলা কেনার ক্ষেত্রে অফশোর কোম্পানিকে কাজে লাগানো। এছাড়া আজারবাইজানের ক্ষমতাসীন অলিয়েভ পরিবারের অর্থ লুকাতে একটি বিশাল অফশোর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এই পরিবার এবং তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা যুক্তরাজ্যে ৪০ কোটি পাউন্ডের সম্পত্তি কেনাবেচার জড়িত থাকার তথ্যও উঠে এসেছে।

এছাড়াও অন্যান্যদের মধ্যে আছেন কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াত্তা ও তার পরিবারের ছয় সদস্য, যাদের অফশোর কোম্পানি আছে। গোপন সম্পদ এবং লেনদেনের তালিকায় আরও আছেন সাইপ্রাস এবং ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট।

উল্লেখ্য, এর আগে পানামা পেপার্স বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অর্থ পাচারের চিত্র সামনে এসেছিল। ২০১৬ সালে যখন পানামা পেপার্স প্রকাশ পায় তখনই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল এটি ‘গল্পের অর্ধেকটা’ মাত্র।  সেখানেও উঠে এসেছিল বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়া, সেই অর্থ পাচার করা কিংবা অবৈধ আয়ের টাকায় ক্ষমতার মালিক হওয়ার ঘটনা। বিশ্বের প্রায় দেড় শ রাজনীতিবিদের গোপন তথ্য ছিল সেখানে, যাদের ৭২ জন ছিলেন বিভিন্ন সময়ের রাষ্ট্রনায়ক। পানামা পেপার্স প্রকাশের পরপরই আয়ারল্যান্ড ও পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেকায়দায় পড়েছিলেন।

পানামা পেপার্সে একটি কোম্পানির ১ কোটি ১৫ লাখ নথি ছিল।