চিকিৎসা পেতে প্রথমে হাসপাতালের বাইরে লাইন দিতে হয়েছিল। মৃত্যুর সঙ্গে যখন পাঞ্জা লড়ছেন, তখন হাসপাতালের বাইরে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের পরিজনরা। মৃত্যুর পরেও সেই লাইন থেকে নিস্তার পেলেন না দিল্লিতে করোনার কবলে প্রাণ হারানোরা। চিতায় ওঠার জন্যও মাচায় শুয়ে থাকা অবস্থাতেই শ্মশানে লাইন দিতে হল তাদের। অতিমারিতে বিধ্বস্ত রাজধানীতে এবার এমন দৃশ্যই সামনে এল।

দেহ দাহ করার জায়গার অভাব দেখা দিয়েছে শ্মশানঘাটগুলিতে। এরকম পরিস্থিতিতে উঁচু টিনের ছাদের নীচে, ৫০টি চিতায় দেহ দাহ করা হয় মঙ্গলবার। ধোঁয়া সহ গরম বাতাস, সূক্ষ্ম ছাই ও মৃতদেহ পোড়ার গন্ধের মধ্যে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে প্রিয়জনের শেষযাত্রার সাক্ষী হল পরিবার।
শ্মশানে ছড়িয়ে রয়েছে মৃতদেহ মেঝেতে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকা মৃতদেহ এবং শ্মশানের বাইরে দেহ নিয়ে অপেক্ষারত সার সার গাড়ি এবং তার ভেতরে থাকা পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন যে তাঁদের ১৬-২০ ঘণ্টা করে অপেক্ষা করতে হচ্ছে শেষকৃত্যের জন্য। করোনার দ্বিতীয় ওয়েভের মহামারি ‘দিলওয়ালো কা শহর’ দিল্লির আত্মা ও অনুপ্রেরণাকে ঝাঁকিয়ে দিয়েছে। শ্মশানে উপচে পড়া কোভিড মৃতদেহ গোটা রাজধানীর বুকে অন্য এক শোকবার্তা বহন করছে। ম্যাসি ফিউনেরালসের কর্ণধার বিনীতা ম্যাসি বলেন, ‘আমার জীবনে আমি এত খারাপ পরিস্থিতি দেখিনি। মানুষ তাঁর প্রিয়জনের দেহ নিয়ে চলেছে, প্রায় দিল্লির সব শ্মশানে মৃতদেহের ভিড়।’

একমাসে মৃত্যু তিন হাজারের বেশি সরকারিভাবে জানা গিয়েছে যে এই এপ্রিল মাসে দিল্লিতে মৃত্যু হয়েছে ৩,৬০১ জনের, যার মধ্যে গত সাতদিনে ২,২৬৭ জন মারা গিয়েছেন। দ্বিতীয় ওয়েভের আগে ফেব্রুয়ারিতে মৃত্যু হয়েছিল ৫৭ জনের এবং মার্চে ১১৭ জন। দিল্লির অবস্থা ক্রমশঃ ভয়াবহ হচ্ছে। আচমকা প্রিয়জনকে হারানোর শোক এক্ষেত্রে কিন্তু যথেষ্ট নয়, সেই প্রিয়জনকে সঠিকভাবে বিদায় না জানানোর আক্ষেপ শোকের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে। পরিবার শুধু শ্মশানে দেহ রেখে ফিরে যাচ্ছে। বাবা, মা, ছেলে-মেয়ে, স্ত্রীয়ের মৃত্যুর পর তাঁদের দেহ মৃতদেহ বহনকারী গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্সে করে শ্মশানে নিয়ে যাওযা হচ্ছে আর তারপর দীর্ঘ অপেক্ষা দেহ দাহ করার। কোভিডে আক্রান্ত না হয়ে প্রিয়জনের মৃত্যু কিছুটা স্বস্তি দিলেও দিল্লিতে যে মহামারির প্রবাহ চলছে তাতে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ অসুখে ভুগে মৃতদের পরিবারকেও ভুগতে হচ্ছে।
দিল্লির সব শ্মশানে মৃতদেহের ভিড় শ্মশানের বাইরে অ্যাম্বুলেন্স ও গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা একেবারে ভর্তি, তার ওপর ক্রমাগত হর্নের শব্দে প্রাণ ওষ্ঠাগত শোকার্ত পরিবারগুলির। ভেতরে শুকনো কাঠের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, একসঙ্গে জ্বলছে ৫০টি চিতা। তার ওপর শ্মশান কর্মীদের রূঢ় ব্যবহার শোকাহত পরিবারের সদস্যদের আরও হতাশ করে তুলছে। এক তরুণ কর্মীকে বলতে শোনা গেল, ‘নিজের মৃতদেহ তোল আর ওদিকে লাইনে দাঁড়িয়ে যাও।’ এক ৪০ বছরের মহিলা কোভিডে তাঁর বাবাকে হারিয়েছেন। বাবার শেষকৃত্য করতে এসে শ্মশান কর্মী তাঁকে চন্দনকাঠ দিতে বলেছিলেন মৃতদেহের ওপর। কিন্তু ওই মহিলা কোনটা নাভি বা বুক বুঝতে পারছিলেন না। দেহটি তখনও সাদা বস্তায় ভরা ছিল এবং সেটি না খুলেই চিতায় দেওয়া হয় দেহ। কাঁপা কাঁপা হাতে চন্দনকাঠ ধরে তিনি চিতার কাছে এগিয়ে যান। তিনি বলেন, ‘আমি আমার বাবার মুখটাও দেখতে পারিনি।’
দেহ দাহ করতে ৯০ মিনিট সময় সুভাষ নগর শ্মশানে সোমবার বহু দেহ দাহ করতে এসেও পরিবারের সদস্যরা ফিরে যান। কারণ সেই সময় কোনও জায়গাই দাহকাজ করার মতো খালি ছিল না। অন্যদিকে মধ্য দিল্লির সিএনজি শ্মশানে একবারে মাত্র ২টি দেহ দাহ করার ব্যবস্থা রয়েছে। সিএনজি চেম্বারে এক-একটা দেহ দাহ করতে ৯০ মিনিট করে সময় লাগে আর ওই শ্মশানের বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল ২৪ দেহ।
অনলাইন ডেস্ক 






















