আমরা যারা কৃষিকাজ করি, বা কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত, আমরা শুধু লাভের আশাতেই কৃষিকাজ করি । সবাই মনে করেন, কৃষিকাজ অনেক সহজ এবং লাভজনক ব্যবসা । খরচ কম, তেমন কিছু প্রয়োজন ও হয় না । কিন্তু এই ধারনা ভুল । কৃষিতে ভাল ফসল উৎপাদন করতে হলে বা উৎপাদন বাড়াতে হলে প্রয়োজন সঠিক এবং পরিপুর্ন জ্ঞান, বৈজ্ঞানিক এবং আধুনিক উপায়ে চাষাবাদ/উৎপাদন পদ্ধতি, এবং সঠিক এবং সময়মত পরিচর্যা । শুধু বীজ, জৈব কীটনাশক প্রয়োগ করলেই উৎপাদন বা ফলন ভাল হয় না, আরও বাড়তি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয় । সবার আগে প্রয়োজন মাটির যত্ন । কোন মাটিতে,কি ফসল চাষাবাদ করতে হয়, কি পরিমান জৈব এবং রাসায়নিক উপাদান মাটিতে বিদ্যমান, মাটিতে কোন উপাদান পরিমানে কম- সে বিষয়ে সঠিক জ্ঞান থাকা চাই । আমরা অনেকেই জানিনা, মাটির পরীক্ষার জন্য প্রত্যেকটি উপজেলায়, সরকারীভাবে মৃত্তিকা গবেষনা প্রতিস্ঠান রয়েছে । আমরা সেখানে এই সেবা গ্রহন করিনা । কিন্ত, ফসলের ফলন/উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য, মাটির গুনগত মান অনেকখানি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে ।
মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি এবং এর গুনগত মান নিয়ন্ত্রনের জন্য আমরা নিজেরাই ঘরোয়া উপায়ে কিছু ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারি । এরজন্য মাটির pH সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান প্রয়োজন । আসুন, মাটির pH সম্পর্কে আমরা জেনে নেই ।
মাটির pH কম বেশি হওয়ার কারনঃ
মাটির pH হল মাটির অম্লতা বা ক্ষারত্বের মাপকাঠি । মাটির আদর্শ মান সাধারণত ৬.০ থেকে ৭.০ (সামান্য অম্লীয় থেকে নিরপেক্ষ) হওয়া ফসলের জন্য সবচেয়ে ভালো । যখন এই মান কমে যায় (৫.৫ এর নিচে) মাটি অম্লীয় বা টক হয়, আর যখন বেড়ে যায় (৭.৫ এর উপরে) মাটি ক্ষারীয় বা লোনা হয়ে পড়ে ।

একজন আধুনিক কৃষক হিসেবে মাটির কম-বেশি হওয়ার প্রধান কারণগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করছিঃ
মাটির pH কমে যাওয়ার কারনঃ (মাটি অম্লীয় হওয়া)
১. অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহারঃ নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ সার, বিশেষ করে ইউরিয়া এবং অ্যামোনিয়াম সালফেট দীর্ঘদিন ধরে অধিক মাত্রায় ব্যবহার করলে মাটিতে অম্লতা বৃদ্ধি পায় । এই সারগুলো ভেঙে মাটিতে হাইড্রোজেন আয়ন মুক্ত করে ।
২. বৃষ্টিপাত ও চুইয়ে পড়া (Leaching)ঃ অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে মাটির ক্ষারীয় উপাদান যেমন—ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং পটাশিয়াম মাটির গভীরে চলে যায় । ফলে উপরের স্তরে হাইড্রোজেন ও অ্যালুমিনিয়ামের ঘনত্ব বেড়ে মাটি অম্লীয় হয় ।
৩. জৈব পদার্থের পচনঃ মাটিতে যখন জৈব পদার্থ বা কাঁচা গোবর পচে, তখন বিভিন্ন ধরনের জৈব অ্যাসিড (Organic Acids) এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয় । এটি মাটির অম্লীয় মান সাময়িকভাবে কমিয়ে দেয় ।
৪. মাটির প্রকৃতিঃ সাধারনত লাল মাটি বা পাহাড়ি অঞ্চলের মাটিতে প্রাকৃতিকভাবেই আয়রন ও অ্যালুমিনিয়াম বেশি থাকে, যার ফলে এসব মাটির অম্লীয় সবসময় কম থাকে।
এবার আসুন, আমরা জেনে নেই, কেন মাটির pH এর মান বেড়ে যায়❓
মাটির pH বেড়ে যাওয়ার কারণ (মাটি ক্ষারীয় হওয়া)
১. সেচের পানির মানঃ যদি সেচের পানিতে ক্যালসিয়াম বা ম্যাগনেসিয়াম কার্বনেটের পরিমাণ বেশি থাকে (ক্ষর পানি), তবে বারবার সেচ দেওয়ার ফলে মাটিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং মান ৮.০ ছাড়িয়ে যেতে পারে ।
২. চুনের অতিরিক্ত ব্যবহারঃ মাটির অম্লতা দূর করার জন্য অনেক সময় চুন ব্যবহার করা হয় । মাটিতে কি চুন, কতরুকু পরিমান ব্যবহার করতে হয়, সে বিষয়ে সঠিকভাবে না জেনেই কৃষকেরা অন্যের ভুল পরামর্শ নিয়ে মাটিতে চুন প্রয়োগ করে । কৃষকের সঠিকভাবে জানা উচিত, পরিমাণের চেয়ে বেশি চুন প্রয়োগ করলে, মাটি দ্রুত ক্ষারীয় হয়ে পড়ে ।
৩. লবণাক্ততা ও আবহাওয়াঃ উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশ করলে মাটিতে সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যায় । শুষ্ক আবহাওয়ায় মাটি থেকে পানি বাষ্পীভূত হয়ে গেলে (সোডিয়াম কার্বনেট) লবণ উপরে জমে মাটি ক্ষারীয় করে তোলে ।
৪. মূল শিলা বা প্যারেন্ট ম্যাটেরিয়ালঃ যদি মাটির আদি শিলা চুনাপাথর সমৃদ্ধ হয়, তবে সেই অঞ্চলের মাটি প্রাকৃতিকভাবেই ক্ষারীয় প্রকৃতির হয়ে থাকে ।
এবার আমরা জেনে নেই, মাটির pH এর মান পরিবর্তনের প্রভাব ও সমাধানঃ
১. pH কমে গেলে (অম্লীয় মাটি)— ফসফরাস ও ক্যালসিয়ামের অভাব দেখা দেয় এবং আয়রন ও অ্যালুমিনিয়ামের বিষক্রিয়া ঘটে ।
সমাধানঃ ডলো চুন বা কৃষি চুন ব্যবহার করা ।
২. pH বেড়ে গেলে (ক্ষারীয় মাটি)— আয়রন, জিঙ্ক, কপার ও বোরন সারের কার্যকারিতা কমে যায় ।
সমাধানঃ জিপসাম সার, সালফার বা প্রচুর পরিমাণে পচা জৈব সার ব্যবহার করা ।
আপনি যদি বুঝতে না পারেন আপনার মাটির pH কত, তবে খুব সহজে একটি লিটমাস পেপার বা ডিজিটাল pH মিটার দিয়ে পরীক্ষা করে নিতে পারেন । প্রতি বছর মাটি পরীক্ষা করা একজন আদর্শ কৃষকের প্রধান গুণ ।
ফয়সাল হাসান 









