আইরিশরা এই গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শালগম ও অন্যান্য সবজিতে মুখ খোদাই করে আলো রাখত। পরবর্তী সময়ে আয়ারল্যান্ডের অভিবাসীরা আমেরিকায় গিয়ে দেখতে পান, সেখানে কুমড়ো সহজলভ্য এবং আকারেও বড়। ফলে শালগমের পরিবর্তে কুমড়োই হয়ে ওঠে হ্যালোইনের প্রধান প্রতীক।
উনিশ শতকে ইউরোপ থেকে বিপুলসংখ্যক আইরিশ ও স্কটিশ অভিবাসী উত্তর আমেরিকায় পাড়ি জমান। তাদের সঙ্গে আমেরিকায় পৌঁছে যায় হ্যালোইনের নানা ঐতিহ্য। ধীরে ধীরে উৎসবটি ধর্মীয় ও লোকজ আচার থেকে সামাজিক আনন্দ-উৎসবে রূপ নিতে শুরু করে। বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রে হ্যালোইন ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। শিশুদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে মিষ্টি সংগ্রহের প্রথা ‘ট্রিক অর ট্রিট’ (Trick-or-Treat) বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শিশুরা ভূত, ডাইনি, ভ্যাম্পায়ার, সুপারহিরো কিংবা বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্রের পোশাক পরে প্রতিবেশীদের দরজায় কড়া নাড়ে। মিষ্টি না দিলে মজার ছলে দুষ্টুমি করার হুমকি দেওয়াই এই প্রথার নামের মধ্যে নিহিত।
বর্তমানে হ্যালোইন শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক উৎসব। হ্যালোইনে ভূত, কঙ্কাল, ডাইনি, ভ্যাম্পায়ার কিংবা দানবের পোশাক পরার ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রাচীন সামহেইন উৎসবের যোগ রয়েছে। কেল্টিকদের বিশ্বাস ছিল, এ সময় অশুভ আত্মারা পৃথিবীতে বিচরণ করে। তাই মানুষ নিজেদের পরিচয় আড়াল করতে ভীতিকর পোশাক ও মুখোশ ব্যবহার করত। উদ্দেশ্য ছিল আত্মাদের বিভ্রান্ত করা এবং তাদের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া। সময়ের পরিবর্তনে সেই ধর্মীয় ও লোকবিশ্বাসভিত্তিক প্রথা পরিণত হয়েছে বিনোদনের অংশে। এখন হ্যালোইনে শুধু ভৌতিক চরিত্র নয়, জনপ্রিয় সিনেমা, কার্টুন, কমিকস এবং ইতিহাসের নানা চরিত্রের পোশাকেও মানুষ সেজে ওঠে।
একুশ শতকে হ্যালোইন একটি বৈশ্বিক বিনোদন ও বাণিজ্যিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এ উপলক্ষে আয়োজন করা হয় থিম পার্টি, কস্টিউম প্রতিযোগিতা, ভৌতিক বাড়ি, কুমড়ো খোদাইয়ের অনুষ্ঠান এবং বিশেষ চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ডও এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বিশেষ পণ্য, পোশাক, সাজসজ্জার সামগ্রী ও মিষ্টি বাজারজাত করে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের কাছে হ্যালোইন আনন্দ, কল্পনা ও সৃজনশীলতার এক অনন্য উপলক্ষ। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্কদের কাছেও এটি বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং ভিন্নধর্মী সাজে উৎসব উদ্যাপনের সুযোগ।
বাংলাদেশে হ্যালোইন এখনো মূলধারার কোনো ঐতিহ্যবাহী উৎসব নয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক বিনোদনজগৎ এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রভাবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এর পরিচিতি বাড়ছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও বিনোদনকেন্দ্রে হ্যালোইন উপলক্ষে বিশেষ সাজসজ্জা, কস্টিউম পার্টি ও থিমভিত্তিক আয়োজন দেখা যায়। বিশেষ করে তরুণদের কাছে হ্যালোইন হয়ে উঠছে ছবি তোলা, সৃজনশীল পোশাক তৈরি এবং বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির একটি উপলক্ষ।
- কেল্টিক উৎসব: প্রায় ২,০০০ বছর আগে বর্তমান আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও উত্তর ফ্রান্সে বসবাসকারী কেল্টিক জাতি ১ নভেম্বর তাদের নতুন বছর বা 'সামহেইন' (Samhain) উৎসব পালন করত। তারা এই দিনটিকে গ্রীষ্মের শেষ এবং অন্ধকার শীতের শুরু বলে মনে করত।
- প্রেতাত্মার বিশ্বাস: কেল্টিকদের ধারণা ছিল, ৩১ অক্টোবর রাতে জীবিত ও মৃত জগতের মধ্যকার সীমানা রেখা মুছে যায়। এ রাতে মৃত আত্মারা পৃথিবীতে ফিরে আসে এবং ফসলের ক্ষতি বা নানা অনর্থ ঘটাতে পারে।
- ছদ্মবেশ ও আগুন: অশুভ আত্মাদের হাত থেকে বাঁচতে ও তাদের বিভ্রান্ত করতে কেল্টিকরা পশুর চামড়া, ভূতের মুখোশ পরত এবং বড় বড় আগুনের কুণ্ডলী (Bonfire) জ্বালাত।
- অল হ্যালোস ইভ: অষ্টম শতাব্দীতে পোপ গ্রেগরি ৩, ১ নভেম্বরকে 'অল সেন্টস ডে' (All Saints' Day) বা সমস্ত সাধু দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এই সাধু দিবসের আগের সন্ধ্যা বা ৩১ অক্টোবরকে বলা হতো 'অল হ্যালোজ ইভ' (All Hallows' Eve)।
- আইরিশ অভিবাসী: ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে (বিশেষ করে ১৮৪৬ সালের দিকে আয়ারল্যান্ডের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময়) লাখ লাখ আইরিশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং তাঁদের সাথে হ্যালোইনের লোকাচার ও ঐতিহ্যও সেখানে নিয়ে যান।
- কুমড়ো বা জ্যাক-ও-লণ্ঠন: প্রাচীন যুক্তরাজ্যে শালগম বা আলু খোদাই করে ভেতরে আলো জ্বালানো হতো। আমেরিকায় আসার পর মিষ্টি কুমড়ো সহজলভ্য হওয়ায় তা কুমড়ো খোদাই করে 'জ্যাক-ও-লণ্ঠন' (Jack-o'-lantern) বানানোর রীতি চালু হয়।
- ট্রিক অর ট্রিট ও উৎসব: বর্তমানে হ্যালোইন মূলত ৩১ অক্টোবর রাতে মুখোশ পরা, শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চকলেট বা ক্যান্ডি চাওয়ার ("ট্রিক অর ট্রিট"), কুমড়ো খোদাই এবং ভূতুড়ে পার্টি করার একটি সর্বজনীন ও আনন্দঘন উৎসবে রূপ নিয়েছে।
হ্যালোইনকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এটি শুধুই ভূত-প্রেত আর ভয়ংকর সাজসজ্জার উৎসব। কিন্তু এর ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। এর সঙ্গে মিশে আছে প্রাচীন মানুষের প্রকৃতিনির্ভর জীবন, ঋতু পরিবর্তনের অনুভূতি, মৃত্যু নিয়ে ভাবনা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং অভিবাসীদের সাংস্কৃতিক স্মৃতি। প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো সামহেইন থেকে শুরু করে আধুনিক কুমড়োর আলো, ট্রিক অর ট্রিট এবং কস্টিউম পার্টি—হ্যালোইন সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলেছে বারবার।












মন্তব্য ০
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।