কিম কুক-সং নামে উত্তর কোরিয়ার এক সাবেক সেনা গোয়েন্দা কর্মকর্তা বিবিসির সাংবাদিক লরা বিকারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে দেশটির ‘সব গোপন খবর’ ফাঁস করে দিয়েছেন।
প্রথম সারির কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ কোনো সামরিক কর্মকর্তার এটাই প্রথম সাক্ষাৎকার।
তিনি উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাধর গুপ্তচর সংস্থায় ৩০ বছর ধরে কাজ করেছেন। কিম কুক-সং বলেন, ‘এই সংস্থাটি হচ্ছে ‘উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতার চোখ, কান এবং মগজ’।
তিনি দাবি করছেন, তিনি উত্তর কোরিয়ার নেতাদের সব গোপন খবর জানেন, তাদের সমালোচকদের হত্যা করতে তিনি হত্যাকারী পাঠাতেন, এবং এমনকি ‘বিপ্লবের’ জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে অবৈধ মাদক কারখানাও খুলেছিলেন।
এখন উত্তর কোরিয়ার এই সাবেক কর্নেল বিবিসির কাছে সবকিছু ফাঁস করে দিয়েছেন।
এই এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে কিম কুক-সং বিবিসিকে বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট সরকারের মধ্যে তিনি ছিলেন ‘লালের চাইতেও লাল’ – অর্থাৎ একজন খুবই অনুগত কমিউনিস্ট।
কিন্তু উত্তর কোরিয়াতে আপনার সামরিক মর্যাদা কিংবা আনুগত্য আপনার নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিতে পারে না, বলছেন তিনি।
প্রাণ বাঁচানোর জন্য তিনি ২০১৫ সালে পক্ষ ত্যাগ করেন। তখন থেকে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে বসবাস করছেন এবং দেশটির গুপ্তচর সংস্থার সঙ্গে কাজ করছেন।
ওই সাক্ষাৎকারে তিনি জানালেন কীভাবে অর্থ সংগ্রহের জন্য উত্তর কোরিয়ার সরকার মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকাতে অস্ত্র ও মাদক বিক্রি করছে।
পিয়ংইয়ং-এর সরকারের মধ্যে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, কীভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয় এবং উত্তর কোরিয়ার গোপন গুপ্তচর বাহিনী ও সাইবার টিম কীভাবে বিশ্বজুড়ে তৎপরতা চালাতে পারে, কিম কুক-সং সেই বর্ণনাও দিয়েছেন।
তবে কোন নিরপেক্ষ সূত্র থেকে বিবিসি এসব দাবি যাচাই করতে পারেনি। কিন্তু বিবিসি তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পেরেছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে, তার দাবির পক্ষে প্রমাণ খুঁজে পেয়েছে।
এজন্য বিবিসি লন্ডন এবং নিউইয়র্কে উত্তর কোরিয়ার দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে তারা কোনও প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
‘পক্ষ ত্যাগকারী কর্মকর্তাকে হত্যায় টাস্ক ফোর্স’
উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ গুপ্তচর সংস্থায় কিম কুক-সং এর শেষ কয়েকটি বছরে তিনি বর্তমান নেতা কিম জংউন এর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরুর দিকটি দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি জানালেন, কিম জং উন ছিলেন একজন তরুণ যিনি নিজেকে একজন ‘যোদ্ধা’ হিসেবে প্রমাণ করতে সচেষ্ট ছিলেন।
উত্তর কোরিয়া ২০০৯ সালে নতুন একটি গুপ্তচর সংস্থা গঠন করে, যার নাম রিকনিস্যান্স জেনারেল ব্যুরো। সে সময়টাতে কিম জং উন এর বাবার স্ট্রোক হয়েছিল। কিম জং উনকে গড়ে তোলা হচ্ছিল নতুন নেতা হিসেবে।
ওই ব্যুরোর প্রধান ছিলেন কিম ইয়ং-চোল, যিনি এখনও উত্তর কোরিয়ার নেতার খুবই আস্থাভাজন সহচর।
কিম কুক-সং জানালেন, ২০০৯ সালের মে মাসে তাদের কাছে একটি আদেশ এলো একটি সন্ত্রাসী টাস্কফোর্স গড়ে তুলতে। লক্ষ্য ছিল উত্তর কোরিয়ার পক্ষ ত্যাগকারী এক কর্মকর্তাকে হত্যা করা।
‘কিম জং উন এর জন্য এটা ছিল সর্বোচ্চ নেতা (তার বাবা)-কে সন্তুষ্ট করার এক প্রয়াস,’ বলছেন কিম কুক-সং।
‘ঐ কর্মকর্তা হুয়াং জাং-ইয়পকে হত্যা করতে একটি ‘সন্ত্রাসী টাস্কফোর্স’ গড়ে তোলা হয়। আমি ব্যক্তিগত এতে নেতৃত্ব দিই’।
হুয়াং জাং-ইয়প ছিলেন উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর কর্মকর্তাদের একজন। উত্তর কোরিয়ার নীতিনির্ধারণীতে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু ১৯৯৭ সালে পক্ষ ত্যাগ করে দক্ষিণ কোরিয়ায় চলে যাওয়াটাকে উত্তর কোরিয়ার সরকার একেবারেই ক্ষমা করতে পারেনি। সেজন্যই পিয়ংইয়ং-এর শাসক পরিবার চেয়েছিল প্রতিশোধ নিতে।
কিন্তু সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। এই ষড়যন্ত্রের দায়ে উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনীর দুইজন মেজর এখন সিউলে ১০ বছর সাজা খাটছেন। এই হত্যা প্রচেষ্টার কথা পিয়ংইয়ং সরকার বরাবরই অস্বীকার করে আসছে এবং বলে আসছে যে এটা দক্ষিণ কোরিয়ার সাজানো নাটক।
কিন্তু কিম কুক-সং এর এই জবানবন্দী ভিন্ন কথা বলছে। ‘উত্তর কোরিয়ায় কিম জং ইল এবং কিম জং উন-এর মর্যাদা রক্ষার জন্য সন্ত্রাস হচ্ছে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার,’ বলছেন কিম কুক, ‘মহান নেতাকে খুশি করার জন্য এটা ছিল এক উপহার’।
মাদক ব্যবসা করে বিপ্লবের জন্য অর্থ সংগ্রহ
কিম জং উন সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন যে তার দেশে আবার এক ‘সঙ্কট’ তৈরি হয়েছে এবং গত এপ্রিলে সবাইকে বলেছেন, আরেকটি ‘কঠিন যাত্রা’র জন্য তৈরি হতে। এই কথাটি কিম জং ইল-এর শাসনামলে ব্যবহার করা হয়েছিল যখন উত্তর কোরিয়ায় ব্যাপক এক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।
সেই সময়টাতে কিম কুক-সং অপারেশনস বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তাকে নির্দেশ দেয়া হয় মহান নেতার ‘বিপ্লবের জন্য’ অর্থ সংগ্রহ করতে, অর্থাৎ অবৈধ মাদক ব্যবসা শুরু করতে।
‘এই দায়িত্ব হাতে পাওয়ার পর আমি তিনজন বিদেশিকে উত্তর কোরিয়ায় নিয়ে আসি। ওয়ার্কার্স পার্টির একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে একটি কারখানা খুলি এবং মাদক তৈরি শুরু করি’।
‘সেই মাদক ছিল ছিল আইস (ক্রিস্টাল মেথ), এগুলো ডলারে বিক্রি করে সেই অর্থ কিম জং ইল-এর কাছে পৌঁছে দিই’।
সেই সময়ে মাদক কারবারের ব্যাপারে কিম কুক-সং এর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য, কারণ উত্তর কোরিয়াতে দীর্ঘদিন ধরে হেরোইন এবং আফিম তৈরি হয়েছে।
সাবেক উত্তর কোরীয় কূটনীতিক থায়ে ইয়ং হো, যিনি নিজেও পক্ষ ত্যাগ করেছিলেন, তিনি ২০১৯ সালে অসলো ফ্রিডম ফোরামে জানিয়েছেন, উত্তর কোরিয়া সরকারিভাবে মাদক চোরাকারবারের সাথে জড়িত। এবং সরকার সে দেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক মাদকাসক্তিকে সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে।
বিবিসির সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, সেই অর্থ কোথায় গেল? সেটা কী জনগণের পেছনে ব্যয় করা হয়েছে?
‘আপনাকে যে ব্যাপারটা বুঝতে হবে তা হলো উত্তর কোরিয়ার সব অর্থের মালিক উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা,’ তিনি বলছেন, ‘সেই টাকা দিয়ে তিনি প্রাসাদ তৈরি করেন, দামি গাড়ি কেনেন, পোশাক কেনেন এবং বিলাসী জীবন যাপন করেন’।
উত্তর কোরিয়ায় ১৯৯০-র দশক থেকে শুরু হওয়া খাদ্যাভাবে হাজার হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বলে অনুমান করা হয়।
কিম কুক-সং বলছেন, উত্তর কোরিয়ার আয়ের আরেকটি উৎস হচ্ছে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করা। এটিও দেখাশোনা করতো অপারেশনস ডিপার্টমেন্ট।
‘এই অস্ত্রের মধ্যে ছিল ছোট সাবমেরিন আর সেমি-সাবমারসিবল। এ ধরনের আধুনিক অস্ত্র তৈরিতে উত্তর কোরিয়া সিদ্ধহস্ত,’ বলছেন তিনি।
উত্তর কোরিয়ার সাথে ইরানের অস্ত্র ব্যবসা ১৯৮০-র দশক থেকেই ওপেন সিক্রেট এবং এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক মিসাইল, বলছেন উত্তর কোরিয়ার ওপর শীর্ষ পণ্ডিতদের একজন অধ্যাপক আন্দ্রেই ল্যানকভ।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও উত্তর কোরিয়া ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্র তৈরির গবেষণায় বেশ এগিয়ে রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশটি চারটি নতুন অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। এগুলো হচ্ছে দূর পাল্লার ক্রুজ মিসাইল, ট্রেন থেকে উৎক্ষেপণ করা যায় এমন ব্যালিস্টিক মিসাইল, হাইপারসোনিক মিসাইল এবং বিমান বিধ্বংসী মিসাইল। এই কাজে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তাও বেশ আধুনিক।
কিম কুক-সং বলছেন, দীর্ঘদিন গৃহযুদ্ধ চলেছে এমন বেশ কয়েকটি দেশে উত্তর কোরিয়া অস্ত্র এবং প্রযুক্তি বিক্রি করেছে। সম্প্রতি বছরগুলিতে জাতিসংঘ অভিযোগ করেছে যে সিরিয়া, মিয়ানমার, লিবিয়া এবং সুদানে অস্ত্র সরবরাহ করেছে উত্তর কোরিয়া।
পিয়ংইয়াং-এর তৈরি অস্ত্র বিশ্বের সমস্যাপূর্ণ এলাকাগুলিতে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে জাতিসংঘ বলছে।
‘স্বপ্নভঙ্গ’
উত্তর কোরিয়ায় কিম কুক-সং এর জীবন ছিল নানা সুবিধায় ভরপুর। তিনি দাবি করেন কিম জং উন-এর ফুপু তাকে একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি উপহার দিয়েছিলেন। উত্তর কোরিয়ার নেতার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে তিনি অবাধে বিদেশে যেতে পারতেন।
তিনি বলেন, মূল্যবান ধাতু এবং কয়লা বিক্রি করে সুটকেস বোঝাই ডলার নিয়ে তিনি দেশে ফিরতেন।
হত দরিদ্র একটি দেশে এ ধরনরে জীবনযাপনের কথা অনেকেই কল্পনাও করতে পারবে না। বৈবাহিক সূত্রে কিম কুক-সং এর রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল ভাল। কিন্তু সেই একই সম্পর্ক তার জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছিল।
বিশেষভাবে কিম জং উন যখন তার চাচা জ্যাং সং থায়েককে হত্যা করেন, তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে আর উত্তর কোরিয়ায় থাকা চলবে না।
কিম কুক-সং এর সাথে বিবিসির সাংবাদিকের যে কয়েকবার দেখা হয়েছে, প্রত্যেকবারই তিনি তার কাছে জানতে চেয়েছেন তিনি কেন এখন মুখ খেলার সিদ্ধান্ত নিলেন।
‘এটা আমার একটা দায়িত্ব,’ বলছেন তিনি, ‘এখন থেকে এক স্বৈরাচারী শাসকের কবল থেকে আমার দেশের ভাইদের মুক্ত করার জন্য আমি কাজ করে যাব’।
উত্তর কোরিয়া থেকে পক্ষ ত্যাগ করে আসা ৩০ হাজারেরও বেশি লোক এখন দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাস করছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে অল্প সংখ্যক মানুষই প্রকাশ্যে কথা বলেছেন।
কিন্তু তাদের এসব কথাবার্তা যাচাই করার সুযোগ কোথায়?
উত্তর কোরিয়ায় কিম কুক-সং এর জীবন ছিল একেবারেই ভিন্ন। কিন্তু তার বয়ানের মধ্য দিয়ে এমন এক শাসন ব্যবস্থার ভেতরের চিত্র পাওয়া যায়, যে শাসন ব্যবস্থা থেকে মানুষের পালানোর সুযোগ কমই।
আর উত্তর কোরিয়ার শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কী কী করে, সে সম্পর্কেও একটা ধারণা পাওয়া যায়।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 






















