ঢাকা ০১:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশুরা নিখোঁজ হচ্ছে কেন, আর নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের কতজনের সন্ধান মিলছে?

  • অনলাইন ডেস্ক
  • Update Time : ০৫:৩৩:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৭ Time View

চলতি বছরের (২০২৬ সাল) প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার বা সন্ধান পাওয়া গেছে এবং বাকি ১৩ শতাংশ বা ২ হাজার ৩৮ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছে।

শিশুরা কেন নিখোঁজ হচ্ছে?
পুলিশ সদরদপ্তর ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বয়সভেদে শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার কারণ ভিন্ন হয়ে থাকে:
  • ০ থেকে ৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে:
    • মেলায় বা অচেনা স্থানে পরিবারের সঙ্গে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া।
    • নিজের নাম ও ঠিকানা বলতে না পারা।
    • একা একা বাড়ি ফেরার পথে অন্য কোথাও চলে যাওয়া। 

  • ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে:
    • পারিবারিক কলহ, অশান্তি বা অভিমান করে বাড়ি ছাড়া।
    • পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ।
    • ভয় বা লজ্জায় কোনো ভুল বা অনৈতিক কাজের পর পালিয়ে যাওয়া।
    • স্বাধীনভাবে চলাফেরার প্রবণতা বা বন্ধুদের প্ররোচনা।
    • এছাড়া সুনির্দিষ্ট অপরাধমূলক চক্রের মাধ্যমে অপহরণ, পাচার, জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি বা অঙ্গহানির মতো মারাত্মক ঝুঁকিও রয়েছে। অনলাইনে সহজে জিডি করার সুবিধা চালুর কারণেও ডায়েরির সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। [1, 2, 3, 4]

    কতজনের সন্ধান মিলছে?
    • উদ্ধার হার: পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়া মোট শিশুর প্রায় ৮৭ শতাংশ বা সিংহভাগেরই সন্ধান মিলেছে বা তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
    • অসন্ধানকৃত: প্রায় ১৩ শতাংশ বা ২ হাজার ৩৮ জন শিশুর সন্ধান এখনও মেলেনি।

    বাবার হাত ধরে স্কুল থেকে ফিরেছিল সকাল। মসজিদের সামনে খেলতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি সাত বছরের শিশুটি। আট বছর পেরিয়ে গেলেও তার অপেক্ষায় পরিবার। আবার কার্টুন দেখতে দেখতে যাদব কখন যে বাড়ির বাইরে চলে গেছে, তা জানে না তার পরিবারের কেউ। অন্যদিকে মাহি রাগ করে ঘর ছেড়ে ১১ দিন পর নিজেই ফিরে এসেছে। তিনটি ঘটনা তিন রকম বাস্তবতা। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, শিশুরা নিখোঁজ হচ্ছে কেন, আর নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের কতজনের সন্ধান মিলছে?

    সকালের পরিবার জানিয়েছে, নিখোঁজের সময় সিসিটিভির ফুটেজে লাল জ্যাকেট পরিহিত দুজনকে তাদের ছেলেকে রিকশায় করে নিয়ে যেতে দেখা গেলেও দীর্ঘ আট বছর পেরিয়ে গেলেও তারা আর সকালের খোঁজ পাননি।

    তারা দাবি করেন, ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে। তবে কী উদ্দেশ্যে অপহরণ করা হতে পারে, সেই ব্যাখ্যা জানেন না সকালের বাবা ইসমাইল। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে। ছেলেকে ফেরাতে লাখ লাখ টাকা খরচ করলেও এখন পর্যন্ত মুক্তিপণ চেয়ে কোনো ফোনও পাননি তিনি।

    এদিকে, গত ৩০ জুলাই প্রতিদিনের মতো ছেলে যাদবকে তার দাদুর কাছে রেখে ঢাকার সাভার এলাকার নিজ কর্মস্থলে গিয়েছিলেন পোশাকশ্রমিক অর্চনা রানী দাস। এর কিছুক্ষণ পর ফোনে জানতে পারেন ছেলে নিখোঁজের ঘটনা। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত এত খোঁজাখুঁজির পরও সন্ধান মেলেনি যাদবের।

    পরিবারের ভাষ্য, টিভি দেখতে দেখতে বাসার বাইরে বের হয়েছিল যাদব। তবে আর ফিরে আসেনি সে। যাদবকে কেউ নিয়ে গেছে, নাকি নিজে থেকে কোথাও চলে গেছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট করতে পারেনি তার পরিবার। একই সঙ্গে মুক্তিপণের জন্যও কোনো ফোন পাননি তারা। পরিবারের ছোট সদস্যদের হারিয়ে যাওয়া এবং পুরোপুরি নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না কেউ। ফলে প্রশ্ন তুলছেন, কোথায় হারিয়ে গেল তাদের স্বজন?

    সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশ হয়। তবে এসব প্রতিবেদনে নিখোঁজ শিশুদের কতজন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে, তা উল্লেখ না থাকায় শিশু নিখোঁজের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রতিফলিত হয়নি বলে জানায় পুলিশ সদর দপ্তর।

    শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে গিয়ে পথ হারানো, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হয়। 

    গত ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। তবে এখনো নিখোঁজ ২ হাজার ৩৮ শিশু, যা মোট নিখোঁজের প্রায় ১৩ শতাংশ।

    পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য

    পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী ৪৭৪ শিশুর নিখোঁজের জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৬৮ জন এখনো নিখোঁজ।

    ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জায় পালিয়ে থাকা, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবকে নিখোঁজ হওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।

    এছাড়া ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের সংখ্যা ১৫ হাজার ২৪৩। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জন উদ্ধার হয়েছে এবং এক হাজার ৯৭০ জন এখনো নিখোঁজ।

    পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স বলছে, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশ হয়েছে। তবে এসব প্রতিবেদনে নিখোঁজ শিশুদের কতজন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে, তা উল্লেখ না থাকায় শিশু নিখোঁজের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রতিফলিত হয়নি। এতে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

    এ বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে পুলিশ বলছে, সাত মাসে নিখোঁজ হওয়া মোট ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর মধ্যে ২ হাজার ৩৮ জন এখনো উদ্ধার হয়নি।

    পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে গিয়ে পথ হারানো, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হয়। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জায় পালিয়ে থাকা, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবকে নিখোঁজ হওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।

    পুলিশ আরও জানিয়েছে, বর্তমানে অনলাইন জিডি সুবিধা চালু হওয়ায় নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

    পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে তা কমে ১৬ হাজার ৪১৪ হলেও ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৫৫০টিতে।

    গত ৩০ আগস্ট ময়মনসিংহের আকুয়া পূর্ব নয়াপাড়া থেকে নিখোঁজ হয় ১৪ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহি। টানা ১০ দিন নিখোঁজ থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও পরিবারের কেউই তার হদিস মেলাতে পারেননি। এরপর ১১তম দিনে নিজেই অবস্থান জানায় মাহি। ফিরে যায় বাড়িতে।

    মাহির পরিবার জানায়, ৩০ আগস্ট (রোববার) মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে দুই ভাইয়ের মনোমালিন্য হয়। এরপর মাহি রাগ করে ৫০ টাকা নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। পরে রাত ৩টার ময়মনসিংহগামী ট্রেনে চড়ে পৌঁছে যায় রাজধানীর কমলাপুরে। বিভিন্ন হোটেলে ঘুরে একটি কাজ জোগাড় করে। সারারাত কাজ শেষে ক্লান্ত শরীরে সারাদিন ঘুমিয়ে পার করে অনেকটাই পরিবারের কথা ভুলে থাকত সে। পরে এভাবেই কেটে যায় ১১ দিন। পরিবার অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পায়নি। ১১ দিন পর গত ৯ সেপ্টেম্বর নিজে থেকেই বাড়িতে ফোন দিয়ে নিজের অবস্থানের কথা জানায় মাহি। এরপর তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

    তিনি আমার কেসটা পিবিআইতে হ্যান্ডওভার করেন। সে সময় একটা মাত্র ক্লু—সিসিটিভির একটা ফুটেজ ছিল। যেখানে দেখা যাচ্ছিল আমার ছেলেকে দুজন রিকশায় বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের চেহারা দেখা যায় না। এরপর পিবিআইয়ের সিআইজি বিভিন্ন জায়গায় আমার মামলার তদন্ত হলেও ছেলেকে আর খুঁজে পাইনি।

    কী বলছে ভুক্তভোগী পরিবার

    ২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি রাজধানীর লালবাগের খান মোহাম্মদ মসজিদ এলাকা থেকে হারিয়ে যায় ইসমাইল হাসানের ছেলে সকাল। সে সময় সকালের বয়স ছিল ৭ বছর।

    নিখোঁজ সকালের বাবা ইসমাইল হাসান রাজন বলেন, ‘খান মোহাম্মদ মসজিদের ওখানে আমার ছেলে খেলছিল। ওখানে লাল জ্যাকেট পরা একটা লোক আসছে। এসে বলছে, চলো তোমাকে ভিডিও গেমস খেলতে নিয়ে যাই। এই কথা বলে নিয়ে গেছে। আমি তখন বাসায় ঘুমিয়ে ছিলাম। অন্য বাচ্চাদের কাছে শুনেছি। এর ঘণ্টাখানেক আগে আমি আমার ছেলেকে স্কুল থেকে নিয়ে আসি। বিকেল সাড়ে ৩টায় স্কুল ছুটি হয়েছে। এরপর আমি ওকে বাসায় নিয়ে আইসা, বাসায় ঘুমায় গেছি। ও (নিখোঁজ ছেলে) কী করছে, খাওয়া-দাওয়া কইরা প্রতিদিনের মতো ওই মসজিদের সামনে খেলতে যায়। ঠিক পৌনে ৫টায় হঠাৎ সবাই চিল্লাচিল্লি, কান্নাকাটি করে। এই সকালরে জানি কে নিয়ে গেছে—এভাবে চিল্লাপাল্লা করছে। পরে আমি দৌড়াইতে দৌড়াইতে গেছি। আমার বন্ধু যারা ছিল, তাদের দিয়ে চারদিকে হোন্ডা ছাড়ছি। কোনো জায়গায় পাইনি। পরে মাইকিং করা হয়েছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করছি, পাইনি। ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে ব্রেইন স্ট্রোক পর্যন্ত করেছি। স্ট্রোক করে এক সাইড পঙ্গু হয়ে গেছি। এখন আমি প্যারালাইজড রোগী।’

    থানার সহযোগিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেসময় বেগম খালেদা জিয়া গ্রেফতার হয়েছিলেন। থানা সেই সময় ভিআইপি কেস নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আমার কেসের উন্নতি না দেখে আমি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে গিয়ে আইজির সঙ্গে দেখা করি। সেই সময় আইজিপি ছিলেন জাবেদ পাটোয়ারী। তার সঙ্গে দেখা করি। তাকে সব বুঝিয়ে বললে তিনি আমার কেসটা পিবিআইতে হ্যান্ডওভার করেন। সে সময় একটা মাত্র ক্লু—সিসিটিভির একটা ফুটেজ ছিল। যেখানে দেখা যাচ্ছিল আমার ছেলেকে দুজন রিকশায় বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের চেহারা দেখা যায় না। এরপর পিবিআইয়ের সিআইজি বিভিন্ন জায়গায় আমার মামলার তদন্ত হলেও ছেলেকে আর খুঁজে পাইনি।’

    পরিবারে স্ত্রী ও এক মেয়ে। মেয়ের বয়স ২১ বছর। আর নিখোঁজ ছেলের বর্তমান বয়স প্রায় ১৬ বছর। মেয়ে তেজগাঁও কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।

    পরিবার কীভাবে চলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানুষের সাহায্যে চলে। আমি একসময় কন্ট্রাক্টর ছিলাম। পরে আমার জমানো যা ছিল, আমার স্ত্রীর যত সোনা ছিল, সব বিক্রি করে ফকির-কবিরাজ-তান্ত্রিক—বাংলাদেশের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমি না গেছি। সে সময় আমার নগদ টাকা ছিল ২৭ লাখ টাকা। এই ২৭ লাখ টাকা শুধু ফকিরে খাইছে। এই ফকিরেই আজ আমারে রাস্তার ফকির বানিয়ে দিয়েছে। আজ আমরা টোটালি নিঃস্ব। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, এলাকার বড় ভাই-ছোট ভাই—সবার সহযোগিতায় আজ আমার সংসার চলে।’

    গত ৩০ জুলাই রাজধানীর সাভার এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় গার্মেন্টসকর্মী অর্চনা রানীর ছেলে যাদব কর্মকার (৫)। অর্চনা রানী  বলেন, ‘আমি একজন পোশাক শ্রমিক। গত জুলাই মাসের ৩০ তারিখ প্রতিদিনের মতোই অফিসে চলে যাই। এর দুই ঘণ্টা পরে আমার বাবা আমাকে ফোন দিয়ে বলে, মা, দাদুরে পাওয়া যাচ্ছে না। তা আমি কই, যাদবরে পাওয়া যাচ্ছে না। ও গেছে কই?’

    ‘আমার বাবা আমার বাসায় আমার সঙ্গে থাকে। গরিব মানুষ আমরা। আমি ডিউটি করি, আর আমার বাবা ছেলেরে সঙ্গে সঙ্গে দেখে রাখে। আমি অফিসে গেলে আমার ছেলে নাকি বাবারে বলেছে, দাদু দোকানে যাব। তখন বাবা বলেছে, বৃষ্টি কমলে আমরা দোকানে যাব। তখন বাবা বলছে, তুমি আমার কাছে একটু ঘুমাও। এরপর আমার ছেলে নাকি বলছে, দাদু কার্টুন ছেড়ে দাও, আমি কার্টুন দেখি। এরপর বাবা কার্টুন চালিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে গেছে। এরপর ঘুম থেকে ফাল দিয়ে উঠে দেখে যাদব নেই। পরে আমি এসে কোনো খোঁজ না পেয়ে অটো নিয়ে পুরো এলাকায় মাইকিং করেও খোঁজ পাইনি।’

    ‘পরে ওইদিন আবার থানায় গেছি। গিয়ে আমি সব বললাম। তখন তারা আমাকে বললো, ২৪ ঘণ্টা না গেলে জিডি নেবে না। পরে আমরা বললাম, একটা বাচ্চা মানুষ—২৪ ঘণ্টার মধ্যে কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। পরে কী করব? জিডি নিলো না, চলে আসলাম। পরদিন গিয়ে জিডি করলাম। এই জিডি যার দায়িত্বে দিয়েছে, উনি যায়-আসে তদন্ত করে। আজ পর্যন্ত এটাই চলছে। কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না।’—এই বলে কান্না করতে করতে ছেলের সন্ধান চান তিনি।

    কোনো সময় মুক্তিপণ চেয়ে ফোন এসেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এমন কোনো ফোন আসেনি।’

    আগস্ট মাসের ৩০ তারিখ রোববার বনানী সৈনিক ক্লাব ফুটওভার ব্রিজে জুতা কিনতে গিয়ে বড় মেয়ে সাইবাকে (৪) হারিয়ে ফেলেন বিথী।

    বিথী  বলেন, ‘আগস্ট মাসের ৩০ তারিখ রোববার বিকেল আনুমানিক ৫টা। আমি আমার মাইয়া দুইডারে লইয়া বিকালে সৈনিক ক্লাব ফুটওভার ব্রিজে জুতা কিনতে গেছিলাম। বড় মেয়ের জন্য জুতা কিনতে গেছি। ছোট মেয়ের বয়স ১ বছর। ও আমার কোলে। আর বড় মেয়ের হাতটা ছেড়ে জুতা দেখছি, দাম-দর করে জুতাটা কিনছি। এরপর পিছে তাকায় দেখি আমার মেয়ে নেই। ব্রিজের ওপর ছিলাম। সঙ্গে সঙ্গেই আমার মায়েডারে খুঁজছি, যে গেল কই। খুঁজে দেখি আশপাশের কোনো জায়গায় নেই। পায়ে হেঁটে যতটুকু খোঁজা যায়, সবটুকু খুঁজছি। আশপাশে যত জায়গা আছে, সব খুঁজে ফেলেছি।’

    তিনি বলেন, ‘বনানীর সোসাইটিতে আমি কাজ করতাম। এরপর মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে আমার স্বামীকে ফোন দিয়ে বলেছি, সাইবার আব্বু, আমি তো সাইবারে পাইতেছি না। জুতা কিনতে গিয়ে হাতটা ছাড়ছি আর সাইবারে খুইজ্জা পাইতাছি না। এরপর সঙ্গে সঙ্গে ওর আব্বু চলে আসলো। আমরা দুজন মিলে অনেক খুঁজছি, কিন্তু কোথাও পাইনি। পরে ৭টার দিকে থানায় গিয়ে কইলাম—স্যার, আমার মাইয়াটা হারায় গেছে। তখন স্যার বলে, তোমাদের বাচ্চা তোমরা খেয়াল রাখো না কেন? তোমাদের বাচ্চা হারায় গেছে, এইডা কি আমরা খুঁজে দিবো? তারপর বলে, ২৪ ঘণ্টার আগে জিডি নেওয়া হয় না। যাও, আরও খোঁজো।’

    ‘তারপর আমরা গিয়ে আবার সবদিকে অনেক খুঁজলাম। রাত ১০টার দিকে আবার থানায় গিয়ে বললাম—স্যার, এমন জায়গা বাদ নেই যে খুঁজিনি। পুরো বনানী হেঁটে হেঁটে খুঁজেছি, কিন্তু আমার মাইয়ারে তো পাইলাম না। এরপরও আমার জিডি নিলো না। আমি আমার আম্মুরে ফোন দিলাম—আম্মু, আমার মাইয়াডা হারায় গেছে। থানাতো জিডি নিতেছে না। পরদিন সকালেই আম্মু চলে আসছে। এসে আমার সঙ্গে থানায় গিয়ে অনেক অনুরোধ করার পরও জিডি নিলো না। পরে আম্মু এক ম্যাডামরে ধরছে। আম্মু ম্যাডামরে সবকিছু বুঝাইয়া বললো। পরে বড় ওসির সঙ্গে কথা বইলা জিডির অনুমোদন করায় দিলো। পরে ওইদিনও জিডি হলো না। কইলো, আজকে সার্ভারের সমস্যা। আপনারা কালকে আসেন। পরদিন মঙ্গলবার আবার গেলাম। আমার মাইয়া হারাইছে রোববার আর মঙ্গলবার ৩টায় জিডিটা হাতে দেছে।’

    মহিলা পরিষদের উদ্বেগ

    এদিকে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সম্প্রতি শিশু নিখোঁজ ও গুম হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সংগঠনের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম ও সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ জানানো হয়।

    বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের নিখোঁজ ও গুম হওয়ার ঘটনা ঘটছে। নিখোঁজ শিশুদের কেউ কেউ বাড়ির সামনে খেলা করতে গিয়ে, স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে, বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের প্রলোভনের শিকার হয়ে, অপরিচিত স্থানে ঘুরতে গিয়ে পথ ভুলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হচ্ছে। চলতি বছর সাত মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশু নিখোঁজ ও গুম হয়ে যাওয়ার ঘটনা আতঙ্কজনক। উদ্বেগজনকভাবে শিশু নিখোঁজ বেড়ে যাওয়া সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা তৈরি করছে এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সূচক তৈরি করছে।

    বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা শিশু কোনো পাচার চক্রের শিকার হচ্ছে কি না বা কোনো অসাধু অপরাধজগতে পা রাখছে কি না, তা নিয়ে জনমনে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। আকস্মিকভাবে শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসছে।

    নিখোঁজ শিশুদের সন্ধানে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। একই সঙ্গে শিশু নিখোঁজের সঙ্গে জড়িত অপরাধী চক্রকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণসহ যথাযথ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে।

    এদিকে, সারাদেশে উদ্বেগজনক হারে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় সরকারকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ব্যারিস্টার ইশরাত হাসান সরকারকে এ নোটিশ দেন।

    এই সাত মাসে যত শিশু অপহরণ হয়েছে, তার মধ্যে বেশিরভাগ হয়েছে জয়পুরহাটে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে অপহৃত শিশুদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ জয়পুরহাটের। আমাদের যে হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার আছে, তারা তাদের বাড়ি গিয়েছে। তাদের বাবা-মায়ের কাছে এ বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছে। অধিকাংশই বলেছে, আমরা এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না।

    নোটিশে সারাদেশে উদ্বেগজনক হারে শিশু নিখোঁজের ঘটনা প্রতিরোধ, নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত সন্ধান ও উদ্ধার, কেন্দ্রীয় মিসিং চিলড্রেন ডেটাবেজ/পোর্টাল প্রতিষ্ঠা ও কার্যকর মিসিং চাইল্ড অ্যালার্ট সিস্টেম চালুসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়।

    অপহরণের চেয়ে নিখোঁজ বেশি

    শিশু নিখোঁজের বিষয়ে জানতে চাইলে মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘অপহরণের চেয়ে নিখোঁজের সংখ্যাটা বেশি। এমন অপহরণ আবার হচ্ছে না যে ওদের কাছ থেকে মুক্তিপণ চাচ্ছে।’

    ‘অনেকেই সন্তান নিখোঁজ হলে জানায় না’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই সাত মাসে যত শিশু অপহরণ হয়েছে, তার মধ্যে বেশিরভাগ হয়েছে জয়পুরহাটে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে অপহৃত শিশুদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ জয়পুরহাটের। আমাদের যে হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার আছে, তারা তাদের বাড়ি গিয়েছে। তাদের বাবা-মায়ের কাছে এ বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছে। অধিকাংশই বলেছে, আমরা এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না। জয়পুরহাটের কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে চায়নি। বলে, আমাদের শিশু নিখোঁজ হয়েছে, আমরা কাউকে বলিনি, থানায় যাইনি—আপনারা কেন আমাদের ঝামেলা করছেন।’

    তিনি বলেন, ‘যদি আইনি ঝামেলা বা জিডি করতে গিয়ে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়, সে ক্ষেত্রে আমাদের বললে আমরা তাদের সহযোগিতা করবো।’

    মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

    শিশু ও কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. সাদিয়া আফরিন জাগো নিউজকে বলেন, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বাবা-মায়ের সঙ্গে মতপার্থক্য বা দ্বন্দ্ব, স্কুলে বুলিং এবং পারিবারিক পরিবেশে সমস্যা থাকলে অনেক সময় এ ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ বা দাম্পত্য কলহের কারণেও শিশুরা আবেগীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। তখন রাগ বা আবেগের বশে হঠাৎ বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে চলে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

    তিনি বলেন, আচরণগত সমস্যার ক্ষেত্রে অনেক সময় শিশুরা এতটাই আবেগপ্রবণ ও সিদ্ধান্তে আবেগনির্ভর হয়ে পড়ে যে, বাবা-মায়ের অনুমতি ছাড়াই বাসার বাইরে চলে যায়। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে পরিবারে যতটা নিরাপদ, বাইরের জগৎ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, এ বিষয়ে যথেষ্ট পরিপক্বতা থাকে না। ফলে তাদের সহজেই ফুসলিয়ে কোথাও নিয়ে যাওয়া বা অপহরণ করা সম্ভব হয়।

    ডা. সাদিয়া আফরিন বলেন, শিশু অপহরণ বা তাদের শিশুশ্রমে নিয়োজিত করা বড় ধরনের অপরাধ। তাই পরিবারে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের আবেগীয় ও সামাজিক পরিবর্তন সম্পর্কে বাবা-মায়ের সচেতন থাকা জরুরি। রাগের সময় ‘বাসা থেকে বের হয়ে যা’, এ ধরনের কথা বলা থেকেও অভিভাবকদের বিরত থাকতে হবে।

    তিনি আরও বলেন, শিশু হঠাৎ চুপ হয়ে গেলে, অতিরিক্ত রাগারাগি করলে বা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। কিশোর-কিশোরীদের মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তন সম্পর্কে অভিভাবকরা সচেতন হয়ে তাদের বোঝার চেষ্টা করলে রাগের বশে বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়া বা দীর্ঘ সময় অনুমতি ছাড়া বাইরে থাকার প্রবণতা কমানো সম্ভব।

    Tag :
    জনপ্রিয়

    শিশুরা নিখোঁজ হচ্ছে কেন, আর নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের কতজনের সন্ধান মিলছে?

    Update Time : ০৫:৩৩:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

    চলতি বছরের (২০২৬ সাল) প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার বা সন্ধান পাওয়া গেছে এবং বাকি ১৩ শতাংশ বা ২ হাজার ৩৮ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছে।

    শিশুরা কেন নিখোঁজ হচ্ছে?
    পুলিশ সদরদপ্তর ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বয়সভেদে শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার কারণ ভিন্ন হয়ে থাকে:
    • ০ থেকে ৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে:
      • মেলায় বা অচেনা স্থানে পরিবারের সঙ্গে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া।
      • নিজের নাম ও ঠিকানা বলতে না পারা।
      • একা একা বাড়ি ফেরার পথে অন্য কোথাও চলে যাওয়া। 

    • ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে:
      • পারিবারিক কলহ, অশান্তি বা অভিমান করে বাড়ি ছাড়া।
      • পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ।
      • ভয় বা লজ্জায় কোনো ভুল বা অনৈতিক কাজের পর পালিয়ে যাওয়া।
      • স্বাধীনভাবে চলাফেরার প্রবণতা বা বন্ধুদের প্ররোচনা।
      • এছাড়া সুনির্দিষ্ট অপরাধমূলক চক্রের মাধ্যমে অপহরণ, পাচার, জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি বা অঙ্গহানির মতো মারাত্মক ঝুঁকিও রয়েছে। অনলাইনে সহজে জিডি করার সুবিধা চালুর কারণেও ডায়েরির সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। [1, 2, 3, 4]

      কতজনের সন্ধান মিলছে?
      • উদ্ধার হার: পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়া মোট শিশুর প্রায় ৮৭ শতাংশ বা সিংহভাগেরই সন্ধান মিলেছে বা তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
      • অসন্ধানকৃত: প্রায় ১৩ শতাংশ বা ২ হাজার ৩৮ জন শিশুর সন্ধান এখনও মেলেনি।

      বাবার হাত ধরে স্কুল থেকে ফিরেছিল সকাল। মসজিদের সামনে খেলতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি সাত বছরের শিশুটি। আট বছর পেরিয়ে গেলেও তার অপেক্ষায় পরিবার। আবার কার্টুন দেখতে দেখতে যাদব কখন যে বাড়ির বাইরে চলে গেছে, তা জানে না তার পরিবারের কেউ। অন্যদিকে মাহি রাগ করে ঘর ছেড়ে ১১ দিন পর নিজেই ফিরে এসেছে। তিনটি ঘটনা তিন রকম বাস্তবতা। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, শিশুরা নিখোঁজ হচ্ছে কেন, আর নিখোঁজ হওয়ার পর তাদের কতজনের সন্ধান মিলছে?

      সকালের পরিবার জানিয়েছে, নিখোঁজের সময় সিসিটিভির ফুটেজে লাল জ্যাকেট পরিহিত দুজনকে তাদের ছেলেকে রিকশায় করে নিয়ে যেতে দেখা গেলেও দীর্ঘ আট বছর পেরিয়ে গেলেও তারা আর সকালের খোঁজ পাননি।

      তারা দাবি করেন, ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে। তবে কী উদ্দেশ্যে অপহরণ করা হতে পারে, সেই ব্যাখ্যা জানেন না সকালের বাবা ইসমাইল। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে। ছেলেকে ফেরাতে লাখ লাখ টাকা খরচ করলেও এখন পর্যন্ত মুক্তিপণ চেয়ে কোনো ফোনও পাননি তিনি।

      এদিকে, গত ৩০ জুলাই প্রতিদিনের মতো ছেলে যাদবকে তার দাদুর কাছে রেখে ঢাকার সাভার এলাকার নিজ কর্মস্থলে গিয়েছিলেন পোশাকশ্রমিক অর্চনা রানী দাস। এর কিছুক্ষণ পর ফোনে জানতে পারেন ছেলে নিখোঁজের ঘটনা। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত এত খোঁজাখুঁজির পরও সন্ধান মেলেনি যাদবের।

      পরিবারের ভাষ্য, টিভি দেখতে দেখতে বাসার বাইরে বের হয়েছিল যাদব। তবে আর ফিরে আসেনি সে। যাদবকে কেউ নিয়ে গেছে, নাকি নিজে থেকে কোথাও চলে গেছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট করতে পারেনি তার পরিবার। একই সঙ্গে মুক্তিপণের জন্যও কোনো ফোন পাননি তারা। পরিবারের ছোট সদস্যদের হারিয়ে যাওয়া এবং পুরোপুরি নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না কেউ। ফলে প্রশ্ন তুলছেন, কোথায় হারিয়ে গেল তাদের স্বজন?

      সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশ হয়। তবে এসব প্রতিবেদনে নিখোঁজ শিশুদের কতজন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে, তা উল্লেখ না থাকায় শিশু নিখোঁজের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রতিফলিত হয়নি বলে জানায় পুলিশ সদর দপ্তর।

      শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে গিয়ে পথ হারানো, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হয়। 

      গত ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। তবে এখনো নিখোঁজ ২ হাজার ৩৮ শিশু, যা মোট নিখোঁজের প্রায় ১৩ শতাংশ।

      পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য

      পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী ৪৭৪ শিশুর নিখোঁজের জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৬৮ জন এখনো নিখোঁজ।

      ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জায় পালিয়ে থাকা, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবকে নিখোঁজ হওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।

      এছাড়া ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের সংখ্যা ১৫ হাজার ২৪৩। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জন উদ্ধার হয়েছে এবং এক হাজার ৯৭০ জন এখনো নিখোঁজ।

      পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স বলছে, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশ হয়েছে। তবে এসব প্রতিবেদনে নিখোঁজ শিশুদের কতজন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে, তা উল্লেখ না থাকায় শিশু নিখোঁজের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রতিফলিত হয়নি। এতে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

      এ বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে পুলিশ বলছে, সাত মাসে নিখোঁজ হওয়া মোট ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর মধ্যে ২ হাজার ৩৮ জন এখনো উদ্ধার হয়নি।

      পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে গিয়ে পথ হারানো, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হয়। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার পর লজ্জায় পালিয়ে থাকা, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবকে নিখোঁজ হওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।

      পুলিশ আরও জানিয়েছে, বর্তমানে অনলাইন জিডি সুবিধা চালু হওয়ায় নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

      পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে তা কমে ১৬ হাজার ৪১৪ হলেও ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৫৫০টিতে।

      গত ৩০ আগস্ট ময়মনসিংহের আকুয়া পূর্ব নয়াপাড়া থেকে নিখোঁজ হয় ১৪ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহি। টানা ১০ দিন নিখোঁজ থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও পরিবারের কেউই তার হদিস মেলাতে পারেননি। এরপর ১১তম দিনে নিজেই অবস্থান জানায় মাহি। ফিরে যায় বাড়িতে।

      মাহির পরিবার জানায়, ৩০ আগস্ট (রোববার) মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে দুই ভাইয়ের মনোমালিন্য হয়। এরপর মাহি রাগ করে ৫০ টাকা নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। পরে রাত ৩টার ময়মনসিংহগামী ট্রেনে চড়ে পৌঁছে যায় রাজধানীর কমলাপুরে। বিভিন্ন হোটেলে ঘুরে একটি কাজ জোগাড় করে। সারারাত কাজ শেষে ক্লান্ত শরীরে সারাদিন ঘুমিয়ে পার করে অনেকটাই পরিবারের কথা ভুলে থাকত সে। পরে এভাবেই কেটে যায় ১১ দিন। পরিবার অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পায়নি। ১১ দিন পর গত ৯ সেপ্টেম্বর নিজে থেকেই বাড়িতে ফোন দিয়ে নিজের অবস্থানের কথা জানায় মাহি। এরপর তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

      তিনি আমার কেসটা পিবিআইতে হ্যান্ডওভার করেন। সে সময় একটা মাত্র ক্লু—সিসিটিভির একটা ফুটেজ ছিল। যেখানে দেখা যাচ্ছিল আমার ছেলেকে দুজন রিকশায় বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের চেহারা দেখা যায় না। এরপর পিবিআইয়ের সিআইজি বিভিন্ন জায়গায় আমার মামলার তদন্ত হলেও ছেলেকে আর খুঁজে পাইনি।

      কী বলছে ভুক্তভোগী পরিবার

      ২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি রাজধানীর লালবাগের খান মোহাম্মদ মসজিদ এলাকা থেকে হারিয়ে যায় ইসমাইল হাসানের ছেলে সকাল। সে সময় সকালের বয়স ছিল ৭ বছর।

      নিখোঁজ সকালের বাবা ইসমাইল হাসান রাজন বলেন, ‘খান মোহাম্মদ মসজিদের ওখানে আমার ছেলে খেলছিল। ওখানে লাল জ্যাকেট পরা একটা লোক আসছে। এসে বলছে, চলো তোমাকে ভিডিও গেমস খেলতে নিয়ে যাই। এই কথা বলে নিয়ে গেছে। আমি তখন বাসায় ঘুমিয়ে ছিলাম। অন্য বাচ্চাদের কাছে শুনেছি। এর ঘণ্টাখানেক আগে আমি আমার ছেলেকে স্কুল থেকে নিয়ে আসি। বিকেল সাড়ে ৩টায় স্কুল ছুটি হয়েছে। এরপর আমি ওকে বাসায় নিয়ে আইসা, বাসায় ঘুমায় গেছি। ও (নিখোঁজ ছেলে) কী করছে, খাওয়া-দাওয়া কইরা প্রতিদিনের মতো ওই মসজিদের সামনে খেলতে যায়। ঠিক পৌনে ৫টায় হঠাৎ সবাই চিল্লাচিল্লি, কান্নাকাটি করে। এই সকালরে জানি কে নিয়ে গেছে—এভাবে চিল্লাপাল্লা করছে। পরে আমি দৌড়াইতে দৌড়াইতে গেছি। আমার বন্ধু যারা ছিল, তাদের দিয়ে চারদিকে হোন্ডা ছাড়ছি। কোনো জায়গায় পাইনি। পরে মাইকিং করা হয়েছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করছি, পাইনি। ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে ব্রেইন স্ট্রোক পর্যন্ত করেছি। স্ট্রোক করে এক সাইড পঙ্গু হয়ে গেছি। এখন আমি প্যারালাইজড রোগী।’

      থানার সহযোগিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেসময় বেগম খালেদা জিয়া গ্রেফতার হয়েছিলেন। থানা সেই সময় ভিআইপি কেস নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আমার কেসের উন্নতি না দেখে আমি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে গিয়ে আইজির সঙ্গে দেখা করি। সেই সময় আইজিপি ছিলেন জাবেদ পাটোয়ারী। তার সঙ্গে দেখা করি। তাকে সব বুঝিয়ে বললে তিনি আমার কেসটা পিবিআইতে হ্যান্ডওভার করেন। সে সময় একটা মাত্র ক্লু—সিসিটিভির একটা ফুটেজ ছিল। যেখানে দেখা যাচ্ছিল আমার ছেলেকে দুজন রিকশায় বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের চেহারা দেখা যায় না। এরপর পিবিআইয়ের সিআইজি বিভিন্ন জায়গায় আমার মামলার তদন্ত হলেও ছেলেকে আর খুঁজে পাইনি।’

      পরিবারে স্ত্রী ও এক মেয়ে। মেয়ের বয়স ২১ বছর। আর নিখোঁজ ছেলের বর্তমান বয়স প্রায় ১৬ বছর। মেয়ে তেজগাঁও কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।

      পরিবার কীভাবে চলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানুষের সাহায্যে চলে। আমি একসময় কন্ট্রাক্টর ছিলাম। পরে আমার জমানো যা ছিল, আমার স্ত্রীর যত সোনা ছিল, সব বিক্রি করে ফকির-কবিরাজ-তান্ত্রিক—বাংলাদেশের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমি না গেছি। সে সময় আমার নগদ টাকা ছিল ২৭ লাখ টাকা। এই ২৭ লাখ টাকা শুধু ফকিরে খাইছে। এই ফকিরেই আজ আমারে রাস্তার ফকির বানিয়ে দিয়েছে। আজ আমরা টোটালি নিঃস্ব। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, এলাকার বড় ভাই-ছোট ভাই—সবার সহযোগিতায় আজ আমার সংসার চলে।’

      গত ৩০ জুলাই রাজধানীর সাভার এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় গার্মেন্টসকর্মী অর্চনা রানীর ছেলে যাদব কর্মকার (৫)। অর্চনা রানী  বলেন, ‘আমি একজন পোশাক শ্রমিক। গত জুলাই মাসের ৩০ তারিখ প্রতিদিনের মতোই অফিসে চলে যাই। এর দুই ঘণ্টা পরে আমার বাবা আমাকে ফোন দিয়ে বলে, মা, দাদুরে পাওয়া যাচ্ছে না। তা আমি কই, যাদবরে পাওয়া যাচ্ছে না। ও গেছে কই?’

      ‘আমার বাবা আমার বাসায় আমার সঙ্গে থাকে। গরিব মানুষ আমরা। আমি ডিউটি করি, আর আমার বাবা ছেলেরে সঙ্গে সঙ্গে দেখে রাখে। আমি অফিসে গেলে আমার ছেলে নাকি বাবারে বলেছে, দাদু দোকানে যাব। তখন বাবা বলেছে, বৃষ্টি কমলে আমরা দোকানে যাব। তখন বাবা বলছে, তুমি আমার কাছে একটু ঘুমাও। এরপর আমার ছেলে নাকি বলছে, দাদু কার্টুন ছেড়ে দাও, আমি কার্টুন দেখি। এরপর বাবা কার্টুন চালিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে গেছে। এরপর ঘুম থেকে ফাল দিয়ে উঠে দেখে যাদব নেই। পরে আমি এসে কোনো খোঁজ না পেয়ে অটো নিয়ে পুরো এলাকায় মাইকিং করেও খোঁজ পাইনি।’

      ‘পরে ওইদিন আবার থানায় গেছি। গিয়ে আমি সব বললাম। তখন তারা আমাকে বললো, ২৪ ঘণ্টা না গেলে জিডি নেবে না। পরে আমরা বললাম, একটা বাচ্চা মানুষ—২৪ ঘণ্টার মধ্যে কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। পরে কী করব? জিডি নিলো না, চলে আসলাম। পরদিন গিয়ে জিডি করলাম। এই জিডি যার দায়িত্বে দিয়েছে, উনি যায়-আসে তদন্ত করে। আজ পর্যন্ত এটাই চলছে। কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না।’—এই বলে কান্না করতে করতে ছেলের সন্ধান চান তিনি।

      কোনো সময় মুক্তিপণ চেয়ে ফোন এসেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এমন কোনো ফোন আসেনি।’

      আগস্ট মাসের ৩০ তারিখ রোববার বনানী সৈনিক ক্লাব ফুটওভার ব্রিজে জুতা কিনতে গিয়ে বড় মেয়ে সাইবাকে (৪) হারিয়ে ফেলেন বিথী।

      বিথী  বলেন, ‘আগস্ট মাসের ৩০ তারিখ রোববার বিকেল আনুমানিক ৫টা। আমি আমার মাইয়া দুইডারে লইয়া বিকালে সৈনিক ক্লাব ফুটওভার ব্রিজে জুতা কিনতে গেছিলাম। বড় মেয়ের জন্য জুতা কিনতে গেছি। ছোট মেয়ের বয়স ১ বছর। ও আমার কোলে। আর বড় মেয়ের হাতটা ছেড়ে জুতা দেখছি, দাম-দর করে জুতাটা কিনছি। এরপর পিছে তাকায় দেখি আমার মেয়ে নেই। ব্রিজের ওপর ছিলাম। সঙ্গে সঙ্গেই আমার মায়েডারে খুঁজছি, যে গেল কই। খুঁজে দেখি আশপাশের কোনো জায়গায় নেই। পায়ে হেঁটে যতটুকু খোঁজা যায়, সবটুকু খুঁজছি। আশপাশে যত জায়গা আছে, সব খুঁজে ফেলেছি।’

      তিনি বলেন, ‘বনানীর সোসাইটিতে আমি কাজ করতাম। এরপর মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে আমার স্বামীকে ফোন দিয়ে বলেছি, সাইবার আব্বু, আমি তো সাইবারে পাইতেছি না। জুতা কিনতে গিয়ে হাতটা ছাড়ছি আর সাইবারে খুইজ্জা পাইতাছি না। এরপর সঙ্গে সঙ্গে ওর আব্বু চলে আসলো। আমরা দুজন মিলে অনেক খুঁজছি, কিন্তু কোথাও পাইনি। পরে ৭টার দিকে থানায় গিয়ে কইলাম—স্যার, আমার মাইয়াটা হারায় গেছে। তখন স্যার বলে, তোমাদের বাচ্চা তোমরা খেয়াল রাখো না কেন? তোমাদের বাচ্চা হারায় গেছে, এইডা কি আমরা খুঁজে দিবো? তারপর বলে, ২৪ ঘণ্টার আগে জিডি নেওয়া হয় না। যাও, আরও খোঁজো।’

      ‘তারপর আমরা গিয়ে আবার সবদিকে অনেক খুঁজলাম। রাত ১০টার দিকে আবার থানায় গিয়ে বললাম—স্যার, এমন জায়গা বাদ নেই যে খুঁজিনি। পুরো বনানী হেঁটে হেঁটে খুঁজেছি, কিন্তু আমার মাইয়ারে তো পাইলাম না। এরপরও আমার জিডি নিলো না। আমি আমার আম্মুরে ফোন দিলাম—আম্মু, আমার মাইয়াডা হারায় গেছে। থানাতো জিডি নিতেছে না। পরদিন সকালেই আম্মু চলে আসছে। এসে আমার সঙ্গে থানায় গিয়ে অনেক অনুরোধ করার পরও জিডি নিলো না। পরে আম্মু এক ম্যাডামরে ধরছে। আম্মু ম্যাডামরে সবকিছু বুঝাইয়া বললো। পরে বড় ওসির সঙ্গে কথা বইলা জিডির অনুমোদন করায় দিলো। পরে ওইদিনও জিডি হলো না। কইলো, আজকে সার্ভারের সমস্যা। আপনারা কালকে আসেন। পরদিন মঙ্গলবার আবার গেলাম। আমার মাইয়া হারাইছে রোববার আর মঙ্গলবার ৩টায় জিডিটা হাতে দেছে।’

      মহিলা পরিষদের উদ্বেগ

      এদিকে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সম্প্রতি শিশু নিখোঁজ ও গুম হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সংগঠনের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম ও সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ জানানো হয়।

      বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের নিখোঁজ ও গুম হওয়ার ঘটনা ঘটছে। নিখোঁজ শিশুদের কেউ কেউ বাড়ির সামনে খেলা করতে গিয়ে, স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে, বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের প্রলোভনের শিকার হয়ে, অপরিচিত স্থানে ঘুরতে গিয়ে পথ ভুলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হচ্ছে। চলতি বছর সাত মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশু নিখোঁজ ও গুম হয়ে যাওয়ার ঘটনা আতঙ্কজনক। উদ্বেগজনকভাবে শিশু নিখোঁজ বেড়ে যাওয়া সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা তৈরি করছে এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সূচক তৈরি করছে।

      বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা শিশু কোনো পাচার চক্রের শিকার হচ্ছে কি না বা কোনো অসাধু অপরাধজগতে পা রাখছে কি না, তা নিয়ে জনমনে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। আকস্মিকভাবে শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসছে।

      নিখোঁজ শিশুদের সন্ধানে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। একই সঙ্গে শিশু নিখোঁজের সঙ্গে জড়িত অপরাধী চক্রকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণসহ যথাযথ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে।

      এদিকে, সারাদেশে উদ্বেগজনক হারে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় সরকারকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ব্যারিস্টার ইশরাত হাসান সরকারকে এ নোটিশ দেন।

      এই সাত মাসে যত শিশু অপহরণ হয়েছে, তার মধ্যে বেশিরভাগ হয়েছে জয়পুরহাটে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে অপহৃত শিশুদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ জয়পুরহাটের। আমাদের যে হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার আছে, তারা তাদের বাড়ি গিয়েছে। তাদের বাবা-মায়ের কাছে এ বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছে। অধিকাংশই বলেছে, আমরা এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না।

      নোটিশে সারাদেশে উদ্বেগজনক হারে শিশু নিখোঁজের ঘটনা প্রতিরোধ, নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত সন্ধান ও উদ্ধার, কেন্দ্রীয় মিসিং চিলড্রেন ডেটাবেজ/পোর্টাল প্রতিষ্ঠা ও কার্যকর মিসিং চাইল্ড অ্যালার্ট সিস্টেম চালুসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়।

      অপহরণের চেয়ে নিখোঁজ বেশি

      শিশু নিখোঁজের বিষয়ে জানতে চাইলে মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘অপহরণের চেয়ে নিখোঁজের সংখ্যাটা বেশি। এমন অপহরণ আবার হচ্ছে না যে ওদের কাছ থেকে মুক্তিপণ চাচ্ছে।’

      ‘অনেকেই সন্তান নিখোঁজ হলে জানায় না’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই সাত মাসে যত শিশু অপহরণ হয়েছে, তার মধ্যে বেশিরভাগ হয়েছে জয়পুরহাটে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে অপহৃত শিশুদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ জয়পুরহাটের। আমাদের যে হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার আছে, তারা তাদের বাড়ি গিয়েছে। তাদের বাবা-মায়ের কাছে এ বিষয়ে কথা বলতে চেয়েছে। অধিকাংশই বলেছে, আমরা এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না। জয়পুরহাটের কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে চায়নি। বলে, আমাদের শিশু নিখোঁজ হয়েছে, আমরা কাউকে বলিনি, থানায় যাইনি—আপনারা কেন আমাদের ঝামেলা করছেন।’

      তিনি বলেন, ‘যদি আইনি ঝামেলা বা জিডি করতে গিয়ে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়, সে ক্ষেত্রে আমাদের বললে আমরা তাদের সহযোগিতা করবো।’

      মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

      শিশু ও কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. সাদিয়া আফরিন জাগো নিউজকে বলেন, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বাবা-মায়ের সঙ্গে মতপার্থক্য বা দ্বন্দ্ব, স্কুলে বুলিং এবং পারিবারিক পরিবেশে সমস্যা থাকলে অনেক সময় এ ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ বা দাম্পত্য কলহের কারণেও শিশুরা আবেগীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। তখন রাগ বা আবেগের বশে হঠাৎ বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে চলে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

      তিনি বলেন, আচরণগত সমস্যার ক্ষেত্রে অনেক সময় শিশুরা এতটাই আবেগপ্রবণ ও সিদ্ধান্তে আবেগনির্ভর হয়ে পড়ে যে, বাবা-মায়ের অনুমতি ছাড়াই বাসার বাইরে চলে যায়। কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে পরিবারে যতটা নিরাপদ, বাইরের জগৎ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, এ বিষয়ে যথেষ্ট পরিপক্বতা থাকে না। ফলে তাদের সহজেই ফুসলিয়ে কোথাও নিয়ে যাওয়া বা অপহরণ করা সম্ভব হয়।

      ডা. সাদিয়া আফরিন বলেন, শিশু অপহরণ বা তাদের শিশুশ্রমে নিয়োজিত করা বড় ধরনের অপরাধ। তাই পরিবারে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের আবেগীয় ও সামাজিক পরিবর্তন সম্পর্কে বাবা-মায়ের সচেতন থাকা জরুরি। রাগের সময় ‘বাসা থেকে বের হয়ে যা’, এ ধরনের কথা বলা থেকেও অভিভাবকদের বিরত থাকতে হবে।

      তিনি আরও বলেন, শিশু হঠাৎ চুপ হয়ে গেলে, অতিরিক্ত রাগারাগি করলে বা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। কিশোর-কিশোরীদের মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তন সম্পর্কে অভিভাবকরা সচেতন হয়ে তাদের বোঝার চেষ্টা করলে রাগের বশে বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়া বা দীর্ঘ সময় অনুমতি ছাড়া বাইরে থাকার প্রবণতা কমানো সম্ভব।