‘বন্ধুত্বই সবকিছু। বন্ধুত্ব প্রতিভার চেয়েও বড়, সরকারের চেয়েও বেশি, আর প্রায় পরিবারের সমান গুরুত্বপূর্ণ।’ বন্ধুত্ব নিয়ে মারিও পুজোর এ উক্তি অতিরঞ্জিত নয় তাদের কাছে, যাদের অন্তত একজন ভালো বন্ধু আছে। কারণ, সত্যিকারের ভালোবাসা যতই বিরল হোক, সত্যিকারের বন্ধুত্ব তার চেয়েও বিরল। এ কথাটিও আমার নয়। বন্ধু সম্পর্কে এ অনুধাবনটি আইনস্টাইনের।
পৃথিবীতে জন্ম নিয়েই আমরা সম্পর্কের এক দীর্ঘ ভূগোলে প্রবেশ করি—মা, বাবা, ভাই, বোন, স্বজন; তারপর একদিন, প্রায় অজান্তেই, সেই ভূগোলে এসে পড়ে এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই, অথচ যার কাছে নিজের জীবনের অনেক অপ্রকাশিত কথার ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায়। আমরা তার নাম দিই বন্ধু—ভালোবেসে ডাকি ‘বন্ধু আমার’।
দার্শনিকরা বন্ধুত্বের সংজ্ঞা খুঁজেছেন, সাহিত্যিকরা তার গল্প লিখেছেন, সিনেমা তাকে কখনো রাস্তায়, কখনো জেলের অন্ধকারে, কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে, কখনো শৈশবের মাঠে দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু বন্ধুত্ব শেষ পর্যন্ত ঠিক কোনো সংজ্ঞায় ধরা দেয়নি।
বন্ধুত্বের কোনো জন্মসনদ নেই, কোনো উত্তরাধিকার নেই, নেই সামাজিক চুক্তির বাধ্যবাধকতাও। তাই বোধহয় মানুষের তৈরি সম্পর্কগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বই সবচেয়ে স্বাধীন, আবার সবচেয়ে গভীর। আমরা বন্ধুকে বেছে নিই—কখনো একটি বেঞ্চে পাশাপাশি বসে, কখনো একই বইয়ের ভেতর দিয়ে, কখনো একই স্বপ্নে, কখনো নিছক একটি হাসিতে। তারপর বুঝতে পারি, মানুষটি ধীরে ধীরে আমাদের জীবনের এমন এক অংশ হয়ে উঠেছে, যাকে আলাদা করে দেখলে নিজেরই কিছুটা অনুপস্থিত মনে হয়।
লর্ড অব দ্য রিংস সিনেমায় রিং ধ্বংস করতে যাচ্ছে দুই বন্ধু—ফ্রোডো ও স্যাম। মাউন্ট ডুমের ঢালে যখন ফ্রোডো রিংয়ের ভারী ও ক্ষতিকর চাপে প্রায় অচেতন হয়ে পড়ে, তখন বন্ধু স্যামের সেই বিখ্যাত উচ্চারণ ‘তোমার এটা আমি বহন করতে পারব না, কিন্তু তোমাকে বহন করতে পারব।’ এই বলে সে ফ্রোডোকে কাঁধে তুলে নেয়। বন্ধু এমনই—যখন পৃথিবীর সবাই চলে যায়, তখনো একজন থাকে। বলে, ‘বন্ধু, আমি আছি।’
বন্ধুত্বের এই চিরন্তন সম্পর্ককে খানিকটা আলাদা করে মূল্যায়ন করার জন্য প্রতি বছর আগস্ট মাসের প্রথম রোববার বাংলাদেশে বন্ধুত্ব দিবস পালন করা হয়। তবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০ জুলাই অর্থাৎ আজকের দিনটিকে বিশ্ব বন্ধুত্ব দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
জীবনে বন্ধু শুধু আনন্দের সঙ্গী নয়। সে আমাদের আমাদের বোকামি, ব্যর্থতা, ভয়, স্বপ্ন, পরাজয় এবং ফের উঠে দাঁড়ানোর সাক্ষী। কখনো সে আমাদের সঙ্গে হাঁটে, কখনো আমরা পড়ে গেলে পিঠে তুলে নেয়; আবার কখনো সবচেয়ে ভালো বন্ধুটিই আমাদের নিজের অচেনা জীবনের দিকে ঠেলে দিয়ে বলে—যাও, তোমার পৃথিবীটা খুঁজে নাও।
জীবনে কত মানুষ আসে, কত মানুষ হারিয়ে যায়। কারও সঙ্গে সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে মুছে যায়, কারও সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়, কেউ কেউ চলে যায় চিরতরে। কিন্তু কিছু বন্ধু থেকে যায়—কখনো পাশে, কখনো দূরে, কখনো শুধু স্মৃতির মধ্যে। তাদের সঙ্গে কাটানো কোনো এক বিকেল, কোনো বৃষ্টিভেজা রাস্তা, কোনো অকারণ হাসি, কিংবা গভীর রাতে বলা একটি বাক্য বহু বছর পরও হঠাৎ মনে পড়ে যায়। তখন মনে হয়, বন্ধুত্ব হয়তো মানুষের জীবনে সময়ের চেয়ে বড় কোনো জিনিসের নাম।
তবে পৃথিবীতে বন্ধুত্ব যে কেবল বন্ধুতে বন্ধুতেই সীমাবদ্ধ—তেমনও নয়। অন্য সম্পর্কগুলোর মধ্যেও বন্ধুত্বের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। এমনকি মানুষ বন্ধুত্বকে ভালোবেসেই অন্যান্য সম্পর্কের মধ্যেও তাকে পেতে চায়। বলা হয় বাবা-মার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে, অফিসেও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশের প্রত্যাশা করা হয়, পেলে খুশি হয় মানুষ। অর্থাৎ বন্ধুত্ব একটা আশ্রয়, বন্ধুত্ব যেন এক শরণার্থী শিবির। জীবনের শরণাগতকে বন্ধু বুকে টেনে নেয়। আর ভাই-বোনের বন্ধুত্বের বিষয়টাতো সবারই জানা।
সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ‘পথের পাঁচালী’ সিনেমাটি প্রচলিত অর্থে ‘বন্ধুত্বের সিনেমা’ নয়। কিন্তু সেখানে ভাই-বোন অপু-দুর্গার সম্পর্কের মধ্যে যে বন্ধুত্ব, দুষ্টুমি, গোপন অভিযান ও পৃথিবী আবিষ্কারের আনন্দ আছে—তা বাংলা সিনেমার সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী সম্পর্কগুলোর একটির মর্যাদা পেয়েছে। আবার নারী-পুরুষ ভেদে বন্ধুত্বের আচরণ ও অভিজ্ঞতাগত আলাদা বৈশিষ্ট্যও চিহ্নিত করা যায়।
কখনো কখনো দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরে বন্ধু হয়ে ওঠে, আবার স্বভাব, ভালোলাগা কিংবা অন্য কোনো মিল থেকেও মানুষ বন্ধুকে খুঁজে পায়। আবার সত্যজিৎ রায়ের আরেক বিখ্যাত ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ সিনেমায় দেখা যায় যে, গুপী ও বাঘা বন্ধুত্ব শুরুই হয় নির্বাসন ও একাকিত্ব থেকে। দুজন অদ্ভুত, অযোগ্য বলে সমাজ থেকে বাদ পড়ে; তারপর একসঙ্গে হয়ে যায় অসাধারণ জুটি। দেখা যাচ্ছে যে, পৃথিবী যাকে অযোগ্য বলে বাদ দেয়, একজন বন্ধু তার মধ্যেই নিজের মানুষটিকে খুঁজে পায়। গুপী ও বাঘাকে আবার আমরা দেখি ‘হিরক রাজার দেশে’। এখানে তাদের বন্ধুত্ব আরও পরিণত। তারা শুধু একে অপরের সঙ্গী নয়; অন্যায়ের বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়ায়।
বন্ধুত্বের সম্পর্কের গভীরতা ও বৈচিত্র্য যেমন অসীম, তেমনি বন্ধু হওয়ার স্থানেরও কোনো সীমানা নেই। শ্রেণিকক্ষ থেকে বন্ধু হয়, আবার বন্ধুত্ব হয়ে যায় রণাঙ্গনেও।
দার্শনিক-চিন্তাবিদদের হাজার বছরের বৌদ্ধিক যাত্রায় প্লেটো থেকে আধুনিক দর্শন পর্যন্ত বন্ধুত্বেকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি নানান মোড় নিয়েছে—কিন্তু তার মৌলিক রহস্যটি থেকে গেছে অধরা। কাহলিল জিবরান বলেছিলেন, ‘তোমার বন্ধু হলো তোমার প্রয়োজনের উত্তর।’ কিন্তু বন্ধুত্ব কি প্রয়োজন থেকে জন্ম নেয়, নাকি ভালোবাসা থেকে? মানুষের মনে এই প্রশ্ন বহুদিনের। এমন প্রশ্ন প্লেটোও করেছেন তার ‘লাইসিস’-এ। আবার এটাও সত্যি যে, কারণ খুঁজতে গেলে বন্ধুত্বের রহস্যটাই নষ্ট হয়ে যায়। সেজন্য অনেকে এটা ভেবেই শান্তি পান, বন্ধু তো বন্ধুই, তার আবার সংজ্ঞা কী! বিশ্ববিখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলীর কথায় এ রহস্যের কিছুটা উপশম হয় বোধহয়। তিনি বলেন, ‘বন্ধুত্ব এমন এক জিনিস, যার ব্যাখ্যা দেওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। এটা স্কুলে শেখা যায় না। কিন্তু তুমি যদি বন্ধুত্বের অর্থই না শেখো, তাহলে সত্যিকার অর্থে তুমি কিছুই শেখোনি।’ বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার এই পার্থক্যকে স্পষ্ট করতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও কলম ধরেছেন। তিনি তার ‘বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা’ নামক রচনায় লিখেছেন, ‘বন্ধুত্ব ও ভালোবাসায় অনেক তফাৎ আছে, কিন্তু ঝট্ করিয়া সে তফাৎ ধরা যায় না। বন্ধুত্ব আটপৌরে, ভালোবাসা পোষাকি। বন্ধুত্বের আটপৌরে কাপড়ের দুই-এক জায়গায় ছেঁড়া থাকিলেও চলে, ঈষৎ ময়লা হইলেও হানি নাই, হাঁটুর নিচে না পৌঁছিলেও পরিতে বারণ নাই। গায়ে দিয়া আরাম পাইলেই হইল। কিন্তু ভালোবাসার পোষাক একটু ছেঁড়া থাকিবে না, ময়লা হইবে না, পরিপাটি হইবে। বন্ধুত্ব নাড়াচাড়া টানাছেঁড়া তোলাপাড়া সয়, কিন্তু ভালোবাসা তাহা সয় না।’ তবে আলবেয়ার কামু তার ‘দ্য রেবেলে’ বলে দিয়েছেন, ‘Friendship is a form of love’। আর ফরাসি সাহিত্যিক মনটেইন সেখানে বলেছেন, ‘সত্যিকারের বন্ধুত্বের কোনো কারণই নেই।’ নিজের বন্ধুর সঙ্গে তার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কেন আমরা কোনো কোনো মানুষকে এত গভীরভাবে ভালোবাসি যে, সেই ভালোবাসার কারণও ব্যাখ্যা করতে পারি না?’
আলবেয়ার কামু লিখেছিলেন, ‘আমার সামনে হেঁটো না, আমি হয়তো তোমাকে অনুসরণ করতে পারব না। আমার পেছনেও হেঁটো না, হয়তো তোমাকে পথ দেখাতে পারব না। বন্ধু হয়ে আমার পাশে হাঁটো।’ বন্ধুত্ব এভাবেই আমাদের পৃথিবীতে হাঁটার পথকে সুগম করে দেয়।
এরিস্টটল বন্ধুকে দেখেছেন নিজেরই অন্য সত্তা হিসেবে। বন্ধুত্বকে তিনি মানুষের সুখী জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখেছেন। তিনি বন্ধুত্বের তিনটি স্তর আলাদা করেন—উপকারের বন্ধুত্ব, আনন্দের বন্ধুত্ব, গুণ বা চরিত্রের বন্ধুত্ব অর্থাৎ, আমি তোমাকে ভালোবাসি তুমি যে মানুষটি, সেই মানুষটির জন্য।
রোমান পণ্ডিত সিসেরোর কাছে সত্যিকারের বন্ধুত্ব তৈরি হয় বিশ্বাস, চরিত্র, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নৈতিক সামঞ্জস্যের ওপর। যে মানুষ তোমার আনন্দ ভাগ করে, সে বন্ধু হতে পারে; কিন্তু যে মানুষ তোমার দুর্বলতা জেনেও তোমাকে ছেড়ে যায় না, তার সঙ্গে বন্ধুত্ব অন্য মাত্রার।
বন্ধুত্বকে ভিন্ন আরেকটি দিক দিয়ে দেখতে চেয়েছেন দার্শনিক কিয়ের্কেগার্দ। তার একটি লেখা আছে ‘ইউ শ্যাল লাভ ইওর নেইবর’ নামে। যেখানে বন্ধুত্ব বনাম প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসার তুলনামূলক চিন্তাটি বন্ধুত্বকে নৈতিক জায়গা থেকে আরেকটু ক্রিটিক্যালি দেখতে সাহায্য করে। তিনি প্রশ্ন করেন—আমি কি শুধু আমার পছন্দের মানুষকেই ভালোবাসব? অর্থাৎ, বন্ধুত্বের মধ্যে এক ধরনের নির্বাচন আছে। আর প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসা এই নির্বাচনের সীমা অতিক্রম করে। অর্থাৎ, আমি বন্ধুকে ভালোবাসি কারণ সে আমার কাছের মানুষ। কিন্তু ‘প্রতিবেশীকে ভালোবাসা’ মানে এমন মানুষকেও মানুষ হিসেবে স্বীকার করা, যে আমার পছন্দের নয়, আমার আপন নয়।
কিন্তু আমরা বলতে পারি, বন্ধু যেমন আমরা নির্বাচন করি, তেমনি পৃথিবীর এই দুর্বিপাকে দৈবক্রমেও আমরা পেয়ে যাই পরম বন্ধুর সন্ধান। তারপর সে বন্ধুত্বে ‘আমি’ ধীরে ধীরে ‘আমরা’ হয়ে ওঠে। তোমার আনন্দ তার আনন্দ হয়। তার অপমান তোমাকে আহত করে। তার সাফল্যে তোমার নিজের মতো আনন্দ হয়। এখানে ব্যক্তিগত সত্তা বিলীন হয় না, বরং দুটি স্বাধীন সত্তার মধ্যে একটি যৌথ জগৎ তৈরি হয়। কখনো বন্ধু আমাদের মুক্ত করে নিজের ভেতরের কারাগার থেকে। পৃথিবীকে নতুন আলোয় দেখার, নতুন সম্ভাবনার পৃথিবী গড়ার শক্তি জোগায় বন্ধু। বন্ধুত্বের জয় হোক।
অনলাইন ডেস্ক 







