ঢাকা ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আজ শিব রাত্রি ; জেনে নিন ইতিহাস

আজ শিব রাত্রি । শিব চুতদর্শীর এ রাত্রিতে আজ উপমহাদেশের লক্ষ লক্ষ নারী পুরুষ শিবের মাথায় দুধ ,ডাবের জল ঢেলে এবং ফুল ও বেলপাতা দিয়ে শিবের পূজা করে। প্রথমেই আসি শিবের লিঙ্গ পূজার বিষয়টি নিয়ে লিঙ্গ শব্দের আমরা শুধু একটি অর্থ জানি তা হলো জননেন্দ্রিয় এবং ব্যকরণগত অর্থ হলো পুংস্তত্ব বা স্ত্রীত্ব জ্ঞাপক অর্থ। লিঙ্গ শব্দের যে আরো অর্থ হতে পারে তার কোন চিন্তা আমরা করি না। লিঙ্গ শব্দের আরেকটি অর্থ হলো সূক্ষ দেহ। এই দেহটিতে যুক্ত আছে পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়,৫টি কর্মেন্দ্রিয় এবং ৫ টি প্রাণ অপান বায়ু ,মন ও বুদ্ধি-মোট ১৭ টি অবয়ব যুক্ত দেহ। সকল সৃষ্টিরই সূক্ষ শরীর আছে। আমাদের যখন মৃত্যু হয় তখন জীবাত্মা সূক্ষ শরীরে বিচরণ করেন এবং পুনরায় দেহ ধারণ করেন। শিব রুদ্র ও মহাদেব এই তিনটি নামই আমাদের মধ্যে বেশি পরিচিত। যে সূক্ষ শরীরকে আমরা লিঙ্গ বলে পূজা করি তা সৃষ্টির সূক্ষ শরীর প্রকৃতিতে বীজ বপনরূপ সূক্ষ বিষয়টিকে দেখানো হয়েছে। এখানে স্ত্রী- পুরুষের মিলিত অঙ্গ নয়। বিশেষভাবে লক্ষ্য করলে তা অনুধাবন করা যায়। আমাদের প্রচলিত ধারনায় যা আসে তাকে আমরা সহজে ভুলতে পারি না। যে সূক্ষ শরীরে ১৭ টি গুণ নিয়ে অবস্থা করছেন তার পুনরায় স্থুল দেহ ধারণ অন্যদিকে প্রকৃতিতে অর্থাৎ মাটিতে বীজ বপণ কারণে বীজের সেই সূক্ষ এবং সুপ্ত শক্তিই অংকুরিত হয়ে বৃক্ষাদি শস্যাদি রূপ ফল আমাদের দেন। প্রত্যেক দেব-দেবীর বা সৃষ্টির এরূপ সূক্ষ দেহ আছে, সেই দেহের আহ্ববান করি ঘটে, পটে(ছবিতে), মূর্তিতে। শিবলিঙ্গও তদ্রুপ সৃষ্টির সূক্ষ দেহ।

শিব লিঙ্গ পূজার তাৎপর্য কি?
শিব পূজা দু’রকম ভাবেই হয় । মূর্তি এবং লিঙ্গ। পূবেই বলা হয়েছে লিঙ্গ শব্দে অনেক গুলো অর্থ আছে। লিঙ্গ শব্দের অর্থ চিহ্ন বা প্রতীক। সাকার রূপে এরূপ লিঙ্গ শরীর বা চিহ্ন আমরা সর্বত্রই ব্যবহার করি। একটি দেশের পরিচয় বহন করে একটি পতাকা। বিষ্ণুমন্ত্রের যারা অনুসারী তাদের পরিচয় তারা দেন দেহতে তিলক ফোঁটা অঙ্কিত করে। ঘটে আমরা দেবদেবীর পুত্তলী এঁকে দেবতার চিহ্ন বা প্রতীক বসাই। এরূপ দুটি প্রতীক বা লিঙ্গ বা চিহ্ন আমরা পূজায় ব্যবহার করি। একটি শিব লিঙ্গ আরেকটি নারায়ণ শিলা। শিব লিঙ্গের গঠন প্রণালী সহজ হওয়ায় মূর্তি তৈরী থেকে লিঙ্গ পূজায় আমরা আগ্রহী বেশি। মাটি দিয়ে অতি সহজে অল্প সময়ে এ প্রতীক তৈরী করা যায় এবং পূজান্তে বিসর্জনও দেয়া যায়। কিন্তু প্রতীকটির নাম লিঙ্গ দেয়াতে আমাদের মধ্যে এ নিয়ে নীল সাহিত্য গড়ে উঠেছে যা সত্যিই দু:খজনক। অথচ একই প্রতীক ব্যবহৃত হচ্ছে নারায়ণ পূজায়, তাঁকে নিয়ে এরূপ আচারণ আমরা করি না। বিশেষ করে শিব-এর সঙ্গে সৃষ্টির কার্যক্রম যুক্ত থাকাতে আমরা লিঙ্গ শব্দটিকে একেবারে পার্থিব কাজের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছি। এ বিভ্রান্তি থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে এবং আমাদের শিবত্বে উন্নীত হতে হবে।

মহা শিবরাত্রির ইতিহাসঃ
অতি প্রাচীন কালে কাশী তে এক নিষ্ঠুর ব্যাধ থাকত ।একদিন শিকারে গিয়ে দেরি হওয়ায় সে সারা রাত একটি গাছে আশ্রয়ে নেয়।যে গাছ টি তে আশ্রয়ে নেয় সেটি ছিল বেল্গাছ।সে সারারাত ধরে কন শিকার না পেয়ে বেল গাছের একটা একটা করে পাতা ছিঁড়ে নীচে ফেলে ছিল।আর সেখানে ছিল একটি শিবলিঙ্গ।আর দিনটি ছিল মহা শিব্রাত্রি।ব্যাধ সারাদিন কিছু না খেয়েই ছিলেন।শিবের মাথায়ে বেলপাতা গুলি পরার ফলে অজান্তেই ব্যাধ সেদিন তার শিবরাত্রি র ব্রত পালন করে ছিল।পরে কিছু দিন পর তিনি মারা গেলে যমদূত রা তাকে নিয়ে আসে কিন্তু যেহেতু সে শিবরাত্রির ব্রত করে ছিল তাই যমরাজ তাকে মুক্তি দেন।এই হল শিব রাত্রি র ইতিহাস।

শিব কে?
শিব শব্দটির উল্লেখ বেদে আছে তবে তা রুদ্রের বিশেষণে। পৌরাণিক শিব এবং বৈদিক রুদ্র অভিন্ন। শ্রী বিষ্ণুর অবতার তত্ত্বের তিনটি স্তর ইচ্ছা শক্তি,জ্ঞানশক্তি ও ক্রিয়া শক্তি। পরম পুরুষের এগুলো জাগ্রত হওয়াতেই তিনি সৃষ্টি করার প্রেরণা পেলেন এবং তার দ্বিতীয় সত্তার অবতার হলো-গুণাবতার। সত্ত্ব বিষ্ণু, রজ ব্রহ্মা এবং তম রুদ্রই। বিষ্ণু পালন কর্তা ,ব্রহ্মা সৃষ্টিকর্তা এবং রুদ্র প্রলয় কর্তা হলেন। পরবর্তীতে এই রুদ্রই শিবে পরিণত হন। শিব কে এ প্রশ্ন দক্ষ প্রজাপতির মনেও জেগেছিল। তিনি শিব ছাড়াই যজ্ঞ সম্পাদন করবেন এই মানসে তাঁকে মানে শিব কে নিমন্ত্রণ করলেন না । তার যজ্ঞ পণ্ড হলো। কবি গুণাকর ভারতচন্দ্র প্রজাপতি দক্ষের মুখে শিবনিন্দা করাতে এরূপ গোলমালে পড়লেন। পরস্পর বিরোধী বিচিত্র তাঁর চরিত্র। ইনি কি তপস্বী? তপস্বী হলে অস্ত্রধারণ করেন এবং কৈলাশ তাঁর গৃহ কেন? ইনি কি গৃহী? অতিথি সেবা ইনি করেন না। ব্রহ্মচারী নন কারণ তিনি বিবাহ করেছেন। তিনি বেদজ্ঞ নন তাই ব্রাহ্মণ বলা যায় না। রক্ষার পরিবর্তে তিনি ধ্বংস করেন প্রলয়ে। ধনোপার্জন করেন না তাই বৈশ্য বলা চলে না। গলয় নাগের পৈতা তাই শূদ্র বলা যাবে না এবং ব্রাহ্মণগণ এঁকে প্রণাম করেন। দক্ষ যজ্ঞে আত্মাহুতি দেয়া সতীর দেহকে নিয়ে শিবের বিলাপ ও ভ্রমণকালে বিষ্ণুর চক্রে খণ্ডিত সতীর দেহ ৫১ টি স্থানে পতিত হয়ে ৫১ টি পীঠস্থান রূপে আজও শ্রদ্ধা ভরে পূজিত হচ্ছে। শিব ভৈরবরূপে এ সকল দেবী-পীঠসমূহ রক্ষা করছেন।

শিব নীল কণ্ঠ । কীভাবে হলেন?
দেবতাগণ অমৃত লাভের আশায় সমুদ্রমন্হন করলেন। সমুদ্র মন্থনে প্রথমেই উত্থিত হলো গরল। এ বিষরাশির তেজে সমগ্র পৃথিবী ধ্বংস হবার আশঙ্কা দেখা দিল। সকল দেবগণ আত্মভোলা শিবকে ধরলেন এর ব্যবস্থা নিতে। শিব বিনা বাক্য ব্যয়ে এই বিষরাশি পান করে স্বীয় কণ্ঠে ধারণ করলেন। ফলে কণ্ঠদেশ নীলবর্ণ হলো, সে থেকেই শিব নীল কণ্ঠ। শিবের এক নাম ভূত নাথ। ভূত অর্থ প্রাণী, তিনি প্রাণিজগতের পালক। তাঁর কাছে উচুঁ নিচু নেই। তিনি সর্বভূতে সমদর্শী। শিব পূজায় জাতিকুলের বিচার নেই। উপাচার আড়ণ্বর না হলেও চলে । একটু গঙ্গা জল, বিল্বপত্র অর্ঘ্য স্বরূপ দিলেই তিনি সন্তষ্ট। তাই তিনি আশুতোষ। শিবেন নিত্য তাণ্ডব। তিনের সমন্বয়ে হয় নাটক। শিবের বাদ্য যন্ত্রের নাম ডমরু। নাট্যশাস্ত্রের আদি প্রবক্তা শিব। শিব ব্রহ্মাকে প্রথম নাট্যবেদ শিক্ষা দিয়েছিলেন। ব্রহ্মা ভরতমুনিকে বলেন এবং ভরতমুনি পৃথিবীতে নাট্যসূত্র প্রচার করেন।

শিবের হাতে ত্রিশূল কেন?
বস্তত শিবের পরিচয় ত্রিশূলেই বিজ্ঞাপিত। ত্রিশূলের তাৎপর্য কি? শাস্ত্র বলে ত্রিশূল হলো কুঞ্চিকা বা চাবি। মানুষ সিন্দুকে ধনরত্ন রেখে প্রয়োজনে চাবি দিয়ে তা উন্মুক্ত করে ধনরত্ন বের করে । শিবের ঐশ্বর্য- ভাণ্ডার তত্ত্বময়। সে তত্ত্বগুণময় ও গুণাতীত। ত্রিশূলের ৩টি ফলক- সত্ত্ব,রজ,তমোগুণের প্রতীক। কিন্তু ঐ তিনটি ফলক একটি মাত্র সোজা দণ্ড দ্বারা গ্রথিত। সোজা দণ্ডটিই গুণাতীত তত্ত্বের প্রকাশক। ৩ টি ফলক সৃষ্টি,স্থিতি ও লয়ের প্রতীক এবং সত্ত্ব গুণময় ফলকে আছেন বিষ্ণু, রজগুণময় ফলকে আছেন ব্রহ্মা এবং তমোগুণময় ফলকে আছেন সংহার দেবতা রুদ্র। শিবের ত্রিশূল এই ত্রিশক্তির আধার স্বরুপ। এক শিব তত্ত্বেই ত্রয়ী তত্ত্বের সমাহার।

শিবের বাহণ বৃষভ বা ষাড় কেন?
স্বাভাবিক অবস্থায় বৃষ শান্ত,নিরীহ,অনুগত,লোকহিতকারী,কৃষি ও পরিবহণ কাজে গৃহস্থের নিত্য সহায়ক। ক্রুদ্ধঅবস্থায় বৃষভ দুর্ধর্ষ,ভীষণ সংহার মূর্তি, বীর্যবান। একারণেই বৃষভ হয়েছে শিবের বাহন। “বৃষভ” শব্দটির অর্থ বলবান এবং শুক্রল। কৃষি,পরিবহণের কাজের দ্বারা যেমন সে গৃহস্তের উপকার করে তেমনি প্রজননের ক্ষেত্রেও তার প্রয়োজন। একটি বৃষ বহু গাভীর কামনা পূরণে সমর্থ। আশুতোষ শিব নিত্য বরদ, তিনি ভক্তগণের কামনা বা অভীষ্ট পূরণে সদা তৎপর। ভক্তের মঙ্গল বিধানে তিনি অভীষ্টবর্ষী। তাই “বৃষভ” শিবের বাহন যুক্তিযুক্ত।

 

Tag :

আজ শিব রাত্রি ; জেনে নিন ইতিহাস

Update Time : ১২:০৮:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ মার্চ ২০২২

আজ শিব রাত্রি । শিব চুতদর্শীর এ রাত্রিতে আজ উপমহাদেশের লক্ষ লক্ষ নারী পুরুষ শিবের মাথায় দুধ ,ডাবের জল ঢেলে এবং ফুল ও বেলপাতা দিয়ে শিবের পূজা করে। প্রথমেই আসি শিবের লিঙ্গ পূজার বিষয়টি নিয়ে লিঙ্গ শব্দের আমরা শুধু একটি অর্থ জানি তা হলো জননেন্দ্রিয় এবং ব্যকরণগত অর্থ হলো পুংস্তত্ব বা স্ত্রীত্ব জ্ঞাপক অর্থ। লিঙ্গ শব্দের যে আরো অর্থ হতে পারে তার কোন চিন্তা আমরা করি না। লিঙ্গ শব্দের আরেকটি অর্থ হলো সূক্ষ দেহ। এই দেহটিতে যুক্ত আছে পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়,৫টি কর্মেন্দ্রিয় এবং ৫ টি প্রাণ অপান বায়ু ,মন ও বুদ্ধি-মোট ১৭ টি অবয়ব যুক্ত দেহ। সকল সৃষ্টিরই সূক্ষ শরীর আছে। আমাদের যখন মৃত্যু হয় তখন জীবাত্মা সূক্ষ শরীরে বিচরণ করেন এবং পুনরায় দেহ ধারণ করেন। শিব রুদ্র ও মহাদেব এই তিনটি নামই আমাদের মধ্যে বেশি পরিচিত। যে সূক্ষ শরীরকে আমরা লিঙ্গ বলে পূজা করি তা সৃষ্টির সূক্ষ শরীর প্রকৃতিতে বীজ বপনরূপ সূক্ষ বিষয়টিকে দেখানো হয়েছে। এখানে স্ত্রী- পুরুষের মিলিত অঙ্গ নয়। বিশেষভাবে লক্ষ্য করলে তা অনুধাবন করা যায়। আমাদের প্রচলিত ধারনায় যা আসে তাকে আমরা সহজে ভুলতে পারি না। যে সূক্ষ শরীরে ১৭ টি গুণ নিয়ে অবস্থা করছেন তার পুনরায় স্থুল দেহ ধারণ অন্যদিকে প্রকৃতিতে অর্থাৎ মাটিতে বীজ বপণ কারণে বীজের সেই সূক্ষ এবং সুপ্ত শক্তিই অংকুরিত হয়ে বৃক্ষাদি শস্যাদি রূপ ফল আমাদের দেন। প্রত্যেক দেব-দেবীর বা সৃষ্টির এরূপ সূক্ষ দেহ আছে, সেই দেহের আহ্ববান করি ঘটে, পটে(ছবিতে), মূর্তিতে। শিবলিঙ্গও তদ্রুপ সৃষ্টির সূক্ষ দেহ।

শিব লিঙ্গ পূজার তাৎপর্য কি?
শিব পূজা দু’রকম ভাবেই হয় । মূর্তি এবং লিঙ্গ। পূবেই বলা হয়েছে লিঙ্গ শব্দে অনেক গুলো অর্থ আছে। লিঙ্গ শব্দের অর্থ চিহ্ন বা প্রতীক। সাকার রূপে এরূপ লিঙ্গ শরীর বা চিহ্ন আমরা সর্বত্রই ব্যবহার করি। একটি দেশের পরিচয় বহন করে একটি পতাকা। বিষ্ণুমন্ত্রের যারা অনুসারী তাদের পরিচয় তারা দেন দেহতে তিলক ফোঁটা অঙ্কিত করে। ঘটে আমরা দেবদেবীর পুত্তলী এঁকে দেবতার চিহ্ন বা প্রতীক বসাই। এরূপ দুটি প্রতীক বা লিঙ্গ বা চিহ্ন আমরা পূজায় ব্যবহার করি। একটি শিব লিঙ্গ আরেকটি নারায়ণ শিলা। শিব লিঙ্গের গঠন প্রণালী সহজ হওয়ায় মূর্তি তৈরী থেকে লিঙ্গ পূজায় আমরা আগ্রহী বেশি। মাটি দিয়ে অতি সহজে অল্প সময়ে এ প্রতীক তৈরী করা যায় এবং পূজান্তে বিসর্জনও দেয়া যায়। কিন্তু প্রতীকটির নাম লিঙ্গ দেয়াতে আমাদের মধ্যে এ নিয়ে নীল সাহিত্য গড়ে উঠেছে যা সত্যিই দু:খজনক। অথচ একই প্রতীক ব্যবহৃত হচ্ছে নারায়ণ পূজায়, তাঁকে নিয়ে এরূপ আচারণ আমরা করি না। বিশেষ করে শিব-এর সঙ্গে সৃষ্টির কার্যক্রম যুক্ত থাকাতে আমরা লিঙ্গ শব্দটিকে একেবারে পার্থিব কাজের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছি। এ বিভ্রান্তি থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে এবং আমাদের শিবত্বে উন্নীত হতে হবে।

মহা শিবরাত্রির ইতিহাসঃ
অতি প্রাচীন কালে কাশী তে এক নিষ্ঠুর ব্যাধ থাকত ।একদিন শিকারে গিয়ে দেরি হওয়ায় সে সারা রাত একটি গাছে আশ্রয়ে নেয়।যে গাছ টি তে আশ্রয়ে নেয় সেটি ছিল বেল্গাছ।সে সারারাত ধরে কন শিকার না পেয়ে বেল গাছের একটা একটা করে পাতা ছিঁড়ে নীচে ফেলে ছিল।আর সেখানে ছিল একটি শিবলিঙ্গ।আর দিনটি ছিল মহা শিব্রাত্রি।ব্যাধ সারাদিন কিছু না খেয়েই ছিলেন।শিবের মাথায়ে বেলপাতা গুলি পরার ফলে অজান্তেই ব্যাধ সেদিন তার শিবরাত্রি র ব্রত পালন করে ছিল।পরে কিছু দিন পর তিনি মারা গেলে যমদূত রা তাকে নিয়ে আসে কিন্তু যেহেতু সে শিবরাত্রির ব্রত করে ছিল তাই যমরাজ তাকে মুক্তি দেন।এই হল শিব রাত্রি র ইতিহাস।

শিব কে?
শিব শব্দটির উল্লেখ বেদে আছে তবে তা রুদ্রের বিশেষণে। পৌরাণিক শিব এবং বৈদিক রুদ্র অভিন্ন। শ্রী বিষ্ণুর অবতার তত্ত্বের তিনটি স্তর ইচ্ছা শক্তি,জ্ঞানশক্তি ও ক্রিয়া শক্তি। পরম পুরুষের এগুলো জাগ্রত হওয়াতেই তিনি সৃষ্টি করার প্রেরণা পেলেন এবং তার দ্বিতীয় সত্তার অবতার হলো-গুণাবতার। সত্ত্ব বিষ্ণু, রজ ব্রহ্মা এবং তম রুদ্রই। বিষ্ণু পালন কর্তা ,ব্রহ্মা সৃষ্টিকর্তা এবং রুদ্র প্রলয় কর্তা হলেন। পরবর্তীতে এই রুদ্রই শিবে পরিণত হন। শিব কে এ প্রশ্ন দক্ষ প্রজাপতির মনেও জেগেছিল। তিনি শিব ছাড়াই যজ্ঞ সম্পাদন করবেন এই মানসে তাঁকে মানে শিব কে নিমন্ত্রণ করলেন না । তার যজ্ঞ পণ্ড হলো। কবি গুণাকর ভারতচন্দ্র প্রজাপতি দক্ষের মুখে শিবনিন্দা করাতে এরূপ গোলমালে পড়লেন। পরস্পর বিরোধী বিচিত্র তাঁর চরিত্র। ইনি কি তপস্বী? তপস্বী হলে অস্ত্রধারণ করেন এবং কৈলাশ তাঁর গৃহ কেন? ইনি কি গৃহী? অতিথি সেবা ইনি করেন না। ব্রহ্মচারী নন কারণ তিনি বিবাহ করেছেন। তিনি বেদজ্ঞ নন তাই ব্রাহ্মণ বলা যায় না। রক্ষার পরিবর্তে তিনি ধ্বংস করেন প্রলয়ে। ধনোপার্জন করেন না তাই বৈশ্য বলা চলে না। গলয় নাগের পৈতা তাই শূদ্র বলা যাবে না এবং ব্রাহ্মণগণ এঁকে প্রণাম করেন। দক্ষ যজ্ঞে আত্মাহুতি দেয়া সতীর দেহকে নিয়ে শিবের বিলাপ ও ভ্রমণকালে বিষ্ণুর চক্রে খণ্ডিত সতীর দেহ ৫১ টি স্থানে পতিত হয়ে ৫১ টি পীঠস্থান রূপে আজও শ্রদ্ধা ভরে পূজিত হচ্ছে। শিব ভৈরবরূপে এ সকল দেবী-পীঠসমূহ রক্ষা করছেন।

শিব নীল কণ্ঠ । কীভাবে হলেন?
দেবতাগণ অমৃত লাভের আশায় সমুদ্রমন্হন করলেন। সমুদ্র মন্থনে প্রথমেই উত্থিত হলো গরল। এ বিষরাশির তেজে সমগ্র পৃথিবী ধ্বংস হবার আশঙ্কা দেখা দিল। সকল দেবগণ আত্মভোলা শিবকে ধরলেন এর ব্যবস্থা নিতে। শিব বিনা বাক্য ব্যয়ে এই বিষরাশি পান করে স্বীয় কণ্ঠে ধারণ করলেন। ফলে কণ্ঠদেশ নীলবর্ণ হলো, সে থেকেই শিব নীল কণ্ঠ। শিবের এক নাম ভূত নাথ। ভূত অর্থ প্রাণী, তিনি প্রাণিজগতের পালক। তাঁর কাছে উচুঁ নিচু নেই। তিনি সর্বভূতে সমদর্শী। শিব পূজায় জাতিকুলের বিচার নেই। উপাচার আড়ণ্বর না হলেও চলে । একটু গঙ্গা জল, বিল্বপত্র অর্ঘ্য স্বরূপ দিলেই তিনি সন্তষ্ট। তাই তিনি আশুতোষ। শিবেন নিত্য তাণ্ডব। তিনের সমন্বয়ে হয় নাটক। শিবের বাদ্য যন্ত্রের নাম ডমরু। নাট্যশাস্ত্রের আদি প্রবক্তা শিব। শিব ব্রহ্মাকে প্রথম নাট্যবেদ শিক্ষা দিয়েছিলেন। ব্রহ্মা ভরতমুনিকে বলেন এবং ভরতমুনি পৃথিবীতে নাট্যসূত্র প্রচার করেন।

শিবের হাতে ত্রিশূল কেন?
বস্তত শিবের পরিচয় ত্রিশূলেই বিজ্ঞাপিত। ত্রিশূলের তাৎপর্য কি? শাস্ত্র বলে ত্রিশূল হলো কুঞ্চিকা বা চাবি। মানুষ সিন্দুকে ধনরত্ন রেখে প্রয়োজনে চাবি দিয়ে তা উন্মুক্ত করে ধনরত্ন বের করে । শিবের ঐশ্বর্য- ভাণ্ডার তত্ত্বময়। সে তত্ত্বগুণময় ও গুণাতীত। ত্রিশূলের ৩টি ফলক- সত্ত্ব,রজ,তমোগুণের প্রতীক। কিন্তু ঐ তিনটি ফলক একটি মাত্র সোজা দণ্ড দ্বারা গ্রথিত। সোজা দণ্ডটিই গুণাতীত তত্ত্বের প্রকাশক। ৩ টি ফলক সৃষ্টি,স্থিতি ও লয়ের প্রতীক এবং সত্ত্ব গুণময় ফলকে আছেন বিষ্ণু, রজগুণময় ফলকে আছেন ব্রহ্মা এবং তমোগুণময় ফলকে আছেন সংহার দেবতা রুদ্র। শিবের ত্রিশূল এই ত্রিশক্তির আধার স্বরুপ। এক শিব তত্ত্বেই ত্রয়ী তত্ত্বের সমাহার।

শিবের বাহণ বৃষভ বা ষাড় কেন?
স্বাভাবিক অবস্থায় বৃষ শান্ত,নিরীহ,অনুগত,লোকহিতকারী,কৃষি ও পরিবহণ কাজে গৃহস্থের নিত্য সহায়ক। ক্রুদ্ধঅবস্থায় বৃষভ দুর্ধর্ষ,ভীষণ সংহার মূর্তি, বীর্যবান। একারণেই বৃষভ হয়েছে শিবের বাহন। “বৃষভ” শব্দটির অর্থ বলবান এবং শুক্রল। কৃষি,পরিবহণের কাজের দ্বারা যেমন সে গৃহস্তের উপকার করে তেমনি প্রজননের ক্ষেত্রেও তার প্রয়োজন। একটি বৃষ বহু গাভীর কামনা পূরণে সমর্থ। আশুতোষ শিব নিত্য বরদ, তিনি ভক্তগণের কামনা বা অভীষ্ট পূরণে সদা তৎপর। ভক্তের মঙ্গল বিধানে তিনি অভীষ্টবর্ষী। তাই “বৃষভ” শিবের বাহন যুক্তিযুক্ত।