ঢাকা ০৩:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পঞ্চগড়ে নৌকাডুবি: মৃত্যু বেড়ে ৫০

  • অনলাইন ডেস্ক
  • Update Time : ০৪:৫৬:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২
  • ২৭০ Time View
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় করতোয়া নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় মরদেহের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। এ দুর্ঘটনায় দুই দিনে নারী ও শিশুসহ ৫০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
সোমবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাত পর্যন্ত করতোয়া নদীর পঞ্চগড় অংশ ও দিনাজপুর জেলার খানাসামা ও বীরগঞ্জ অংশ থেকে উদ্ধার করা হয় আরো ২৫টি মরদেহ। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে। নিখোঁজদের সন্ধানে তাদের স্বজনরা ভিড় করেন নদী তীরে। একটি মরদেহ উদ্ধারের সাথে সাথে সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়েন সবাই। স্থানীয়দের সাথে নিয়ে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (সোমবার রাত ৯টা) উদ্ধারকাজ চালাচ্ছিল ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দল। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে অনেকেই ভিড় করেন মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য কেন্দ্র আর নদীর তীরে। নতুন করে কোনো মরদেহ উদ্ধার হওয়ার সাথে সাথে তথ্যকেন্দ্রের বাইরে বোর্ডে ছবি লাগিয়ে দেওয়া হয়। পরিচয় নিশ্চিতের পর সেখানে নাম ও ঠিকানা লেখা হয়।
মরদেহ উদ্ধার হওয়ার সাথে সাথে তথ্যকেন্দ্রের বাইরে বোর্ডে ছবি লাগিয়ে দেওয়া হয়।
মরদেহ উদ্ধার হওয়ার সাথে সাথে তথ্যকেন্দ্রের বাইরে বোর্ডে ছবি লাগিয়ে দেওয়া হয়।

গতকাল যে ২৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে তাদের মধ্যে যাদের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে তারা হলেন, বোদা উপজেলার মাড়েয়া শালবাড়ী গ্রামের সুচিত্রা রানী (২২), আটোয়ারী উপজেলার ঝর্ণা পাল, শালডাঙ্গা মধ্য শিকারপুর গ্রামের দিপবাবু (২২), মাড়েয়া বটতলী গ্রামের জগদীশ (৩৫), মাড়েয়া আরাজী শিকারপুর গ্রামের কবিতা রানী (৩৩), মাড়েয়া গেদীপাড়া গ্রামের বেজ্য বালা ৫০), পার্শ্ববর্তি ঠাকুরগাঁও জেলার দেবীপুর মুজাবনী গ্রামের দীপশিখা রানী, মাড়েয়া শাশবাড়ী গ্রামের সুব্রত (২), বোদা কলেজপাড়ার যতি মিম্রয় রায় (১৫), বোদা উপজেলার পাঁচপীর বংশিধর পুজারী গ্রামের দেন্দা রানী, একই উপজেলার মাড়েয়া কাউয়াখাল গ্রামের সুমিত্রা রানী, চন্দনবাড়ী শিকারপুর প্রধানপাড়া গ্রামের আদরী (৫০), দেবীগঞ্জের লক্ষ্মীরহাট কেকে বাড়ির পুস্পা রানী।

গতকাল দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত ঘটনাস্থল, তথ্যকেন্দ্র ও নিহত ব্যক্তিদের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রী ও পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম সুজন। তার সাথে ছিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান, দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল, পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক জহুরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম শফিকুল ইসলাম, বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সলেমান আলীসহ জেলা, উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা। বিকেলে তারা দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাঙ্গা ইউনিয়নের ছত্র শিকারপুর হাতিডোবা গ্রামের স্বর্গীয় বীরেন চন্দ্র রায়ের বাড়িতে যান। নৌকাডুবিতে বীরেন রায়ের দুই পুত্রবধূ ও দুই নাতি মারা গেছেন। সেখানে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চারজনের জন্য এক লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করা হয়।
বীরেন চন্দ্র রায়ের বাড়িতে নিহত চারজনের জন্য চেক দিচ্ছেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান
বীরেন চন্দ্র রায়ের বাড়িতে নিহত চারজনের জন্য চেক দিচ্ছেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান

এর আগে রেলমন্ত্রী আউলিয়ার ঘাটে পূর্ব প্রতিশ্রুত ওয়াই আকৃতির সেতু নির্মাণের প্রক্রিয়া দ্রুত কার্যকরের ঘোষণা দেন। একইসঙ্গে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেদনাদায়ক এ দুর্ঘটনা সম্পর্কে অবগত আছেন এবং তিনি নিহতদের ও আহতদের পরিবারকে গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন ও হতাহতদের পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে প্রাথমিকভাবে ২৫ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হচ্ছে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত প্রতি পরিবারের স্বজনদের হাতে লাশ সৎকারের জন্য ২০ হাজার টাকা এবং আহতদের চিকিৎসায় ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে।

আজ সকালে আউলিয়ার ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফায়ার সার্ভিস এবং ডুবুরি দলের তিনটি ইউনিট উদ্ধার কার্যক্রম চালায়। তাদের সহযোগিতা করেন স্থানীয়রা। সেখানে ভিড় করেন নিখোঁজদের স্বজনেরা।
ষাটোর্ধ্ব কৃষ্ণ চন্দ্র রায় তার ভাই এবং ভাইপোর খোঁজে এসেছেন আউলিয়া ঘাটে। তিনি জানান, নদীর অপরপাড়ে বোদেশ্বরী মন্দিরে মহালয়া পূজায় যোগ দিতে তার ভাই নরেশ ও ভাইপো সিন্টু বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরেননি। নৌকাডুবির খবরে রবিবার থেকেই এখানে মরদেহের অপেক্ষা করেন তিনি।
একটি মরদেহ উদ্ধার হলেই ঝাপিয়ে পড়ছেন নিহতদের স্বজনসহ স্থানীয়রা
একটি মরদেহ উদ্ধার হলেই ঝাপিয়ে পড়ছেন নিহতদের স্বজনসহ স্থানীয়রা

নাতির খোঁজে উপজেলার পাঁচপীর এলাকা থেকে এসেছিলেন বৃদ্ধ সুমল চন্দ্র। তিনি বলেন, নাতির মরদেহটা পেলে অন্তত নিজেরা সৎকারের কাজটা করতে পারতাম।

মাড়েয়া বটতলি এলাকার ধীরেন বাবুর দুই প্রতিবেশিসহ সাত জন নিকটাত্মীয় এখনো নিখোঁজ। নৌকাডুবির পর থেকে তিনি নদীর পাড়ে অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, বোদেশ্বরী মন্দিরে মহালয়া পূজায় যোগ দিতে আমার ভাতিজা, ভাতিজার বউ, ভাতিজার শ্বশুর, শ্যালিকা এবং আমার ভাতিজি নৌকায় ওঠে দুর্ঘটনায় পড়েন। এখন পর্যন্ত কারো খোঁজ পাইনি। এখন তাদের মরদেহের অপেক্ষা করছি।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, বোদা উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের করতোয়া নদীর অপরপাড়ে বোদেশ্বরী মন্দিরে মহালয়া পুজা উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারো ধর্মসভার আয়োজন করা হয়। রবিবার দুপুরের দিকে মূলত ওই ধর্মসভায় যোগ দিতে সনাতন ধর্মালম্বীরা নৌকা করে নদী পার হচ্ছিলেন। তবে ৫০ থেকে ৬০ জনের ধারণ ক্ষমতার নৌকাটিতে দেড় শতাধিক যাত্রী ছিলেন। অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে নদীর মাঝপথে নৌকাটি ডুবে যায়। অনেকে সাঁতার জানায় তীরে আসতে পারলেও সাঁতার না জানা বিশেষ করে নারী ও শিশুরা পানিতে ডুবে যান।
বেঁচে যাওয়া যাত্রী মাড়েয়া বামনপাড়া এলাকার সুবাস চন্দ্র রায় বলেন, আমিও নৌকায় ছিলাম। নৌকায় দেড়শরও বেশি যাত্রী ছিলেন। আমরা নৌকায় উঠার পরপরই নৌকায় পানি ঢুকতে শুরু করে। এ সময় মানুষজন নৌকার মধ্যেই হুড়োহুড়ি শুরু করেন। পরে যে পাশেই যাচ্ছিলাম, সে পাশেই নৌকায় পানি ঢুকছিল। আমরা পাঁচজন বন্ধু ছিলাম। কোনোমতে সাঁতার কেটে প্রাণে বেঁচে যাই। অন্য যাত্রীরা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে বাঁচার আকুতি করছিল। কিন্তু চরম মুহূর্তের বর্নণা করতে পারবো না। তবে এতো মানুষ মারা যাবে তা বুঝতে পারিনি।
এদিকে আজ আউলিয়া ঘাট থেকে দিনাজপুর জেলার খানসামা জিয়া সেতু পর্যন্ত করতোয়া নদীর ৩০ কিলোমিটার ভাটি অংশের তিনটি স্থানে ১২ সদস্যের ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন।
Tag :
জনপ্রিয়

পঞ্চগড়ে নৌকাডুবি: মৃত্যু বেড়ে ৫০

Update Time : ০৪:৫৬:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় করতোয়া নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় মরদেহের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। এ দুর্ঘটনায় দুই দিনে নারী ও শিশুসহ ৫০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
সোমবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাত পর্যন্ত করতোয়া নদীর পঞ্চগড় অংশ ও দিনাজপুর জেলার খানাসামা ও বীরগঞ্জ অংশ থেকে উদ্ধার করা হয় আরো ২৫টি মরদেহ। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে। নিখোঁজদের সন্ধানে তাদের স্বজনরা ভিড় করেন নদী তীরে। একটি মরদেহ উদ্ধারের সাথে সাথে সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়েন সবাই। স্থানীয়দের সাথে নিয়ে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (সোমবার রাত ৯টা) উদ্ধারকাজ চালাচ্ছিল ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দল। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে অনেকেই ভিড় করেন মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য কেন্দ্র আর নদীর তীরে। নতুন করে কোনো মরদেহ উদ্ধার হওয়ার সাথে সাথে তথ্যকেন্দ্রের বাইরে বোর্ডে ছবি লাগিয়ে দেওয়া হয়। পরিচয় নিশ্চিতের পর সেখানে নাম ও ঠিকানা লেখা হয়।
মরদেহ উদ্ধার হওয়ার সাথে সাথে তথ্যকেন্দ্রের বাইরে বোর্ডে ছবি লাগিয়ে দেওয়া হয়।
মরদেহ উদ্ধার হওয়ার সাথে সাথে তথ্যকেন্দ্রের বাইরে বোর্ডে ছবি লাগিয়ে দেওয়া হয়।

গতকাল যে ২৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে তাদের মধ্যে যাদের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে তারা হলেন, বোদা উপজেলার মাড়েয়া শালবাড়ী গ্রামের সুচিত্রা রানী (২২), আটোয়ারী উপজেলার ঝর্ণা পাল, শালডাঙ্গা মধ্য শিকারপুর গ্রামের দিপবাবু (২২), মাড়েয়া বটতলী গ্রামের জগদীশ (৩৫), মাড়েয়া আরাজী শিকারপুর গ্রামের কবিতা রানী (৩৩), মাড়েয়া গেদীপাড়া গ্রামের বেজ্য বালা ৫০), পার্শ্ববর্তি ঠাকুরগাঁও জেলার দেবীপুর মুজাবনী গ্রামের দীপশিখা রানী, মাড়েয়া শাশবাড়ী গ্রামের সুব্রত (২), বোদা কলেজপাড়ার যতি মিম্রয় রায় (১৫), বোদা উপজেলার পাঁচপীর বংশিধর পুজারী গ্রামের দেন্দা রানী, একই উপজেলার মাড়েয়া কাউয়াখাল গ্রামের সুমিত্রা রানী, চন্দনবাড়ী শিকারপুর প্রধানপাড়া গ্রামের আদরী (৫০), দেবীগঞ্জের লক্ষ্মীরহাট কেকে বাড়ির পুস্পা রানী।

গতকাল দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত ঘটনাস্থল, তথ্যকেন্দ্র ও নিহত ব্যক্তিদের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রী ও পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম সুজন। তার সাথে ছিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান, দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল, পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক জহুরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম শফিকুল ইসলাম, বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সলেমান আলীসহ জেলা, উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা। বিকেলে তারা দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাঙ্গা ইউনিয়নের ছত্র শিকারপুর হাতিডোবা গ্রামের স্বর্গীয় বীরেন চন্দ্র রায়ের বাড়িতে যান। নৌকাডুবিতে বীরেন রায়ের দুই পুত্রবধূ ও দুই নাতি মারা গেছেন। সেখানে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে চারজনের জন্য এক লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করা হয়।
বীরেন চন্দ্র রায়ের বাড়িতে নিহত চারজনের জন্য চেক দিচ্ছেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান
বীরেন চন্দ্র রায়ের বাড়িতে নিহত চারজনের জন্য চেক দিচ্ছেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান

এর আগে রেলমন্ত্রী আউলিয়ার ঘাটে পূর্ব প্রতিশ্রুত ওয়াই আকৃতির সেতু নির্মাণের প্রক্রিয়া দ্রুত কার্যকরের ঘোষণা দেন। একইসঙ্গে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেদনাদায়ক এ দুর্ঘটনা সম্পর্কে অবগত আছেন এবং তিনি নিহতদের ও আহতদের পরিবারকে গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন ও হতাহতদের পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় পুনর্বাসনেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে প্রাথমিকভাবে ২৫ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হচ্ছে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত প্রতি পরিবারের স্বজনদের হাতে লাশ সৎকারের জন্য ২০ হাজার টাকা এবং আহতদের চিকিৎসায় ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে।

আজ সকালে আউলিয়ার ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফায়ার সার্ভিস এবং ডুবুরি দলের তিনটি ইউনিট উদ্ধার কার্যক্রম চালায়। তাদের সহযোগিতা করেন স্থানীয়রা। সেখানে ভিড় করেন নিখোঁজদের স্বজনেরা।
ষাটোর্ধ্ব কৃষ্ণ চন্দ্র রায় তার ভাই এবং ভাইপোর খোঁজে এসেছেন আউলিয়া ঘাটে। তিনি জানান, নদীর অপরপাড়ে বোদেশ্বরী মন্দিরে মহালয়া পূজায় যোগ দিতে তার ভাই নরেশ ও ভাইপো সিন্টু বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরেননি। নৌকাডুবির খবরে রবিবার থেকেই এখানে মরদেহের অপেক্ষা করেন তিনি।
একটি মরদেহ উদ্ধার হলেই ঝাপিয়ে পড়ছেন নিহতদের স্বজনসহ স্থানীয়রা
একটি মরদেহ উদ্ধার হলেই ঝাপিয়ে পড়ছেন নিহতদের স্বজনসহ স্থানীয়রা

নাতির খোঁজে উপজেলার পাঁচপীর এলাকা থেকে এসেছিলেন বৃদ্ধ সুমল চন্দ্র। তিনি বলেন, নাতির মরদেহটা পেলে অন্তত নিজেরা সৎকারের কাজটা করতে পারতাম।

মাড়েয়া বটতলি এলাকার ধীরেন বাবুর দুই প্রতিবেশিসহ সাত জন নিকটাত্মীয় এখনো নিখোঁজ। নৌকাডুবির পর থেকে তিনি নদীর পাড়ে অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, বোদেশ্বরী মন্দিরে মহালয়া পূজায় যোগ দিতে আমার ভাতিজা, ভাতিজার বউ, ভাতিজার শ্বশুর, শ্যালিকা এবং আমার ভাতিজি নৌকায় ওঠে দুর্ঘটনায় পড়েন। এখন পর্যন্ত কারো খোঁজ পাইনি। এখন তাদের মরদেহের অপেক্ষা করছি।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, বোদা উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের করতোয়া নদীর অপরপাড়ে বোদেশ্বরী মন্দিরে মহালয়া পুজা উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারো ধর্মসভার আয়োজন করা হয়। রবিবার দুপুরের দিকে মূলত ওই ধর্মসভায় যোগ দিতে সনাতন ধর্মালম্বীরা নৌকা করে নদী পার হচ্ছিলেন। তবে ৫০ থেকে ৬০ জনের ধারণ ক্ষমতার নৌকাটিতে দেড় শতাধিক যাত্রী ছিলেন। অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে নদীর মাঝপথে নৌকাটি ডুবে যায়। অনেকে সাঁতার জানায় তীরে আসতে পারলেও সাঁতার না জানা বিশেষ করে নারী ও শিশুরা পানিতে ডুবে যান।
বেঁচে যাওয়া যাত্রী মাড়েয়া বামনপাড়া এলাকার সুবাস চন্দ্র রায় বলেন, আমিও নৌকায় ছিলাম। নৌকায় দেড়শরও বেশি যাত্রী ছিলেন। আমরা নৌকায় উঠার পরপরই নৌকায় পানি ঢুকতে শুরু করে। এ সময় মানুষজন নৌকার মধ্যেই হুড়োহুড়ি শুরু করেন। পরে যে পাশেই যাচ্ছিলাম, সে পাশেই নৌকায় পানি ঢুকছিল। আমরা পাঁচজন বন্ধু ছিলাম। কোনোমতে সাঁতার কেটে প্রাণে বেঁচে যাই। অন্য যাত্রীরা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে বাঁচার আকুতি করছিল। কিন্তু চরম মুহূর্তের বর্নণা করতে পারবো না। তবে এতো মানুষ মারা যাবে তা বুঝতে পারিনি।
এদিকে আজ আউলিয়া ঘাট থেকে দিনাজপুর জেলার খানসামা জিয়া সেতু পর্যন্ত করতোয়া নদীর ৩০ কিলোমিটার ভাটি অংশের তিনটি স্থানে ১২ সদস্যের ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন।