বিএনপির যেসব নেতা জাতির পিতার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণা পান না, তাদের পাকিস্তানি সামরিক জান্তার ‘পদলেহনকারী, খোশামোদি-তোষামোদির দল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ৫০ বছর পূর্তিতে সোমবার আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তৃতায় এ কথা বলেন তিনি। শেখ হাসিনা গণভবনে থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা এই ভাষণটাকে ছোট করতে চায় বা এই ভাষণটাকে নিয়ে— আমি শুনলাম আমাদের বিএনপির কয়েক নেতা এর মধ্যে আছে, যারা হয়তো এক সময় ছাত্রলীগ করেছিল, পরে আবার ছেড়ে চলেও গিয়েছিল, তারা নাকি এই ভাষণে স্বাধীনতার কোনো ঘোষণাই পায় নাই।
তিনি বলেন, ‘এরা পাবে না। কারণ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীও পায়নি। তারা অনেক খুঁজেছে। আমার মনে হচ্ছে, এরা যেন সেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদেরই পদলেহনকারী, খোশামোদি, তোষামোদির দল। কাজেই তারাই যা বোঝে, এরা তাই বোঝে। কিন্তু বাঙালি যা বোঝে, এরা তা বোঝে না। বাংলাদেশের মানুষ যা বোঝে, এরা তা বোঝে না।’
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সেই ভাষণের দিনটির কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পাকিস্তানি শাসকদের একটা পরিকল্পনা ছিল। খুব সাজসাজ রব নিয়ে সাঁজোয়া বাহিনী বসে ছিল, সেখানে হেলিকপ্টার, প্লেন রেডি ছিল যে বঙ্গবন্ধু কী ভাষণটা দেন এবং তার ওপর তারা মাঠে যারা আছে সবাইকেই ওপর থেকে বোম্বিং করে হত্যা করবে। এটা পাকিস্তানি যারা তখন অপারেশন চালাচ্ছিল, তাদের লেখা বইতেও কিন্তু প্রকাশ পায়।’
ওই পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর কৌশলী হওয়ার বিষয়টি তুলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তো ‘পোয়েট অফ পলিটিক্স’। তিনি জানতেন যে মানুষের কাছে কথাটা কী ভাষায় বললে সাধারণ মানুষ কথাটা বুঝে নেবে, কিন্তু শত্রুদের বুঝতে সময় লাগবে। যে কোনো একটা যুদ্ধে রণকৌশলটা হচ্ছে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই রণকৌশলের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে আনা এটাই হচ্ছে সেই যুদ্ধে যিনি নেতৃত্ব দেন তার সব থেকে বড় কৃতিত্ব। আর সেটাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব করেছিলেন।’
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, এই ‘না বোঝাদের’ দলে তত্কালীন ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খানও ছিলেন।
বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ শোনার পর দেশের মানুষ খুশি হয়ে আনন্দে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ স্লোগান দিতে দিতে বাড়ি ফিরছিল এবং তখন ফুলার রোডে তাকে থামিয়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে স্লোগানও ধরিয়ে ছিল।
সেদিন ঘরে ফিরে কয়েক ছাত্রনেতাকে দেখার স্মৃতি স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেখানে সিরাজুল আলম খান তখন বঙ্গবন্ধুকে বলছেন, ‘লিডার আপনি কী বললেন? সব মানুষ হতাশ হয়ে চলে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বলার সাথে সাথে আমি বললাম, আপনারা এই রকম মিথ্যা কথা বলছেন কেন? আমি তাকে নিজেই বললাম, আপনি এত মিথ্যা কথা বলেন কেন? আপনারা তো মাঠ থেকে অনেক আগেই চলে এসেছেন। আপনারা তো মাঠের অবস্থা তা হলে জানেন না।’
শেখ হাসিনা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান প্রসঙ্গে বলেন, ‘২৫ মার্চ চট্টগ্রামে যারা ব্যারিকেড দিচ্ছিল তাদের অনেককে জিয়াউর রহমান গুলি করে হত্যা করেন। শুধু তাই নয়, জিয়া ২৫ ও ২৬ দুই দিনই হত্যাকাণ্ড চালান। ২৭ তারিখ সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র নামাতে গিয়েছিলেন জিয়া। তিনি যাতে অস্ত্র নামাতে না পারেন, এ জন্য আমাদের স্বাধীনতাকামীরা তাকে আটকান।’
তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের হান্নান সাহেব গং ঘোষণা দিয়েছিলেন। জহুর আহমেদ চৌধুরী সাহেব বলেছিলেন, আমরা তো ঘোষণা দিয়েই যাচ্ছি। সেনাবাহিনীর একজনকে এনে ঘোষণা দিলে একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব থাকবে। ওই সময় মেজর রফিক সাহেব অ্যাম্বুশ (আক্রমণ) করে বসেছিলেন।
তিনি বলেন, আমি এখান থেকে সরলে পাকিস্তানিরা জায়গাটা দখল করে নেবে। যার কারণে জিয়াউর রহমান যেহেতু জনগণের কাছে ধরা ছিলেন, তাকে ধরে নিয়ে এসে ঘোষণা পাঠ করতে বলা হয়। সেই থেকে তাকে ঘোষক বলে প্রচার চালায়। কিন্তু তিনি (জিয়াউর রহমান) যে ২৫ ও ২৬ মার্চ মানুষ হত্যা করেছেন, সে কথা ভুলে যায়।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিনি (জিয়াউর রহমান) তো আগাগোড়া পাকিস্তানের দালালি করে আসছেন। তার জন্মও সেখানে। লেখাপড়াও ওখানে। তিনি কবে বাংলাদেশের হলেন? চাকরি সূত্রে বাংলাদেশে এসেছেন। সে সূত্রে বিবাহ করে পরবর্তীতে থেকে যায়। এটাই তো বাস্তবতা। তারপরও যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন তাদের সম্মান দেয়া হয়েছে। কিন্তু এদের চরিত্র তো বদলায়নি। ঠিকই বেঈমানি-মুনাফেকি করেছেন। একটা মেজর ছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে প্রমোশন দিয়ে মেজর জেনারেল করেছেন। সেই এই হত্যাকাণ্ডের (১৫ আগস্ট) মূলহোতা ছিলেন এবং ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। যারা ১৫ আগস্টের হত্যার সঙ্গে জড়িত, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে, দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়, এ দেশকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়, তাদের তৈরি করা রাজনৈতিক দল থেকে বাংলাদেশের মানুষ কী আশা করবে?’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেশের উন্নয়ন করেছি, এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, এটা তাদের একটু পছন্দ নয়। তাদের কাছে ক্ষমতা ভোগের বস্তু। বিলাসী জীবন কাটিয়েছে। এরা মানুষের কষ্ট বুঝবে কী করে? আমি আমাদের নেতাকর্মীদের বলবো, ওরা কি বললো, এটা নিয়ে কথা বলার দরকার নেই, চিন্তা করার দরকার নেই। এই করোনায় তারা কত কথা বলেছে, কিন্তু টিকা তো তাদের নিতে হলো। আমি সরকারে আছি, পয়সা দিয়ে টিকা কিনে ফ্রি দিচ্ছি। বিনা পয়সার টিকা তো বিএনপি নেতারা নিয়েছেন। এর আগে কী বলেছেন? এজন্য তারা কী বললো তা দেখার দরকার নেই।’
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রান্তে অনুষ্ঠানে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিম্ললীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মাহবুব উল আলম হানিফ, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, মেরিনা জাহান, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মান্নাফী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকও সভায় বক্তব্য রাখেন।
অনলাইন ডেস্ক 





















