ঢাকা ১২:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী হলো ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর নয়মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছরপূর্তি পালনের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃৃক ঘোষিত একটি বার্ষিক পরিকল্পনা। সরকার ২৬ মার্চ ২০২১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের ঘোষণা দেয়।

আভিধানিক ভাষায়, “সুবর্ণজয়ন্তী” শব্দটি মূলত কোনো ঘটনার ৫০ বছরপূর্তিকে নির্দেশ করে।

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে প্রস্তুত জাতীয় স্মৃতিসৌধ

নবম পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডিংয়ে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে তিন বাহিনীর সদস্যরা শেষ মুহূর্তে তাদের সশস্ত্র মহড়া ঝালিয়ে নিচ্ছেন। বিউগলের সুরের মূর্ছনায় স্বাধীনতা সংগ্রামে শাহাদতবরণকারী শহীদদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের জন্য সর্বশেষ প্রস্তুতিও চলছে। এ ছাড়া প্রস্তুতিমূলক কুচকাওয়াজ ও মোটরসাইকেল মহড়ায় ব্যস্ত সময় কাটছে সশস্ত্র তিন বাহিনীর সদস্যদের।

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী। সৌধচত্বর পরিণত হয়েছে লাল-সবুজের এক টুকরো বাংলাদেশে। সবকটা জানালা খুলে দে না, ওরা আসবে চুপিচুপি। তাইতো প্রধান ফটক থেকে সৌধ বেদি পর্যন্ত লাল ইটের হেরিবন্ডগুলো সাদা রঙের আভায় পবিত্র করে তোলা হয়েছে। ৮৪ একর এলাকা জুড়েই সবুজ বৃক্ষরাজি, লাল ইটের প্রাচীর ও কনক্রিটে ঘেরা সৌধ চত্বরের বিভিন্ন জায়গায় শোভা পাচ্ছে বাহারি রঙিন ফুল। সৌরভ ছড়াচ্ছে পুরো সৌধ চত্বরে। এর আগে গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে ও পরিচ্ছন্নকর্মীদের নিরলস পরিশ্রমে সৌধ মিনার, শহীদ বেদি, হ্যালিপ্যাডসহ সড়ক গুলো ধুয়েমুছে পরিষ্কার করা হয়েছে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফুল গাছের টবগুলো স্থানান্তরের মাধ্যমে সৌধ এলাকাকে দৃষ্টিনন্দন করার চেষ্টা করছেন মালিরা। নিরাপত্তা জোরদার ও আলোকসজ্জার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগরি কাজে নিয়োজিতরা। পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মালি, চিত্রকর ও ইলেকট্রেশিয়ানরা জানান, বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা জানাবেন। এ ছাড়া দেশ-বিদেশ থেকে লোকজন স্মৃতিসৌধে আসবেন ওই দিন। এ জন্য প্রতিবছরের মতো এবারও প্রায় এক মাস ধরে পুরো সৌধ এলাকা সুসজ্জিত করে তুলেছেন। গাছের পাতা থেকে শুরু করে অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করছেন। পুরো সৌধ এলাকা লাল-সবুজের আভায় সাজিয়ে তোলা হয়েছে। ফুল গাছের চারা লাগানো হয়েছে নির্ধারিত স্থান গুলোতে। লেকের পানি পরিষ্কার করে সেখানে লাল শাপলা লাগানো হচ্ছে। প্রধান ফটক থেকে শহীদ বেদি পর্যন্ত হাঁটার পথগুলো সাদা রঙে শুভ্র করে তোলা হয়েছে। এ ছাড়া পুরো সৌধ এলাকায় আলোকবাতি স্থাপনসহ লাল-সবুজ আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশে গণহত্যা চালায়। এই গণহত্যায় শুধুমাত্র ঢাকাতেই ৬ থেকে ৭ হাজার সাধারণ মানুষ সেই রাতে প্রাণ হারায়। বাংলাদেশে এই দিনটি জাতীয় গণহত্যা দিবস নামে পরিচিত। সেই দিন রাত ১২ টার পর (২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করায় ১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশ ২৬শে মার্চ কে “স্বাধীনতা দিবস” হিসাবে পালন করে আসছে। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। এই দিনটি ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশ বিজয় দিবস হিসাবে পালন করছে। ২০২১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা ও যুদ্ধে বিজয় অর্জনের ৫০ বছর পূর্ণ হয়। তাই স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০২১ সালকে “সুবর্ণজয়ন্তী” হিসাবে পালন করা হচ্ছে ।

২০০৮ সালের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইস্তেহারের মধ্যে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে “রূপকল্প ২০২১” ঘোষণা করে, যেখানে ২০২১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নশীল, ডিজিটাল ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রত্যয় দেয়া হয়।

সুবর্ণজয়ন্তীর সঙ্গে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মুজিব বর্ষও পালিত হয়। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানগণ বছরজুড়ে উদযাপিত অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ২০২১ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত চলমান মুজিব বর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর সম্মিলিত অনুষ্ঠান ‘মুজিব চিরন্তন’-এ যোগ দিতে ১৭ মার্চ বাংলাদেশে আসেন মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ; ১৯ মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন  শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী মহিন্দা রাজাপাকসে; ২২ মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভণ্ডারী; ২৪শে মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিং এবং স্বাধীনতা দিবসের দিন ২৬ মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এছাড়াও জো বাইডেন, শি চিনফিং, বরিস জনসন, ভ্লাদিমির পুতিন, জাস্টিন ট্রুডো, ইয়োশিহিদে সুগা, ইমরান খান, পোপ ফ্রান্সিস, আন্তোনিও গুতেরেস -এর মতো বৈশ্বিক নেতারা অভিনন্দন বার্তা পাঠান এবং বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করেন

২৬ মার্চ ভোরে পঞ্চাশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচির সূচনা করা হয়। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এই দিনে বাংলাদেশের সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তোলা হয় জাতীয় পতাকা।

সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলোকে সজ্জিত করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় স্বাধীনতা দিবসের কয়েক দিন আগে থেকেই চলে আলোকসজ্জা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে এ দিন দেশের সকল ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা ও মুনাজাত করা হয়।

আন্তর্জাতিক

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে যুক্তরাজ্যের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, প্রিন্স অফ ওয়েলস চার্লস এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বিশেষ বাণীর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন জানান। বরিস জনসন ব্রিটেনের আর্থ-সামাজিক খাতে ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের অবদানের কথা উল্লেখ করে বলেন, “ছয় লক্ষ ব্রিটিশ-বাংলাদেশী দুইদেশের মধ্যে বন্ধনকে জিইয়ে রেখেছে।

বাংলাদেশের বাইরে নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলে ২৬শে মার্চ ২০২১ তারিখে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হয়। বিশিষ্ট মার্কিন রাজনীতিবিদ, নিউইয়র্কে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত/কনসাল জেনারেল ও বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ বাংলাদেশী-আমেরিকান কমিউনিটির অংশগ্রহণে কনস্যুলেট ভার্চুয়াল সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠান পালিত হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২৬ মার্চ ২০২১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন বুর্জ খলিফায় ঘণ্টাব্যাপী বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রদর্শন ও আলোকসজ্জার আয়োজন করা হয়।

যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে।

বাংলাদেশের বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বর্ষ জুড়ে চলা কর্মকাণ্ডের সমাপ্তি হবে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পালনের মাধ্যমে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারত-বাংলাদেশ যৌথবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। এই দিনটি বাংলাদেশে বিজয় দিবস হিসাবে উদযাপিত হয়, যার ৫০ বছর পূর্ণ হবে ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে। এই দিনকে সামনে রেখে ব্যপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

এই কর্মসূচীর অংশ হিসাবে ১৫ মার্চ তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকা আসেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ। ১৫ ডিসেম্বর তিনি জাতীয় স্মৃতিসৌধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

১৬ ডিসেম্বর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে এক সামরিক কুচকাওয়াজেবাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, রাশিয়া ও মেক্সিকোর সেনাবাহিনীর যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। সেইদিন বিকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারাদেশের মানুষের সঙ্গে মিলে একটি ‘শপথ’ পাঠ করবেন।

Tag :
জনপ্রিয়

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী

Update Time : ০৫:৫৪:১৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২১

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী হলো ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর নয়মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছরপূর্তি পালনের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃৃক ঘোষিত একটি বার্ষিক পরিকল্পনা। সরকার ২৬ মার্চ ২০২১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের ঘোষণা দেয়।

আভিধানিক ভাষায়, “সুবর্ণজয়ন্তী” শব্দটি মূলত কোনো ঘটনার ৫০ বছরপূর্তিকে নির্দেশ করে।

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে প্রস্তুত জাতীয় স্মৃতিসৌধ

নবম পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডিংয়ে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে তিন বাহিনীর সদস্যরা শেষ মুহূর্তে তাদের সশস্ত্র মহড়া ঝালিয়ে নিচ্ছেন। বিউগলের সুরের মূর্ছনায় স্বাধীনতা সংগ্রামে শাহাদতবরণকারী শহীদদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের জন্য সর্বশেষ প্রস্তুতিও চলছে। এ ছাড়া প্রস্তুতিমূলক কুচকাওয়াজ ও মোটরসাইকেল মহড়ায় ব্যস্ত সময় কাটছে সশস্ত্র তিন বাহিনীর সদস্যদের।

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী। সৌধচত্বর পরিণত হয়েছে লাল-সবুজের এক টুকরো বাংলাদেশে। সবকটা জানালা খুলে দে না, ওরা আসবে চুপিচুপি। তাইতো প্রধান ফটক থেকে সৌধ বেদি পর্যন্ত লাল ইটের হেরিবন্ডগুলো সাদা রঙের আভায় পবিত্র করে তোলা হয়েছে। ৮৪ একর এলাকা জুড়েই সবুজ বৃক্ষরাজি, লাল ইটের প্রাচীর ও কনক্রিটে ঘেরা সৌধ চত্বরের বিভিন্ন জায়গায় শোভা পাচ্ছে বাহারি রঙিন ফুল। সৌরভ ছড়াচ্ছে পুরো সৌধ চত্বরে। এর আগে গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে ও পরিচ্ছন্নকর্মীদের নিরলস পরিশ্রমে সৌধ মিনার, শহীদ বেদি, হ্যালিপ্যাডসহ সড়ক গুলো ধুয়েমুছে পরিষ্কার করা হয়েছে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফুল গাছের টবগুলো স্থানান্তরের মাধ্যমে সৌধ এলাকাকে দৃষ্টিনন্দন করার চেষ্টা করছেন মালিরা। নিরাপত্তা জোরদার ও আলোকসজ্জার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগরি কাজে নিয়োজিতরা। পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মালি, চিত্রকর ও ইলেকট্রেশিয়ানরা জানান, বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা জানাবেন। এ ছাড়া দেশ-বিদেশ থেকে লোকজন স্মৃতিসৌধে আসবেন ওই দিন। এ জন্য প্রতিবছরের মতো এবারও প্রায় এক মাস ধরে পুরো সৌধ এলাকা সুসজ্জিত করে তুলেছেন। গাছের পাতা থেকে শুরু করে অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করছেন। পুরো সৌধ এলাকা লাল-সবুজের আভায় সাজিয়ে তোলা হয়েছে। ফুল গাছের চারা লাগানো হয়েছে নির্ধারিত স্থান গুলোতে। লেকের পানি পরিষ্কার করে সেখানে লাল শাপলা লাগানো হচ্ছে। প্রধান ফটক থেকে শহীদ বেদি পর্যন্ত হাঁটার পথগুলো সাদা রঙে শুভ্র করে তোলা হয়েছে। এ ছাড়া পুরো সৌধ এলাকায় আলোকবাতি স্থাপনসহ লাল-সবুজ আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশে গণহত্যা চালায়। এই গণহত্যায় শুধুমাত্র ঢাকাতেই ৬ থেকে ৭ হাজার সাধারণ মানুষ সেই রাতে প্রাণ হারায়। বাংলাদেশে এই দিনটি জাতীয় গণহত্যা দিবস নামে পরিচিত। সেই দিন রাত ১২ টার পর (২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করায় ১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশ ২৬শে মার্চ কে “স্বাধীনতা দিবস” হিসাবে পালন করে আসছে। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। এই দিনটি ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশ বিজয় দিবস হিসাবে পালন করছে। ২০২১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা ও যুদ্ধে বিজয় অর্জনের ৫০ বছর পূর্ণ হয়। তাই স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০২১ সালকে “সুবর্ণজয়ন্তী” হিসাবে পালন করা হচ্ছে ।

২০০৮ সালের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইস্তেহারের মধ্যে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে “রূপকল্প ২০২১” ঘোষণা করে, যেখানে ২০২১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নশীল, ডিজিটাল ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রত্যয় দেয়া হয়।

সুবর্ণজয়ন্তীর সঙ্গে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মুজিব বর্ষও পালিত হয়। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানগণ বছরজুড়ে উদযাপিত অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ২০২১ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত চলমান মুজিব বর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর সম্মিলিত অনুষ্ঠান ‘মুজিব চিরন্তন’-এ যোগ দিতে ১৭ মার্চ বাংলাদেশে আসেন মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ; ১৯ মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন  শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী মহিন্দা রাজাপাকসে; ২২ মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভণ্ডারী; ২৪শে মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিং এবং স্বাধীনতা দিবসের দিন ২৬ মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এছাড়াও জো বাইডেন, শি চিনফিং, বরিস জনসন, ভ্লাদিমির পুতিন, জাস্টিন ট্রুডো, ইয়োশিহিদে সুগা, ইমরান খান, পোপ ফ্রান্সিস, আন্তোনিও গুতেরেস -এর মতো বৈশ্বিক নেতারা অভিনন্দন বার্তা পাঠান এবং বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করেন

২৬ মার্চ ভোরে পঞ্চাশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচির সূচনা করা হয়। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এই দিনে বাংলাদেশের সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তোলা হয় জাতীয় পতাকা।

সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলোকে সজ্জিত করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় স্বাধীনতা দিবসের কয়েক দিন আগে থেকেই চলে আলোকসজ্জা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে এ দিন দেশের সকল ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা ও মুনাজাত করা হয়।

আন্তর্জাতিক

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে যুক্তরাজ্যের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, প্রিন্স অফ ওয়েলস চার্লস এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বিশেষ বাণীর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন জানান। বরিস জনসন ব্রিটেনের আর্থ-সামাজিক খাতে ব্রিটিশ বাংলাদেশীদের অবদানের কথা উল্লেখ করে বলেন, “ছয় লক্ষ ব্রিটিশ-বাংলাদেশী দুইদেশের মধ্যে বন্ধনকে জিইয়ে রেখেছে।

বাংলাদেশের বাইরে নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলে ২৬শে মার্চ ২০২১ তারিখে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হয়। বিশিষ্ট মার্কিন রাজনীতিবিদ, নিউইয়র্কে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত/কনসাল জেনারেল ও বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ বাংলাদেশী-আমেরিকান কমিউনিটির অংশগ্রহণে কনস্যুলেট ভার্চুয়াল সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠান পালিত হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২৬ মার্চ ২০২১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন বুর্জ খলিফায় ঘণ্টাব্যাপী বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রদর্শন ও আলোকসজ্জার আয়োজন করা হয়।

যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে।

বাংলাদেশের বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বর্ষ জুড়ে চলা কর্মকাণ্ডের সমাপ্তি হবে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পালনের মাধ্যমে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারত-বাংলাদেশ যৌথবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। এই দিনটি বাংলাদেশে বিজয় দিবস হিসাবে উদযাপিত হয়, যার ৫০ বছর পূর্ণ হবে ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে। এই দিনকে সামনে রেখে ব্যপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

এই কর্মসূচীর অংশ হিসাবে ১৫ মার্চ তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকা আসেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ। ১৫ ডিসেম্বর তিনি জাতীয় স্মৃতিসৌধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

১৬ ডিসেম্বর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে এক সামরিক কুচকাওয়াজেবাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, রাশিয়া ও মেক্সিকোর সেনাবাহিনীর যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। সেইদিন বিকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারাদেশের মানুষের সঙ্গে মিলে একটি ‘শপথ’ পাঠ করবেন।