ক্রমেই শক্তি সঞ্চার করছে এল নিনো জলবায়ু পরিস্থিতি। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই এর প্রভাব তীব্র হতে শুরু করেছে। এর ভয়াল রূপ দেখা দিতে পারে এশিয়ার দেশগুলোয়। এল নিনোর তীব্রতায় অঞ্চলটির দেশগুলোয় শস্য উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসে এশিয়ার দেশগুলোয় অস্বাভাবিক শুষ্ক আবহাওয়ায় ব্যাহত হয়েছে দানাদার খাদ্যশস্য ও তেলবীজ উৎপাদন। অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে আবাদি জমি। আগামী মাসে আরো কম বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি আরো প্রকট হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদ ও বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ গম রফতানিকারক দেশ অস্ট্রেলিয়া এরই মধ্যে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে শস্যটির উৎপাদন পূর্বাভাস কমিয়েছে। মৌসুমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড সর্বনিম্নে নামার কারণে ভারতে চালসহ অন্যান্য শস্য উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শস্য রফতানিতে দেশটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ স্থানে রয়েছে।
পৃথিবীজুড়ে ভোজ্যতেল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় পাম অয়েল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এর উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। শীর্ষ ভুট্টা ও সয়াবিন আমদানিকারক দেশ চীনের তীব্র গরম আবহাওয়া দেশটির খাদ্যপণ্য উৎপাদনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
জলবায়ুর তথ্য বিশ্লেষক প্লাটফর্ম যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ম্যাক্সার টেকনোলজির আবহাওয়াবিদ ক্রিস হাইডি বলেন, বিশ্বের বেশির ভাগ অঞ্চলে এল নিনোর প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের শেষ দিকে এটি তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। এর প্রভাবে উষ্ণ হয়ে উঠবে এশিয়ার আবহাওয়াও।
ভারতে মৌসুমি বৃষ্টিপাত চাল, আখ, সয়াবিন ও ভুট্টাসহ গ্রীষ্মকালীন শস্য উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ বছর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে আট বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যেতে পারে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা।
ভারতের আবহাওয়া বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, আমরা যেমনটা ধারণা করেছিলাম, এবার এল নিনো তার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলবে। চলতি বছরের মধ্যে আগস্ট ছিল সবচেয়ে উষ্ণ মাস। সেপ্টেম্বরে আবহাওয়ায়ও এল নিনোর শক্ত প্রভাব বজায় থাকবে। কমবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ।
বৈশ্বিক চাল রপ্তানির ৪০ শতাংশই আসে ভারত থেকে। দেশটি বাসমতী নয় এমন সব ধরনের সাদা চাল রপ্তানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এর পরই চালের বৈশ্বিক বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। বর্তমানে শস্যটির বৈশ্বিক বাজারদর ১৫ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধান প্রধান শস্য আবাদি অঞ্চলগুলোয় আগস্টে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল অত্যন্ত স্বল্প। ফলে বিশ্লেষকরা দেশটির উৎপাদন পূর্বাভাস কমাতে বাধ্য হয়েছেন। গত চার বছরের মধ্যে এবারই প্রথম উৎপাদন পূর্বাভাস কমানো হলো।
কৃষি পরামর্শকপ্রতিষ্ঠান ইকন কমোডিটিজের অ্যাডভাইজরি সার্ভিসের পরিচালক ওলে হো বলেন, আমরা বছরের শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ায় ৩ কোটি ৩০ লাখ টন গম উৎপাদনের পূর্বাভাস দিয়েছিলাম। বর্তমানে তা ৩০ লাখ টন কমিয়ে আনা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে শুষ্ক আবহাওয়া বজায় থাকলে উৎপাদনের পরিমাণ আরো কমতে পারে।
গত তিন বছর অস্ট্রেলিয়ায় গমের বাম্পার ফলন হয়েছে। এ কারণে চীন, ইন্দোনেশিয়া ও জাপানের মতো আমদানিকারক দেশগুলোয় শস্যটির সরবরাহও ঊর্ধ্বমুখী।
আগস্টে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় ধান, পাম অয়েল, আখ ও কফি বাগানগুলোয় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টি হয়েছে। অপ্রতুল বৃষ্টির কারণে সবচেয়ে ধাক্কা খেয়েছে ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড।
ম্যাক্সার টেকনোলজির আবহাওয়াবিদ ক্রিস হাইডি বলেন, ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিমাঞ্চল এবং থাইল্যান্ডের বেশির ভাগ এলাকায় গত ৩০-৪০ দিনে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল অনেক কম। আগামী মাসে এ দুই দেশে বৃষ্টিপাত আরো কমার আশঙ্কা রয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ওয়েদার ইনকরপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ড্রু লার্নার বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে ভুট্টা ও সয়াবিন উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও এ শুষ্কতা এল নিনোর কারণে ছিল না। নভেম্বর থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি নাগাদ দেশটিতে এল নিনোর প্রভাব বড় হয়ে উঠতে পারে। তখন সেখানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে, যা শীতকালীন গম উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
আন্তজার্তিক ডেস্ক 




















