ঢাকা ০৯:৫১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কী ভাবে জন্ম হয় দেবী সরস্বতীর!

  • অনলাইন ডেস্ক
  • Update Time : ০৫:১৭:২৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১৩০ Time View

মাঘ মাসের পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পুজো হয় বলে এই দিনটি বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত। হিন্দু ধর্ম অনুসারে সরস্বতী বিদ্য়া, শিল্পকলা ও সঙ্গীতের অধিষ্ঠাত্রী দেবী।

কিন্তু কী ভাবে এই দেবীর সৃষ্টি হল সে নিয়ে পুরাণে এক আশ্চর্য গল্প আছে। হিন্দু ধর্মের সর্বোচ্চ আসনে থাকা তিন দেবতার অন্যতম হলেন ব্রহ্মা। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরকে নিয়েই ত্রিমূর্তি। পুরাণ অনুসারে ব্রহ্মা হলেন স্বয়ম্ভ‌ু। অর্থাত্‍ তাঁর কোনও পিতা ও মাতা নেই। তিনি নিজেই নিজের জন্ম দিয়েছেন। এই আশ্চর্য জন্মের পর ব্রহ্মা ধ্যানে বসেন। সেই ধ্যানে তিনি তাঁর সকল ভালো গুণকে একত্র করতে থাকেন। আর ব্রহ্মার সকল ভালো গুণ একত্রিত হয়ে তা ধীরে ধীরে এক নারীর আকার নিতে থাকে। এই ভাবেই ব্রহ্মার মুখ গহ্বর থেকে সৃষ্টি হয় দেবী সরস্বতীর। ব্রহ্মার প্রথমে একটিই মুখ ছিল। অত্যন্ত সুন্দর সেই দেবীকে দর্শন করার জন্যই ব্রহ্মার আরও চারটি মুখের সৃষ্টি হয়।

পুরাণ অনুসারে ব্রহ্মা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করলেও নিজের সৃষ্টি নিয়ে তিনি খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না। সরস্বতী তাঁকে এই বিশ্বকে কী ভাবে আরও সুন্দর করে তোলা যায়, সে সম্পর্কে পরামর্শ দেন। পুরাণের কোথাও কোথাও সরস্বতীর স্বামী হিসেবে বিষ্ণুর কথা উল্লেখ করা আছে। আবার কোথাও ব্রহ্মাকে সরস্বতীর স্বামী হিসেবে বলা হয়েছে। পুরাণের একটি কাহিনি অনুসারে একবার কোনও একটি অনুষ্ঠানে ব্রহ্মার পাশে সময়মতো এসে উপস্থিত হতেব্রহ্ পারেননি সরস্বতী। সেই কারণে ব্রহ্মা গায়ত্রী নামে নিজের আরও এক স্ত্রীর সৃষ্টি করেন। সেই কথা জানতে পেরে অত্যন্ত ক্র‌ুদ্ধ হয়ে ওঠেন সরস্বতী। তিনি ব্রহ্মাকে অভিশাপ দেন যে ত্রিমূর্তির অন্যতম হলেও মর্ত্যলোকে ব্রহ্মার পুজো করা হবে না। সেই কারণে শিব ও বিষ্ণু পূজিত হলেও ব্রহ্মার মন্দির সে ভাবে কোথাও দেখা যায় না।

পুরাণ অনুসারে বসন্ত পঞ্চমীতেই দেবী সরস্বতীর জন্ম হয়। সরস্বতী সকল বেদের মা বলে মনে করা হয়। সকল শব্দ ও ভাষার উত্‍পত্তি তাঁর থেকে হয়েছিল বলে ব্রহ্মা সরস্বতীর নাম দেন বাগদেবী। আমাদের রাজ্য সহ পূর্ব ভারতের অনেক জায়গাতেই সরস্বতীকে শিব ও পার্বতীর কন্যা বলে মনে করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মে সরস্বতীকে মঞ্জ‌ুশ্রী নামে আরাধনা করা হয়।

দেবী সরস্বতীর সমস্ত রকম সৌন্দর্য ও দীপ্তির উৎস হলো ব্রহ্মা। পূজার দিন দেবী সরস্বতীর মূর্তি শ্বেতবস্ত্র অর্থাৎ সাদা রঙের কাপড় পরিধান করে থাকে, যা পবিত্রতার নিদর্শন হিসেবে মান্যতা করা হয়। দেবী সরস্বতী রূপে-গুণে সবদিক থেকে অদ্বিতীয়া। বিদ্যা, বুদ্ধি ও জ্ঞান সবকিছুতে তিনি সত্ত্বগুণময়ী। তাছাড়া বাকশক্তির প্রতীক হিসেবে বাগদেবী নামে পরিচিত। সংগীত শিল্প এবং বিদ্যার দেবী হিসেবে তাঁর এক হাতে পুস্তক অথবা বই আর এক হাতে বীণা। রাজহাঁসের পিঠে বসে আছেন। রাজহংস হলো জলে, স্থলে এবং অন্তরীক্ষে অর্থাৎ সব জায়গাতেই সমান গতি। তেমনি জ্ঞান ও দক্ষতার গতি সব জায়গাতেই সমানভাবে প্রকাশ পায়। তাছাড়া রাজহাঁস একমাত্র জল ও দুধের পার্থক্য করতে পারে। অর্থাৎ দুধে জল মিশিয়ে দিলে তার মধ্যে দুধ ও জলকে আলাদা করে দিতে পারে। আর সেই কারণেই জ্ঞান সাধনার ভালো-মন্দ পৃথক করতে পারে।

বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মহাসমারোহে সরস্বতী পূজা পালিত হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা এই পূজা আয়োজন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ঢাকার সরস্বতী পূজার প্রধান কেন্দ্র ও আকর্ষণের স্থান হয়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এখানে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। জগন্নাথ হলের সরস্বতী পূজার ব্যাপকতা ও বহুমাত্রিকতা প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। পূজাকে কেন্দ্র করে কেবল শিক্ষার্থীরাই নয়, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব পেশার আবাল বৃদ্ধ বনিতার মিলনমেলায় পরিণত হয়।

Tag :

কী ভাবে জন্ম হয় দেবী সরস্বতীর!

Update Time : ০৫:১৭:২৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

মাঘ মাসের পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পুজো হয় বলে এই দিনটি বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত। হিন্দু ধর্ম অনুসারে সরস্বতী বিদ্য়া, শিল্পকলা ও সঙ্গীতের অধিষ্ঠাত্রী দেবী।

কিন্তু কী ভাবে এই দেবীর সৃষ্টি হল সে নিয়ে পুরাণে এক আশ্চর্য গল্প আছে। হিন্দু ধর্মের সর্বোচ্চ আসনে থাকা তিন দেবতার অন্যতম হলেন ব্রহ্মা। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরকে নিয়েই ত্রিমূর্তি। পুরাণ অনুসারে ব্রহ্মা হলেন স্বয়ম্ভ‌ু। অর্থাত্‍ তাঁর কোনও পিতা ও মাতা নেই। তিনি নিজেই নিজের জন্ম দিয়েছেন। এই আশ্চর্য জন্মের পর ব্রহ্মা ধ্যানে বসেন। সেই ধ্যানে তিনি তাঁর সকল ভালো গুণকে একত্র করতে থাকেন। আর ব্রহ্মার সকল ভালো গুণ একত্রিত হয়ে তা ধীরে ধীরে এক নারীর আকার নিতে থাকে। এই ভাবেই ব্রহ্মার মুখ গহ্বর থেকে সৃষ্টি হয় দেবী সরস্বতীর। ব্রহ্মার প্রথমে একটিই মুখ ছিল। অত্যন্ত সুন্দর সেই দেবীকে দর্শন করার জন্যই ব্রহ্মার আরও চারটি মুখের সৃষ্টি হয়।

পুরাণ অনুসারে ব্রহ্মা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করলেও নিজের সৃষ্টি নিয়ে তিনি খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না। সরস্বতী তাঁকে এই বিশ্বকে কী ভাবে আরও সুন্দর করে তোলা যায়, সে সম্পর্কে পরামর্শ দেন। পুরাণের কোথাও কোথাও সরস্বতীর স্বামী হিসেবে বিষ্ণুর কথা উল্লেখ করা আছে। আবার কোথাও ব্রহ্মাকে সরস্বতীর স্বামী হিসেবে বলা হয়েছে। পুরাণের একটি কাহিনি অনুসারে একবার কোনও একটি অনুষ্ঠানে ব্রহ্মার পাশে সময়মতো এসে উপস্থিত হতেব্রহ্ পারেননি সরস্বতী। সেই কারণে ব্রহ্মা গায়ত্রী নামে নিজের আরও এক স্ত্রীর সৃষ্টি করেন। সেই কথা জানতে পেরে অত্যন্ত ক্র‌ুদ্ধ হয়ে ওঠেন সরস্বতী। তিনি ব্রহ্মাকে অভিশাপ দেন যে ত্রিমূর্তির অন্যতম হলেও মর্ত্যলোকে ব্রহ্মার পুজো করা হবে না। সেই কারণে শিব ও বিষ্ণু পূজিত হলেও ব্রহ্মার মন্দির সে ভাবে কোথাও দেখা যায় না।

পুরাণ অনুসারে বসন্ত পঞ্চমীতেই দেবী সরস্বতীর জন্ম হয়। সরস্বতী সকল বেদের মা বলে মনে করা হয়। সকল শব্দ ও ভাষার উত্‍পত্তি তাঁর থেকে হয়েছিল বলে ব্রহ্মা সরস্বতীর নাম দেন বাগদেবী। আমাদের রাজ্য সহ পূর্ব ভারতের অনেক জায়গাতেই সরস্বতীকে শিব ও পার্বতীর কন্যা বলে মনে করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মে সরস্বতীকে মঞ্জ‌ুশ্রী নামে আরাধনা করা হয়।

দেবী সরস্বতীর সমস্ত রকম সৌন্দর্য ও দীপ্তির উৎস হলো ব্রহ্মা। পূজার দিন দেবী সরস্বতীর মূর্তি শ্বেতবস্ত্র অর্থাৎ সাদা রঙের কাপড় পরিধান করে থাকে, যা পবিত্রতার নিদর্শন হিসেবে মান্যতা করা হয়। দেবী সরস্বতী রূপে-গুণে সবদিক থেকে অদ্বিতীয়া। বিদ্যা, বুদ্ধি ও জ্ঞান সবকিছুতে তিনি সত্ত্বগুণময়ী। তাছাড়া বাকশক্তির প্রতীক হিসেবে বাগদেবী নামে পরিচিত। সংগীত শিল্প এবং বিদ্যার দেবী হিসেবে তাঁর এক হাতে পুস্তক অথবা বই আর এক হাতে বীণা। রাজহাঁসের পিঠে বসে আছেন। রাজহংস হলো জলে, স্থলে এবং অন্তরীক্ষে অর্থাৎ সব জায়গাতেই সমান গতি। তেমনি জ্ঞান ও দক্ষতার গতি সব জায়গাতেই সমানভাবে প্রকাশ পায়। তাছাড়া রাজহাঁস একমাত্র জল ও দুধের পার্থক্য করতে পারে। অর্থাৎ দুধে জল মিশিয়ে দিলে তার মধ্যে দুধ ও জলকে আলাদা করে দিতে পারে। আর সেই কারণেই জ্ঞান সাধনার ভালো-মন্দ পৃথক করতে পারে।

বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মহাসমারোহে সরস্বতী পূজা পালিত হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা এই পূজা আয়োজন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ঢাকার সরস্বতী পূজার প্রধান কেন্দ্র ও আকর্ষণের স্থান হয়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই এখানে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। জগন্নাথ হলের সরস্বতী পূজার ব্যাপকতা ও বহুমাত্রিকতা প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। পূজাকে কেন্দ্র করে কেবল শিক্ষার্থীরাই নয়, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব পেশার আবাল বৃদ্ধ বনিতার মিলনমেলায় পরিণত হয়।