মাহবুব পিয়াল, ফরিদপুর : ফরিদপুরে সাবজেননেসা মহিলা কামিল (এমএ) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আলমগীর হোসাইনের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন ও অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এমনকি তাঁর কক্ষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে যৌন উত্তেজক ঔষধ ও সরঞ্জাম পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ তুলে অধ্যক্ষের অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। আজ রোববার দুপুর সাড়ে ১২ টায় মাদ্রাসার সামনের সড়কে দাড়িয়ে মানববন্ধন করেন।
জানা যায়, ইসলামী শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৮৯ সালে ফরিদপুর শহরের পূর্বখাবাসপুর এলাকায় সাবজেননেসা মহিলা কামিল মাদ্রাসা স্থাপিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত এবং বর্তমানে আবাসিক সুবিধাসহ সেখানে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী এবং ত্রিশজন শিক্ষক রয়েছেন। ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটিতে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন মো. আলমগীর হোসাইন। এরপর থেকে বিভিন্ন বরাদ্দ, অনুদান, টিউশন ফি’র অর্থ আত্মসাৎ সহ বিভিন্ন অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়েন বলে মানববন্ধনে শিক্ষকেরা অভিযোগ করেন৷
যারমধ্যে মাদ্রাসার সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কর্তৃক দুই দফায় তিন লাখ টাকা, জেলা পরিষদের দেয়া দুই লাখ টাকা, মন্ত্রণালয়ের অডিটের নামে শিক্ষক কর্মচারীদের নিকট থেকে উত্তোলনকৃত এক লাখ টাকা, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে মাদ্রাসায় অনুদানের জন্য প্রকাশনী কর্তৃক বরাদ্দকৃত এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে তাঁরা জানান। পাশাপাশি বিএমএড প্রোগ্রাম হতে বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাৎ, কোটেশন ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠ্যবই বিক্রি সহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ করেন।
এছাড়া ফাজিল প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে চাকরি ও অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক কাজে বাধ্য করেন বলে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন। যা গত ১৬ আগস্টে হাতেনাতে ধরেন শিক্ষার্থীরা, তখন একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটিংও ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখান অধ্যক্ষ, এমনকি লাঠি দিয়ে মারধরও করেন৷ এ ঘটনার পর অসুস্থতার কারন দেখিয়ে ১৯ আগস্ট প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও জেলা প্রশাসকের নিকট ছুটি নিয়ে মাদ্রাসা ত্যাগ করেন৷ এরপর থেকে মাদ্রাসটিতে আর ফিরেননি৷
এরমধ্যে গত ১৯ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগ দেয়া হয়। এরমধ্যে গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটিতে যান জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশানার (শিক্ষা কল্যাণ) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইনসানা তানজীন ইকো। ওই সময় তাঁর উপস্থিতিতে অধ্যক্ষের কক্ষের টেবিলের ড্রয়ার থেকে বিভিন্ন যৌন উত্তেজক ঔষধ ও সরঞ্জাম পাওয়া যায় বলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. মো. আমিনুল ইসলাম জানান। এছাড়া বিভিন্ন বরাদ্দের নথিপত্র পাওয়া যায়নি বলেও উল্লেখ করেন।
এ সময় বাংলা বিভাগের প্রভাষক ফারজানা আক্তার অভিযোগ করে বলেন- “অধ্যক্ষ আলমগীর হোসাইনের নৈতিক সমস্যা রয়েছে, তাঁর কাছে এখানকার কেউ নিরাপদ নয়। এই প্রতিষ্ঠানেরই শিক্ষার্থীকে চাকরির প্রলোভন ও আবাসিক হোস্টেলে সহকারীর দায়িত্ব দিয়ে অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। বিভিন্ন সময় মেয়েটিকে তাঁর কক্ষে নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটাতেন। যা একদিন শিক্ষার্থীরাই হাতেনাতে ধরে এবং তাঁদের হোয়াটসঅ্যাপে কথাপোকথনের একাধিক প্রমাণও পাওয়া গিয়েছে। তাই আমরা মনে করি, রক্ষকই যখন ভক্ষক, তখন তাঁর অপসারণ ছাড়া কোনো পথ নেই।”
এছাড়া শিক্ষার্থীকে কুপ্রস্তাব ও শ্রেণিকক্ষে কৌশলে স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেওয়ারও অভিযোগ করেন একাধিক শিক্ষার্থী। এমন অভিযোগ তুলে তাঁরা দরুত অপসারণের দাবি জানান।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. মো. আমিনুল ইসলাম বলেন- “একজন অধ্যক্ষের কক্ষে যখন যৌন উত্তেজক ঔষধ পাওয়া যায় তখন তাঁর কতটা অধপতন হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। তাঁর অনৈতিক কর্মকান্ডের একাধিক প্রমাণও পাওয়ায় যায়। এমতাবস্থায় তাঁর দ্রুত অপসারণ দাবি করছি।”
তবে এসব অভিযোগ ষড়যন্ত্রমূলক দাবি করেন অধ্যক্ষ মো. আলমগীর হোসাইন। এছাড়া অভিযোগ পাওয়া মেয়েটির সম্পর্কে তিনি বলেন, মেয়েটি শিক্ষার্থী ছাড়াও মাদ্রাসার হোস্টেল সুপার; যে কারনে হোস্টেলের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য তাঁর সাথে নিয়মিত কথা ও যোগাযোগ হতো এবং বিভিন্ন বিষয়ে কথা হওয়াটাই স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এসব বিষয়ে জানতে সহকারী কমিশনার (শিক্ষা ও কল্যাণ) ইনসানা তানজীন ইকো বলেন- “অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ পেয়েছি এবং তদন্ত কমিটির গঠন করা হয়েছে। অভিযোগগুলো তদন্তনাধীন রয়েছে।”
মাহবুব পিয়াল 




















