মাহবুব পিয়াল, ফরিদপুর : ফরিদপুর শহরের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী পুরাতন কালীবাড়ি মন্দিরে দুর্ধর্ষ চুরির ছয় দিনের মাথায় কষ্টিপাথরের কালীমূর্তি ও স্বর্ণালংকারসহ অধিকাংশ মালামাল উদ্ধার করেছে পুলিশ। একে একে মন্দিরের একাধিক তালা কেটে প্রায় ২০ কেজি ওজনের কালীমূর্তিটি নিয়ে গিয়েছিল চোরচক্র। পরে সেটি বোয়ালমারী উপজেলার একটি বাড়ির পেছনে মাটির নিচে পুঁতে রাখা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার ও লুট হওয়া স্বর্ণ-রৌপ্যের অলংকার ও ছয়টি পিতলের প্রতিমাও উদ্ধার করেছে পুলিশ।

রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) ফরিদপুর জেলা পুলিশ আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজি।

পুলিশের প্রেস বিফ্রিং ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে পূজা-অর্চনা শেষে কালীমাতাকে শয়ন দিয়ে মন্দিরের দরজা-গেটে তালা লাগিয়ে চলে যান মন্দিরের সেবায়েত ও কমিটির সভাপতি কুশল চক্রবর্তী। পরেরদিন ভোরে মন্দিরে গিয়ে তিনি দেখতে পান, একাধিক তালা কাটা এবং দরজা খোলা। ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, শ্বেতপাথরের শিবমূর্তির ওপর স্থাপিত কষ্টিপাথরের কালীমূর্তিটি নেই। মূর্তির সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকার, পিতলের বিভিন্ন প্রতিমা ও রৌপ্যের অলংকারও লুট করে নিয়ে গেছে চোরের দল।
ওই ঘটনার পর কুশল চক্রবর্তীর অভিযোগের ভিত্তিতে ২০ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, চুরি যাওয়া কষ্টিপাথরের কালীমূর্তিটির ওজন প্রায় ২০ কেজি এবং আনুমানিক মূল্য এক কোটি টাকা। মূর্তির গায়ে থাকা স্বর্ণালংকারের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
এছাড়া মন্দির থেকে বিভিন্ন পিতলের প্রতিমা এবং মহাদেবের সঙ্গে থাকা রৌপ্যের অলংকারসহ অন্যান্য সামগ্রী চুরি যায়।
এ ঘটনার পরপরই পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল), কোতোয়ালি থানা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও তদন্তকারী কর্মকর্তার সমন্বয়ে একাধিক দল তদন্তে নামে।
তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তথ্য ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চোরচক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা হয়। এরপর ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, আলফাডাঙ্গা থানার বুড়াইচ গ্রামের আসাদুজ্জামান সাদ্দাম (৩৮), তার মা সাজেদা বেগম (৬৫), বোয়ালমারী থানার কান্দাকুল গ্রামের আল আমিন মোল্লা (২৪) এবং আতিয়ার রহমান।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার সাজেদা বেগমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার বাড়ির রান্নাঘরের মাটির নিচে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় চুরি যাওয়া স্বর্ণ ও রৌপ্যের অলংকার এবং ছয়টি পিতলের প্রতিমা।
অন্যদিকে আসাদুজ্জামান সাদ্দাম ও আল আমিন মোল্লার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বোয়ালমারী থানার রুপাপাত এলাকার একটি বাড়ির পেছনে অভিযান চালিয়ে মাটির নিচে পুঁতে রাখা কষ্টিপাথরের কালীমূর্তিটি উদ্ধার করে পুলিশ।
তদন্তে চুরি হওয়া স্বর্ণালংকারের একটি অংশেরও সন্ধান পায় পুলিশ। সাদ্দামের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বোয়ালমারী বাজারের স্বর্ণপট্টির একটি জুয়েলারি দোকানে অভিযান চালানো হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, দোকান মালিক আতিয়ার রহমানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চুরি হওয়া প্রতিমার কানের দুল, টিকলিসহ অন্যান্য অলংকার গলিয়ে তৈরি করা প্রায় আট আনা স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধার করা সব আলামত সাক্ষীদের উপস্থিতিতে জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তার আসাদুজ্জামান সাদ্দামের বিরুদ্ধে চুরি, দস্যুতা, ডাকাতি ও মূর্তি চুরিসহ ১০টির বেশি মামলা রয়েছে। আল আমিন মোল্লার বিরুদ্ধেও একই ধরনের আটটির বেশি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজি বলেন, প্রথমদিকে কোনো নির্দিষ্ট সূত্র না থাকায় ঘটনাটি ক্লু-লেস মনে হলেও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তৎপরতা ও ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে ছয় দিনের মধ্যে চুরির রহস্য উদঘাটন এবং কালীমূর্তিসহ অধিকাংশ মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তিনি জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
Reporter Name 















