বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতার বার্তা দিয়ে নয়াদিল্লি ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্বের শিল্পোন্নত ও বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট জি-২০ সম্মেলন শেষ হলো। আগামী বছর ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনেরিতে ১৯তম জি-২০ সম্মেলনের আসর বসবে।
আজ রবিবার দুপুরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক পৃথিবী এক পরিবার স্লোগানে প্রতিষ্ঠিত জোটের পরবর্তী প্রেসিডেন্সি লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার হাতে প্রেসিডেন্সি ব্যাটন তুলে দিয়েছেন। আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে ব্রাজিলের আনুষ্ঠানিক মেয়াদ শুরু হবে। জোটের ১৯তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে রিও ডি জেনেরোতে।
রবিবার নয়াদিল্লির প্রগতি ময়দানে ভারত মণ্ডপমে সমাপনী বক্তব্যে নরেন্দ্র মোদি বলেন, আমরা এক পৃথিবী, এক পরিবার অধিবেশনে বিস্তৃত আলোচনা করেছি। আমি সন্তুষ্ট যে, আজ জি-২০ এক পৃথিবী, এক পরিবার, এক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী প্রচেষ্টার একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে।
লুলা দা সিলভা মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই, শক্তির পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়নকে জি-২০ এর অগ্রাধিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক শক্তি ফিরে পেতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী, অস্থায়ী সদস্য হিসেবে নতুন উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রয়োজন। আমরা বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ-এ উদীয়মান দেশগুলোর জন্য বৃহত্তর প্রতিনিধিত্ব চাই।
শীর্ষ সম্মেলনের বড় অংশ ছিল ‘বিশ্বব্যাপী আস্থার ঘাটতি’, গ্লোবাল বায়োফুয়েল অ্যালায়েন্সের সূচনা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, সৌদি আরব এবং উপসাগরীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ নেটওয়ার্ক চালু করার আহ্বান।
জি-২০ সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে দিল্লি ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেছে, যা শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন সমুন্নত রাখার জন্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
ঘোষণায় বলা হয়েছে, আমরা সব রাষ্ট্রকে আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাসহ আন্তর্জাতিক আইনের নীতিগুলোকে সমুন্নত রাখার জন্য আহ্বান জানাই।
চীন এবং রাশিয়া, যাদের রাষ্ট্রপ্রধানরা শীর্ষ সম্মেলন এড়িয়ে গেছেন, তারাও দিল্লি ঘোষণার সঙ্গে একমত ছিল। কিন্তু যখন ঘোষণায় সব রাষ্ট্রকে বলপ্রয়োগ করে ভূখণ্ড না দখলের আহ্বান জানানো হলেও ইউক্রেনে যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার নিন্দা করা হয়নি।
ঘোষণায় আরো বলেছে, তারা ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষমতা তিনগুণ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে এবং জাতীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কয়লা শক্তি হ্রাস করার প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করবে তবে তেল এবং গ্যাসসহ সব দূষণকারী জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে ক্রমান্বয়ে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
ইউক্রেন যুদ্ধের উল্লেখ করে ঘোষণাপত্রের অষ্টম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ সভায় গৃহীত প্রস্তাবই মানতে হবে। কোনো দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত চলবে না। গায়ের জোরে কোনো দেশের ভৌগোলিক সীমানা লঙ্ঘন নয় বা তার পরিবর্তন নয়। পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার বা ব্যবহারের হুমকিও কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
জি-২০ বৈঠকে দিল্লি ঘোষণাপত্র গৃহীত না হলে তা ভারতের নেতৃত্বের পক্ষে একটা বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে শেষ পর্যন্ত ভারতের কূটনীতিকেরা সমাধান সূত্রের খোঁজ দিতে পেরেছেন। ঘোষণাপত্রে কয়েকটি অধ্যায় নতুন করে লিখে যোগ করা হয়েছে। যেখানে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গও ঘোষণাপত্রে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে রাশিয়ার নাম কোথাও সরাসরি উচ্চারণ করা হয়নি। তাই রাশিয়াও এই ঘোষণাপত্রে সম্মত জানিয়েছে। আগে থেকেই রাশিয়া হুমকি দিয়ে রেখেছিল যে, তাদের বিরুদ্ধে ঘোষণাপত্রে কোনো কিছু উল্লেখ করা হলে, তারা বিরোধিতা করবে এবং ঘোষণাপত্র বয়কট করবে।
বিশ্বের জিডিপির ৮৫ শতাংশই আসে জি-২০ জোটভুক্ত দেশগুলো থেকে। পাশাপাশি ৮০ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ আসে এই দেশগুলো থেকেই। তারা জীবাশ্ম জ্বালানি ভর্তুকি নির্মূল এবং যুক্তিযুক্ত করার জন্য পিটাসবার্গে করা ২০০৯ সালের প্রতিশ্রুতি বজায় রাখবে বলে জানিয়েছে। এবারের সম্মেলনে আফ্রিকান ইউনিয়নকে জি-২০-এর নতুন স্থায়ী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গতকাল রবিবারের সমাপনী অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বাংলাদেশের সরকারপ্রধানসহ জি-২০ তে অংশ নেওয়া বিশ্ব নেতারা নয়াদিল্লিতে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধ রাজঘাটে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাজঘাটে সবাইকে স্বাগত জানান।
অনলাইন ডেস্ক 




















