শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড শুধু সেনা অভ্যুত্থান নয়। নির্মম ওই হত্যার নেপথ্যে কারা? সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা। ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার হওয়া আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে নেপথ্যের কুশীলবদের পরিচয় জানার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে নির্মম ইতিহাসের নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারে মোজাফফরের কোর্ট মার্শাল।
৩০ মে ১৯৮১ সাল। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বদলে যায় রাজনীতির গতিপথ।
পরে সামরিক আদালতে ১৮ সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়। ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও পলাতক ছিলেন দুই মেজর। তাদের একজন মেজর মোজাফফর হোসেন। তবে পলাতক এই আসামি গ্রেপ্তারের পর এখন শুরু হবে তার বিচারিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কীভাবে হবে তার বিচারপ্রক্রিয়া?
এমন প্রশ্নের জবাবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্যারিস্টার এম. সারোয়ার হোসেন বলেন, তার বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হলে প্রথমে আরেকটি তদন্ত হবে। সেই তদন্তে তিনি পলাতক ছিলেন কি না, সেই বিষয়টি বিবেচনায় আসবে। এছাড়া আগে যে তদন্ত হয়েছিল, সেই তদন্তে তার বিরুদ্ধে কী সুপারিশ ও কী ফাইন্ডিংস ছিল, সেটিও বিবেচনায় নেয়া হবে।
তিনি বলেন, এরপর তার সম্পর্কে সাক্ষীদের সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করতে হবে। সামারি অব এভিডেন্স সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন করে একটি কোর্ট মার্শাল কনভেন করার আদেশ হবে। মেডিকেল টেস্টের পর তাকে ব্যক্তিগতভাবে জিজ্ঞেস করা হবে, তিনি দোষী না নির্দোষ। এর জবাব দেবেন যার বিচার হবে, তিনিই। এখানে দুটি অভিযোগ রয়েছে। একটি হলো, তিনি পলাতক ছিলেন; অন্যটি হলো মিউটিনি। এই দুটি অভিযোগের ভিত্তিতেই তার সাজা হবে।
ব্যারিস্টার এম. সারোয়ার হোসেন বলেন, এর মধ্যে অনেকগুলো ‘প্যান্ডোরার বক্স’ খুলে যেতে পারে। যেমন, এ ঘটনার সঙ্গে কোনো পার্শ্ববর্তী দেশ জড়িত ছিল কি না, তাদের কোনো গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত ছিল কি না, এরশাদ কতখানি জড়িত ছিলেন এবং কেন জেনারেল মঞ্জুরকে কোর্ট মার্শাল বা বিচার করার কথা বলা হয়নি—এসব বিষয় সামনে আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, কোর্ট মার্শালে ডিফেন্স করার সুযোগ রয়েছে। যেহেতু এ ঘটনার সঙ্গে জনস্বার্থ জড়িত এবং দেশের একজন সিটিং প্রেসিডেন্ট নিহত হয়েছেন, তাই জনগণের এসব বিষয় জানার অধিকার রয়েছে।
ঐতিহাসিক ও মামলাসংক্রান্ত বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা হামলা চালিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী এবং সরাসরি অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মেজর মোজাফফর হোসেন অন্যতম ছিলেন।
মামলাসংক্রান্ত বিবরণ অনুযায়ী, হামলার সময় মোজাফফর হোসেনই প্রথম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করেন এবং তাকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালান। হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পরপরই তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে টেলিফোনে বার্তা দেন – ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিল্ড’ (রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়েছে)।
হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর অভিযানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরসহ বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তীতে আবুল মঞ্জুর নিহত হন। পরে গঠিত সামরিক ট্রাইব্যুনালে জিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে ১৮ জন সেনা কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি ৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
সেই বিচারে ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন গ্রেফতার হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেও মেজর মোজাফফর হোসেন ও মেজর এস এম খালেদ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাজা এড়াতে মেজর মোজাফফর হোসেন দীর্ঘ সময় ভারতে আত্মগোপনে ছিলেন। বিশেষ করে ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন এবং পরবর্তীতে ছদ্মনাম ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত ও আত্মগোপন করে আসছিলেন।
অবশেষে সাড়ে চার দশক পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে এই শীর্ষ পলাতক আসামির গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও বর্বরোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় এক নতুন ও বড় অগ্রগতি এলো। সেনাবাহিনীর নিজস্ব বিচার প্রক্রিয়ার (কোর্ট মার্শাল) মাধ্যমে এখন তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, তিন মাসের মধ্যেই কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেনের বহুল আলোচিত এ বিচারকাজ শেষ হতে পারে।