ঢাকা ০৭:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পানি সমাচার: পানিই জীবন, অতরিক্ত ও ভুল নিয়ম ও সময়ে পানি পান মারাত্মক বিপদ

সুস্থ থাকতে পানি পানের বিকল্প নেই। তবে সেই পানি যেন বিশুদ্ধ হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ অপরিষ্কার পানি পান করলে তা মারাত্মক সব অসুখ ডেকে আনতে পারে। এমনকী দেখা দিতে পারে জীবনহানির ভয়ও! তবে যেকোনো সময় পানি পান করলেই হবে না, সময় বুঝে পান করতে হবে। ভাবছেন, পানি পানের আবার সময়-অসময় কী! আপনি যদি ভুল সময়ে পানি পান করেন তবে শরীরে দেখা দিতে পারে নানারকম সমস্যা। তাই শুধু বিশুদ্ধ পানিই নয়, ঠিক রাখতে হবে পানি পানের সময়ও।

তৃষ্ণা পেলে আমরা পানি পান করি। তবে তৃষ্ণা মেটানো ছাড়াও পানির রয়েছে অনেক কাজ। যেমন এটি আমাদের শরীরে পানির মাত্রা ঠিক রাখে, অতিরিক্ত ক্যালোরি পোড়ায় এবং কমায় ক্ষুধাভাব। তবে কিছু সময় রয়েছে যখন পানি পান করলে ঘটতে পারে হিতে বিপরীত। খাওয়ার সময় বারবার পানি পান করার অভ্যাস আছে অনেকের। কিন্তু এটি মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। কারণ খাবার খাওয়ার মাঝে বেশি পানি পান করা হয়ে গেলে তা হজমের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। অতিরিক্ত পানি হজম সহায়ক এনজাইম ও অ্যাসিডের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

যে তিন সময়ে পানি পান করলেই বিপদ!

শরীর সুস্থ রাখতে চাইলে প্রতিদিন নিয়ম করে পানি পান করতেই হয়। সারা দিনে দুই লিটারের কম পানি খেলে শরীর শুকিয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি আপনি দিনে তিন-চার লিটার পানি পান করতে পারেন।

কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যম আনন্দবাজার তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বেশি করে পানি পান করুন তবে, সব সময়ে যে পানি পান করতে হবে তা কিন্তু নয়, কিছু কিছু সময়ে মোটেই পানি পান করতে নেই।

প্রতিবেদনে তিনটি সময়ের কথা তারা উল্লেখ করেছে। ওই তিন সময়ে একদম পানি পান করা যাবে না।

১. পেট ভরে খাওয়ার পরে

পেট ভরে খাবার খেয়ে উঠেই ঢকঢক করে পানি পান করছেন? বাদ দিন এই অভ্যাস। খাবার খাওয়ার আগে পানি পানের অভ্যাস করুন। তাও খেতে হবে খাবার খাওয়ার অন্তত মিনিট পনেরো আগে। খাবারের মাঝখানে পানি পান করাও বাদ দিতে হবে। তবে খুব তেষ্টা পেলে অল্প পানি পান করা যেতে পারে। কিন্তু বেশি পানি পান করে ফেললে তা নানা অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

২. ঝাল খাওয়ার পরে

খাবার খাওয়ার সময়ে ঝাল লাগলে অনেকেই পানি পান করেন। বিশেষ করে শিশুদের ঝাল লাগলেতো তাদের পানি খাইয়ে দেওয়াই হয়। কিন্তু এটি ঠিক কাজ নয়। খাবারের যে উপাদানের কারণে ঝাল লেগেছে, সেটি এর ফলে গোটা পেটে ছড়িয়ে পড়ে। এতে হজমের সমস্যা হয়। অন্ত্রের অন্য সমস্যাও হতে পারে। ঝাল ধীরে ধীরে মুখে সইয়ে নেয়ায় ভালো।

৩. ঘুমের আগে

আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন পানি পান করে ঘুমাতে যান। এটিও ঠিক অভ্যাস নয়। এতে কিডনির উপর চাপ পড়ে। তাছাড়া প্রস্রাবের চাপে ঘুম ভেঙে যেতে পারে। তাতে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষতি হয়।

৪. শরীরচর্চার পরে

এই সময়ে প্রচুর ঘাম হয়। ফলে শরীরে পানির চাহিদা দেখা দেয়। তখন ঢকঢক করে পানি খেলে কিডনির উপর চাপ পড়ে। কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে তার পরেই পানি পান করা উচিত।

প্রস্রাব যদি পরিষ্কার হয়

প্রস্রাবের রং হলুদ হলে তা দুশ্চিন্তার বিষয়। কিন্তু প্রস্রাব পরিষ্কার থাকলে চিন্তার কিছু নেই। তখন বুঝবেন শরীরে পর্যাপ্ত পানি রয়েছে। কারণ শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দিলে প্রস্রাব হলুদ হতে পারে। কিন্তু শরীরে পর্যাপ্ত পানি থাকার পরেও যদি আপনি বারবার পানি পান করতে থাকেন, তখন ঘটতে পারে হিতে বিপরীত।

দাঁড়িয়ে পানি খেলে কি কি সমস্যা হতে পারে?

প্রথমত ইসলাম দাঁড়িয়ে পানি পান করাকে সমর্থন করে না।তবে আপাতত সেই দিকে যাচ্ছিনা। দাঁড়িয়ে পানি পান করতে নিষেধ করা হয় কেন?

পানি পান করার পরেই ছাঁকনিগুলো শরীর পরিশ্রুত করার কাজ শুরু করে দেয়। দাঁড়িয়ে পানি পান করলে শরীরের অন্দরে থাকা ছাকনিগুলি সংকুচিত হয়ে যায়। পরিশ্রুত করার কাজ বাধা পায়। শরীরে টক্সিনের মাত্রা বাড়তে পার।

দাঁড়িয়ে পানি পান করলে তা সরাসরি পাকস্থলীতে গিয়ে আঘাত করে। স্টমাক থেকে নিঃসৃত অ্যাসিডের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বদহজমের আশঙ্কা বাড়ে। তলপেটে যন্ত্রণা সহ একাধিক সমস্যা তৈরি হয়।

শরীরের মধ্যে থাকা কিছু উপকারি রাসায়নিকের মাত্রা কমতে থাকে। ফলে জয়েন্টের কর্মক্ষমতা কমে যায়। সেখান থেকে আর্থারাইটিসের আশঙ্কা বাড়ে।

দাঁড়িয়ে পানি পান করলে নার্ভ উত্তেজিত হয়ে যায়। উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

দাঁড়িয়ে পানি পান করলে কিডনির কর্মক্ষমতা কমে। কিডনি ড্যামেজের সম্ভাবনা থাকে।

দাঁড়িয়ে পানি পান করলে তা সরাসরি ইসোফেগাসে গিয়ে ধাক্কা মারে। এরফলে পাকস্থলীর ভেতরের সরু নালিটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। যার ফলে গ্যাস্ট্রো ইসোফেগাল রিফ্লাক্স ডিজিজ বা G.E.R.D এর মতো রোগ শরীরে বাসা বাঁধে।

গ্রীষ্মকালের বড় সমস্যা হতে পারে পানিশূন্যতা। পর্যাপ্ত পানি পান না করার কারণে হওয়া এই সমস্যায় কমবেশি সবাই ভুক্তভোগী।

সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে রমজান মাসে সারাদিন রোজা রাখা। ইফতারের পর থেকে আবার রোজা ধরা পর্যন্ত সবাই চেষ্টা করেন যথেষ্ট পরিমাণ পানি পান করার। তবে চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে অতিরিক্ত পানি পান করে ফেলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আর অন্য সবকিছুর মতো পানিও প্রয়োজনের বেশি পান করার জটিলতা আছে। স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে জানানো হল কীভাবে বুঝবেন বেশি পানি পান করা হচ্ছে।

১. হাইপোন্যাট্রেমিয়া: শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা অনেক কমে গেলে এই সমস্যা দেখা দেয়।

দেহের সকল কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করতে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার সোডিয়াম প্রয়োজন। অতিরিক্ত পানি পান করলে শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা কমে যায়। এছাড়াও অতিরিক্ত পানি পান করলে শরীর পানি জমিয়ে রাখতে শুরু করে, ফলে বাড়তি পানি বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে যায়।

২. প্রস্রাবের রং: বেশি পানি পান করলে প্রসাবের মাত্রা বাড়বে সেটাই স্বাভাবিক। তবে খেয়াল রাখতে হবে মুত্রের রংয়ের দিকে।

স্বাভাবিক প্রসাবের রংয়ে মৃদু হলুদ আভা থাকবে। তবে প্রয়োজনের বেশি পানি পান করলে প্রসাব পুরোপুরি স্বচ্ছ হয়ে যায়।

৩. তৃষ্ণা ছাড়াই পানি পান: পানির চাহিদা পূরণ করা জন্য অনেকেই হাতের কাছে সবসময় পানির বোতল রাখেন। তেষ্টা না পেলেও কিছুক্ষণ পরপর পানিতে চুমুক দেন। তৃষ্ণা হল পানিশূন্যতা মোকাবেলায় শরীরের জৈবিক হাতিয়ার।

তাই তৃষ্ণা না পেলেও যদি পানি পান করেন সেক্ষেত্রে শরীরের কোনো উপকার করছেন না। বরং শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে দ্বিধাগ্রস্ত করছেন।

৪. বমিভাব ও বমি: পানিশূন্যতা আর অতিরিক্ত পানি পানের উপসর্গ এক রকম না হওয়াই স্বাভাবিক। অতিরিক্ত পানি পান করলে বৃক্ক তার ধরে রাখতে পারে না, ফলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে তা ছড়িয়ে যায়। এতে পেটের বিভিন্ন স্থানে প্রদাহ দেখা দিতে পারে, দেখা দিতে পারে বমিভাব এবং বমি।

৫. মাথাব্যথা: দপদপানি মাথাব্যথা অতিরিক্ত পানি পান করার আরেকটি উপসর্গ, যা সনাক্ত করা বেশ কঠিন। বেশি পানি পান করার কারণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ফুলে যায়, লবণের মাত্রা ভারসাম্য হারায় এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়ুর উপর চাপ প্রয়োগ করে। আর একারণেই দেখা দেয় মাথাব্যথা।

৬. হাত, ঠোঁট ফুলে যাওয়া: মুখমণ্ডল আর শরীরের বিভিন্ন অংশে ফোলাভাব দেখা দেওয়া বেশি পানি পান করার লক্ষণ হতে পারে। শরীরে প্রয়োজনের বেশি পানিই এই ফুলে যাওয়ার কারণ। সেই সঙ্গে ত্বকের রং পরিবর্তনও হতে পারে। আর শরীর ফুলে যাওয়া কারণে বাড়তে পারে ওজনও।

৭. পেশি ব্যথা: শরীরে পানি বেশি হলে ‘ইলেক্ট্রোলাইট’য়ের মাত্রা কমে যাবে। এই ভারসাম্যহীনতার কারণে শরীর ব্যথা, রগে টান পড়া, শরীর শক্ত হয়ে থাকা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর সবকিছুর সঙ্গেই থাকবে শারীরিক দূর্বলতা।

দৈনিক কতটা পানি পান করব

পানি না-থাকলে শরীরটাই থাকবে না! আমাদের কোষ-কলার কাজকর্ম সঠিকভাবে চালিয়ে যেতে পানি অপরিহার্য। শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখতে, রেচনক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরের ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দিতে, সুষ্ঠভাবে পাচনক্রিয়া পরিচালনা করতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে, অস্থিসন্ধির নমনীয়তা রক্ষা করতে ও সর্বোপরি মস্তিস্ক রক্ষা করার জন্য পানি অপরিহার্য। এছাড়া, বয়স ধরে রাখতে ও ত্বক টানটান রাখতে পানির ভূমিকা অনস্বীকার্য। এককথায় বলা যায়, পানি ছাড়া আমাদের দেহযন্ত্রটি অচল হয়ে পড়বে।
দৈনিক কতটা পানি প্রত্যেকের পান করা উচিত? সাধারণত দিনে প্রত্যেকের তিন থেকে সাড়ে তিন লিটার পানি পান করা উচিত। অবশ্য কে কোন ধরনের জলবায়ুতে বাস করছেন, কেমন ধরনের কাজ করছেন তার ওপরে পানিপানের অভ্যাস ও পরিমাণ নির্ভর করে। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে মানুষের ঘাম হয় বেশি। ফলে অনেকটা পানি শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে, যাঁরা শীতপ্রধান দেশে বাস করেন, তাঁদের ঘাম হয় কম। তাঁদের পানি পানের পরিমাণ গ্রীষ্মপ্রধান দেশে বসবাসকারী মানুষের চাইতে নিশ্চয় কম হবে। আবার কিছু মানুষ সারাদিন এসিতে থাকেন। শরীর থেকে ঘাম ঝরে না একবিন্দু। অথচ কিছু লোককে দিনভর রৌদ্রে ঘাম ঝরিয়ে কাজ করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই এই শ্রেণির মানুষকে পানি একটু বেশিই পান করতে হবে।
তাপমাত্রা বেড়ে ৪৫ ডিগ্রি হয়ে গেলে দৈনিক ৬ থেকে ৭ লিটার পানি পান করুন। সম্প্রতি এই ধরনের একটা মেসেজ সোশ্যাল মিডিয়া এবং হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার হচ্ছে। এই তথ্য কতটা সঠিক? দৈনিক ৬ থেকে ৭ লিটার পানি পান করা কি আদৌ সম্ভব? বাইরের তাপমাত্রা যাই হোক না-কেন, ঘাম খুব বেশি হলে বড়জোর চার লিটার পানিপান করা যেতে পারে। এর চাইতে বেশি পানি পানের কোনও বাস্তব কারণ নেই।
ছোটোরাও বাইরে ঘোরাঘুরি করে, ছোটাছুটি করে। গরমের দিনে তাদের কতটা পানি পান করা দরকার? ছোটো মানে কতটা ছোটো, সেটা দেখতে হবে। সাধারণভাবে স্কুলে যায় এমন বাচ্চাদের সম্পর্কে বলা যেতে পারে। স্কুলগোয়িং বাচ্চাদের অন্তত দুই থেকে আড়াই লিটার পানি পান করতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, তারা যেখান সেখান থেকে পানি না খায়। সেক্ষেত্রে পানিবাহিত নানা অসুখে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
বিশ্বের সমস্ত উন্নত দেশে সরকারেরই দায়িত্ব থাকে জনগণকে শুদ্ধ পানি সরবরাহ করার। এ দেশে বহু জায়গায় কোনও কোনও বাড়িতে পানি পৌঁছয় না! সেখানে শুদ্ধ পানি সরবরাহ করা তো আরও বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত দেশে শহরে যে সমস্ত উৎস থেকে পানি সরবরাহ হয়, সেখানে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। এমনকি, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন-এর বেঁধে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী সেই পানির গুণমানের পরীক্ষা হয়। আমাদের দেশে সেরকম নজরদারির ব্যবস্থা কোথায়? ফলে এ দেশের মানুষের মধ্যে হেপাটাইটিস-এ, হেপাটাইটিস-ই, টাইফয়েড, কলেরা, ডায়ারিয়ার মতো পানিবাহিত রোগ হয়। নজরদারির কারণেই উন্নত দেশের মানুষের মধ্যে এই রোগগুলো কম দেখা যায় আর এ দেশে বেশি হয়।
খুব সহজে শুদ্ধ পানি পাওয়ার একটাই উপায় আছে। পানি ফুটিয়ে পান করা। রাতে পানি ফুটিয়ে নিতে হবে। এতে পানিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া মারা পড়বে। তারপর সারারাত একটা পাত্রে সেই পানি রেখে ঠান্ডা করতে হবে। এর ফলে পানিতে থাকা অজৈব পদার্থগুলো পানির নিচে থিতিয়ে পড়বে। সকালে পাত্রে রাখা পানির নিচের অংশটুকু রেখে বাকিটা ছেঁকে পান করলেই চলবে। এ ছাড়া, যাঁদের বাড়িতে ওয়াটার পিউরিফায়ার রাখার সামর্থ্য আছে, তাঁরা নিজের উদ্যোগে রিভার্স অসমোসিস প্রযুক্তিযুক্ত ওয়াটার পিউরিফায়ার রাখতে পারেন। তবে এই পদ্ধতি খরচসাপেক্ষ এবং অনেকটা পানি নষ্ট হয়। সাধারণ পিউরিফায়ারে নোংরা আটকানোর ক্ষমতা থাকলেও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণু ধ্বংস ও প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা নেই।
অনেকের ধারণা, খাওয়ার আগে পানি পান করলে খাবার হজমে ভালো সাহায্য করে। সেরকম কোনও ব্যাপার নেই। অনেকে রোগা হওয়ার জন্য প্রতিবার খাওয়ার আগে অনেকটা পানি পান করেন। এর ফলে জিভ চাইলেও অতিরিক্ত খাবার খাওয়া যায় না তবে খাবার খাওয়ার অন্তত আধঘন্টা পর পানি পান করলে খাদ্য হজমে সুবিধা হয়।
কেউ কেউ বলেন, খাবার সময়ে পানি পান করলে নাকি খাদ্য ভালো হজম হয় না। এরকম নির্দিষ্ট কোনও প্রতিবন্ধকতা নেই। খাবার খাওয়ার সময় সামান্য পরিমাণে পানি পান করাই যায়। মুশকিল হল, অনেকেই সময়ের অভাবে তাড়াহুড়ো করে খান। পানি দিয়ে খাবার গিলে নেন। এমন অভ্যাস ভালো নয়। খাবার চিবিয়ে খেলে তবেই হজম দ্রুত হবে। কারণ খাওয়ার সময় মুখগহ্বরে থাকা নানা গ্রন্থি থেকে এনজাইম ক্ষরিত হয়ে খাবারে মেশে। এছাড়া, পাকস্থলীসহ পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন অ্যাসিড, এনজাইম ক্ষতি হয়। খাবার খেতে খেতে প্রচুর পরিমাণে পানি খেলে সেগুলোর কার্যকারিতা বিঘ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ফলে খেয়ে পানি খেতে নেই এমনটা অনেকে বলে থাকেন। তবে, আলাদা করে কোনও কারণ নেই। ফলও তো আসলে খাবার। খাবারের সঙ্গে হজমে সাহায্যকারী অ্যাসিড, এনজাইমগুলো মিশতে হবে। সে-কারণেই অনেকে ফল খাওয়ার পরেই পানি খেতে নিষেধ করেন। তবে সামান্য পানি পান করাই যায়। পানি খুব কম পান করলে যে কোনো কাজেই খুব দ্রুত ক্লান্তি আসবে, কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা দেখা দেবে। হজমে সমস্যা, ওজন বৃদ্ধি পাওয়া, দ্রুত জরা আসা, নার্ভের অসুখ, কিডনি, হার্টের সমস্যা-নানা ধরনের রোগ হতে পারে।
পানি কম খেলে যেমন বিপদ, তেমনি বেশি খাওয়াও ভালো নয়। অতিরিক্ত যে-কোনো কিছুই শরীরের পক্ষে খারাপ। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের বেশি পানি পান করলে হাইপোথার্মিয়া দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে, সোডিয়াম পটাশিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হয়, পেটের ও লিভারের সমস্যা দেখা দেয়, ব্রেনসহ সারা শরীরের কোষ ফুলে যায়। এছাড়া, হার্টে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, বেড়ে যায় কিডনির কাজ। দীর্ঘদিন এমন হতে থাকলে হার্ট ও কিডনির অসুখ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
হার্টের ও কিডনির সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে পানি পান করুন। বিশেষ করে কিডনির অসুখ থাকলে রোগীকে সারাদিনে হিসাব করেই পানি পান করতে হবে। কেউ ঠান্ডা পানি পান করতে ভালোবাসেন, কেউ আবার গরম পানি। চীন দেশে আগে লোকে উষ্ণ পানিই পান করত। আর উষ্ণ পানি পান করে তাঁদের জাতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, এমন খবর এখনও পর্যন্ত নেই। তা বলে ফোসকা পড়া গরম পানি নিশ্চয় কেউ পান করেন না! আর ঠান্ডা পানির প্রসঙ্গে বলা যায়, বহু মানুষ ঠান্ডা পানি পান করতে পছন্দ করেন। আসলে কে, কেমন পানি পান করবে তা মানুষ এবং একটা জাতির অভ্যাসের উপর নির্ভর করে।

Tag :

পানি সমাচার: পানিই জীবন, অতরিক্ত ও ভুল নিয়ম ও সময়ে পানি পান মারাত্মক বিপদ

Update Time : ০৫:২২:৪১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১ নভেম্বর ২০২১

সুস্থ থাকতে পানি পানের বিকল্প নেই। তবে সেই পানি যেন বিশুদ্ধ হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ অপরিষ্কার পানি পান করলে তা মারাত্মক সব অসুখ ডেকে আনতে পারে। এমনকী দেখা দিতে পারে জীবনহানির ভয়ও! তবে যেকোনো সময় পানি পান করলেই হবে না, সময় বুঝে পান করতে হবে। ভাবছেন, পানি পানের আবার সময়-অসময় কী! আপনি যদি ভুল সময়ে পানি পান করেন তবে শরীরে দেখা দিতে পারে নানারকম সমস্যা। তাই শুধু বিশুদ্ধ পানিই নয়, ঠিক রাখতে হবে পানি পানের সময়ও।

তৃষ্ণা পেলে আমরা পানি পান করি। তবে তৃষ্ণা মেটানো ছাড়াও পানির রয়েছে অনেক কাজ। যেমন এটি আমাদের শরীরে পানির মাত্রা ঠিক রাখে, অতিরিক্ত ক্যালোরি পোড়ায় এবং কমায় ক্ষুধাভাব। তবে কিছু সময় রয়েছে যখন পানি পান করলে ঘটতে পারে হিতে বিপরীত। খাওয়ার সময় বারবার পানি পান করার অভ্যাস আছে অনেকের। কিন্তু এটি মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। কারণ খাবার খাওয়ার মাঝে বেশি পানি পান করা হয়ে গেলে তা হজমের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। অতিরিক্ত পানি হজম সহায়ক এনজাইম ও অ্যাসিডের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

যে তিন সময়ে পানি পান করলেই বিপদ!

শরীর সুস্থ রাখতে চাইলে প্রতিদিন নিয়ম করে পানি পান করতেই হয়। সারা দিনে দুই লিটারের কম পানি খেলে শরীর শুকিয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি আপনি দিনে তিন-চার লিটার পানি পান করতে পারেন।

কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যম আনন্দবাজার তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বেশি করে পানি পান করুন তবে, সব সময়ে যে পানি পান করতে হবে তা কিন্তু নয়, কিছু কিছু সময়ে মোটেই পানি পান করতে নেই।

প্রতিবেদনে তিনটি সময়ের কথা তারা উল্লেখ করেছে। ওই তিন সময়ে একদম পানি পান করা যাবে না।

১. পেট ভরে খাওয়ার পরে

পেট ভরে খাবার খেয়ে উঠেই ঢকঢক করে পানি পান করছেন? বাদ দিন এই অভ্যাস। খাবার খাওয়ার আগে পানি পানের অভ্যাস করুন। তাও খেতে হবে খাবার খাওয়ার অন্তত মিনিট পনেরো আগে। খাবারের মাঝখানে পানি পান করাও বাদ দিতে হবে। তবে খুব তেষ্টা পেলে অল্প পানি পান করা যেতে পারে। কিন্তু বেশি পানি পান করে ফেললে তা নানা অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

২. ঝাল খাওয়ার পরে

খাবার খাওয়ার সময়ে ঝাল লাগলে অনেকেই পানি পান করেন। বিশেষ করে শিশুদের ঝাল লাগলেতো তাদের পানি খাইয়ে দেওয়াই হয়। কিন্তু এটি ঠিক কাজ নয়। খাবারের যে উপাদানের কারণে ঝাল লেগেছে, সেটি এর ফলে গোটা পেটে ছড়িয়ে পড়ে। এতে হজমের সমস্যা হয়। অন্ত্রের অন্য সমস্যাও হতে পারে। ঝাল ধীরে ধীরে মুখে সইয়ে নেয়ায় ভালো।

৩. ঘুমের আগে

আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন পানি পান করে ঘুমাতে যান। এটিও ঠিক অভ্যাস নয়। এতে কিডনির উপর চাপ পড়ে। তাছাড়া প্রস্রাবের চাপে ঘুম ভেঙে যেতে পারে। তাতে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষতি হয়।

৪. শরীরচর্চার পরে

এই সময়ে প্রচুর ঘাম হয়। ফলে শরীরে পানির চাহিদা দেখা দেয়। তখন ঢকঢক করে পানি খেলে কিডনির উপর চাপ পড়ে। কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে তার পরেই পানি পান করা উচিত।

প্রস্রাব যদি পরিষ্কার হয়

প্রস্রাবের রং হলুদ হলে তা দুশ্চিন্তার বিষয়। কিন্তু প্রস্রাব পরিষ্কার থাকলে চিন্তার কিছু নেই। তখন বুঝবেন শরীরে পর্যাপ্ত পানি রয়েছে। কারণ শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দিলে প্রস্রাব হলুদ হতে পারে। কিন্তু শরীরে পর্যাপ্ত পানি থাকার পরেও যদি আপনি বারবার পানি পান করতে থাকেন, তখন ঘটতে পারে হিতে বিপরীত।

দাঁড়িয়ে পানি খেলে কি কি সমস্যা হতে পারে?

প্রথমত ইসলাম দাঁড়িয়ে পানি পান করাকে সমর্থন করে না।তবে আপাতত সেই দিকে যাচ্ছিনা। দাঁড়িয়ে পানি পান করতে নিষেধ করা হয় কেন?

পানি পান করার পরেই ছাঁকনিগুলো শরীর পরিশ্রুত করার কাজ শুরু করে দেয়। দাঁড়িয়ে পানি পান করলে শরীরের অন্দরে থাকা ছাকনিগুলি সংকুচিত হয়ে যায়। পরিশ্রুত করার কাজ বাধা পায়। শরীরে টক্সিনের মাত্রা বাড়তে পার।

দাঁড়িয়ে পানি পান করলে তা সরাসরি পাকস্থলীতে গিয়ে আঘাত করে। স্টমাক থেকে নিঃসৃত অ্যাসিডের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বদহজমের আশঙ্কা বাড়ে। তলপেটে যন্ত্রণা সহ একাধিক সমস্যা তৈরি হয়।

শরীরের মধ্যে থাকা কিছু উপকারি রাসায়নিকের মাত্রা কমতে থাকে। ফলে জয়েন্টের কর্মক্ষমতা কমে যায়। সেখান থেকে আর্থারাইটিসের আশঙ্কা বাড়ে।

দাঁড়িয়ে পানি পান করলে নার্ভ উত্তেজিত হয়ে যায়। উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

দাঁড়িয়ে পানি পান করলে কিডনির কর্মক্ষমতা কমে। কিডনি ড্যামেজের সম্ভাবনা থাকে।

দাঁড়িয়ে পানি পান করলে তা সরাসরি ইসোফেগাসে গিয়ে ধাক্কা মারে। এরফলে পাকস্থলীর ভেতরের সরু নালিটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। যার ফলে গ্যাস্ট্রো ইসোফেগাল রিফ্লাক্স ডিজিজ বা G.E.R.D এর মতো রোগ শরীরে বাসা বাঁধে।

গ্রীষ্মকালের বড় সমস্যা হতে পারে পানিশূন্যতা। পর্যাপ্ত পানি পান না করার কারণে হওয়া এই সমস্যায় কমবেশি সবাই ভুক্তভোগী।

সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে রমজান মাসে সারাদিন রোজা রাখা। ইফতারের পর থেকে আবার রোজা ধরা পর্যন্ত সবাই চেষ্টা করেন যথেষ্ট পরিমাণ পানি পান করার। তবে চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে অতিরিক্ত পানি পান করে ফেলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আর অন্য সবকিছুর মতো পানিও প্রয়োজনের বেশি পান করার জটিলতা আছে। স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে জানানো হল কীভাবে বুঝবেন বেশি পানি পান করা হচ্ছে।

১. হাইপোন্যাট্রেমিয়া: শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা অনেক কমে গেলে এই সমস্যা দেখা দেয়।

দেহের সকল কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করতে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার সোডিয়াম প্রয়োজন। অতিরিক্ত পানি পান করলে শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা কমে যায়। এছাড়াও অতিরিক্ত পানি পান করলে শরীর পানি জমিয়ে রাখতে শুরু করে, ফলে বাড়তি পানি বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে যায়।

২. প্রস্রাবের রং: বেশি পানি পান করলে প্রসাবের মাত্রা বাড়বে সেটাই স্বাভাবিক। তবে খেয়াল রাখতে হবে মুত্রের রংয়ের দিকে।

স্বাভাবিক প্রসাবের রংয়ে মৃদু হলুদ আভা থাকবে। তবে প্রয়োজনের বেশি পানি পান করলে প্রসাব পুরোপুরি স্বচ্ছ হয়ে যায়।

৩. তৃষ্ণা ছাড়াই পানি পান: পানির চাহিদা পূরণ করা জন্য অনেকেই হাতের কাছে সবসময় পানির বোতল রাখেন। তেষ্টা না পেলেও কিছুক্ষণ পরপর পানিতে চুমুক দেন। তৃষ্ণা হল পানিশূন্যতা মোকাবেলায় শরীরের জৈবিক হাতিয়ার।

তাই তৃষ্ণা না পেলেও যদি পানি পান করেন সেক্ষেত্রে শরীরের কোনো উপকার করছেন না। বরং শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে দ্বিধাগ্রস্ত করছেন।

৪. বমিভাব ও বমি: পানিশূন্যতা আর অতিরিক্ত পানি পানের উপসর্গ এক রকম না হওয়াই স্বাভাবিক। অতিরিক্ত পানি পান করলে বৃক্ক তার ধরে রাখতে পারে না, ফলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে তা ছড়িয়ে যায়। এতে পেটের বিভিন্ন স্থানে প্রদাহ দেখা দিতে পারে, দেখা দিতে পারে বমিভাব এবং বমি।

৫. মাথাব্যথা: দপদপানি মাথাব্যথা অতিরিক্ত পানি পান করার আরেকটি উপসর্গ, যা সনাক্ত করা বেশ কঠিন। বেশি পানি পান করার কারণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ফুলে যায়, লবণের মাত্রা ভারসাম্য হারায় এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়ুর উপর চাপ প্রয়োগ করে। আর একারণেই দেখা দেয় মাথাব্যথা।

৬. হাত, ঠোঁট ফুলে যাওয়া: মুখমণ্ডল আর শরীরের বিভিন্ন অংশে ফোলাভাব দেখা দেওয়া বেশি পানি পান করার লক্ষণ হতে পারে। শরীরে প্রয়োজনের বেশি পানিই এই ফুলে যাওয়ার কারণ। সেই সঙ্গে ত্বকের রং পরিবর্তনও হতে পারে। আর শরীর ফুলে যাওয়া কারণে বাড়তে পারে ওজনও।

৭. পেশি ব্যথা: শরীরে পানি বেশি হলে ‘ইলেক্ট্রোলাইট’য়ের মাত্রা কমে যাবে। এই ভারসাম্যহীনতার কারণে শরীর ব্যথা, রগে টান পড়া, শরীর শক্ত হয়ে থাকা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর সবকিছুর সঙ্গেই থাকবে শারীরিক দূর্বলতা।

দৈনিক কতটা পানি পান করব

পানি না-থাকলে শরীরটাই থাকবে না! আমাদের কোষ-কলার কাজকর্ম সঠিকভাবে চালিয়ে যেতে পানি অপরিহার্য। শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখতে, রেচনক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরের ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দিতে, সুষ্ঠভাবে পাচনক্রিয়া পরিচালনা করতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে, অস্থিসন্ধির নমনীয়তা রক্ষা করতে ও সর্বোপরি মস্তিস্ক রক্ষা করার জন্য পানি অপরিহার্য। এছাড়া, বয়স ধরে রাখতে ও ত্বক টানটান রাখতে পানির ভূমিকা অনস্বীকার্য। এককথায় বলা যায়, পানি ছাড়া আমাদের দেহযন্ত্রটি অচল হয়ে পড়বে।
দৈনিক কতটা পানি প্রত্যেকের পান করা উচিত? সাধারণত দিনে প্রত্যেকের তিন থেকে সাড়ে তিন লিটার পানি পান করা উচিত। অবশ্য কে কোন ধরনের জলবায়ুতে বাস করছেন, কেমন ধরনের কাজ করছেন তার ওপরে পানিপানের অভ্যাস ও পরিমাণ নির্ভর করে। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে মানুষের ঘাম হয় বেশি। ফলে অনেকটা পানি শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে, যাঁরা শীতপ্রধান দেশে বাস করেন, তাঁদের ঘাম হয় কম। তাঁদের পানি পানের পরিমাণ গ্রীষ্মপ্রধান দেশে বসবাসকারী মানুষের চাইতে নিশ্চয় কম হবে। আবার কিছু মানুষ সারাদিন এসিতে থাকেন। শরীর থেকে ঘাম ঝরে না একবিন্দু। অথচ কিছু লোককে দিনভর রৌদ্রে ঘাম ঝরিয়ে কাজ করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই এই শ্রেণির মানুষকে পানি একটু বেশিই পান করতে হবে।
তাপমাত্রা বেড়ে ৪৫ ডিগ্রি হয়ে গেলে দৈনিক ৬ থেকে ৭ লিটার পানি পান করুন। সম্প্রতি এই ধরনের একটা মেসেজ সোশ্যাল মিডিয়া এবং হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার হচ্ছে। এই তথ্য কতটা সঠিক? দৈনিক ৬ থেকে ৭ লিটার পানি পান করা কি আদৌ সম্ভব? বাইরের তাপমাত্রা যাই হোক না-কেন, ঘাম খুব বেশি হলে বড়জোর চার লিটার পানিপান করা যেতে পারে। এর চাইতে বেশি পানি পানের কোনও বাস্তব কারণ নেই।
ছোটোরাও বাইরে ঘোরাঘুরি করে, ছোটাছুটি করে। গরমের দিনে তাদের কতটা পানি পান করা দরকার? ছোটো মানে কতটা ছোটো, সেটা দেখতে হবে। সাধারণভাবে স্কুলে যায় এমন বাচ্চাদের সম্পর্কে বলা যেতে পারে। স্কুলগোয়িং বাচ্চাদের অন্তত দুই থেকে আড়াই লিটার পানি পান করতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, তারা যেখান সেখান থেকে পানি না খায়। সেক্ষেত্রে পানিবাহিত নানা অসুখে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
বিশ্বের সমস্ত উন্নত দেশে সরকারেরই দায়িত্ব থাকে জনগণকে শুদ্ধ পানি সরবরাহ করার। এ দেশে বহু জায়গায় কোনও কোনও বাড়িতে পানি পৌঁছয় না! সেখানে শুদ্ধ পানি সরবরাহ করা তো আরও বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত দেশে শহরে যে সমস্ত উৎস থেকে পানি সরবরাহ হয়, সেখানে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। এমনকি, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন-এর বেঁধে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী সেই পানির গুণমানের পরীক্ষা হয়। আমাদের দেশে সেরকম নজরদারির ব্যবস্থা কোথায়? ফলে এ দেশের মানুষের মধ্যে হেপাটাইটিস-এ, হেপাটাইটিস-ই, টাইফয়েড, কলেরা, ডায়ারিয়ার মতো পানিবাহিত রোগ হয়। নজরদারির কারণেই উন্নত দেশের মানুষের মধ্যে এই রোগগুলো কম দেখা যায় আর এ দেশে বেশি হয়।
খুব সহজে শুদ্ধ পানি পাওয়ার একটাই উপায় আছে। পানি ফুটিয়ে পান করা। রাতে পানি ফুটিয়ে নিতে হবে। এতে পানিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া মারা পড়বে। তারপর সারারাত একটা পাত্রে সেই পানি রেখে ঠান্ডা করতে হবে। এর ফলে পানিতে থাকা অজৈব পদার্থগুলো পানির নিচে থিতিয়ে পড়বে। সকালে পাত্রে রাখা পানির নিচের অংশটুকু রেখে বাকিটা ছেঁকে পান করলেই চলবে। এ ছাড়া, যাঁদের বাড়িতে ওয়াটার পিউরিফায়ার রাখার সামর্থ্য আছে, তাঁরা নিজের উদ্যোগে রিভার্স অসমোসিস প্রযুক্তিযুক্ত ওয়াটার পিউরিফায়ার রাখতে পারেন। তবে এই পদ্ধতি খরচসাপেক্ষ এবং অনেকটা পানি নষ্ট হয়। সাধারণ পিউরিফায়ারে নোংরা আটকানোর ক্ষমতা থাকলেও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণু ধ্বংস ও প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা নেই।
অনেকের ধারণা, খাওয়ার আগে পানি পান করলে খাবার হজমে ভালো সাহায্য করে। সেরকম কোনও ব্যাপার নেই। অনেকে রোগা হওয়ার জন্য প্রতিবার খাওয়ার আগে অনেকটা পানি পান করেন। এর ফলে জিভ চাইলেও অতিরিক্ত খাবার খাওয়া যায় না তবে খাবার খাওয়ার অন্তত আধঘন্টা পর পানি পান করলে খাদ্য হজমে সুবিধা হয়।
কেউ কেউ বলেন, খাবার সময়ে পানি পান করলে নাকি খাদ্য ভালো হজম হয় না। এরকম নির্দিষ্ট কোনও প্রতিবন্ধকতা নেই। খাবার খাওয়ার সময় সামান্য পরিমাণে পানি পান করাই যায়। মুশকিল হল, অনেকেই সময়ের অভাবে তাড়াহুড়ো করে খান। পানি দিয়ে খাবার গিলে নেন। এমন অভ্যাস ভালো নয়। খাবার চিবিয়ে খেলে তবেই হজম দ্রুত হবে। কারণ খাওয়ার সময় মুখগহ্বরে থাকা নানা গ্রন্থি থেকে এনজাইম ক্ষরিত হয়ে খাবারে মেশে। এছাড়া, পাকস্থলীসহ পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন অ্যাসিড, এনজাইম ক্ষতি হয়। খাবার খেতে খেতে প্রচুর পরিমাণে পানি খেলে সেগুলোর কার্যকারিতা বিঘ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ফলে খেয়ে পানি খেতে নেই এমনটা অনেকে বলে থাকেন। তবে, আলাদা করে কোনও কারণ নেই। ফলও তো আসলে খাবার। খাবারের সঙ্গে হজমে সাহায্যকারী অ্যাসিড, এনজাইমগুলো মিশতে হবে। সে-কারণেই অনেকে ফল খাওয়ার পরেই পানি খেতে নিষেধ করেন। তবে সামান্য পানি পান করাই যায়। পানি খুব কম পান করলে যে কোনো কাজেই খুব দ্রুত ক্লান্তি আসবে, কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা দেখা দেবে। হজমে সমস্যা, ওজন বৃদ্ধি পাওয়া, দ্রুত জরা আসা, নার্ভের অসুখ, কিডনি, হার্টের সমস্যা-নানা ধরনের রোগ হতে পারে।
পানি কম খেলে যেমন বিপদ, তেমনি বেশি খাওয়াও ভালো নয়। অতিরিক্ত যে-কোনো কিছুই শরীরের পক্ষে খারাপ। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের বেশি পানি পান করলে হাইপোথার্মিয়া দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে, সোডিয়াম পটাশিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হয়, পেটের ও লিভারের সমস্যা দেখা দেয়, ব্রেনসহ সারা শরীরের কোষ ফুলে যায়। এছাড়া, হার্টে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, বেড়ে যায় কিডনির কাজ। দীর্ঘদিন এমন হতে থাকলে হার্ট ও কিডনির অসুখ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
হার্টের ও কিডনির সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে পানি পান করুন। বিশেষ করে কিডনির অসুখ থাকলে রোগীকে সারাদিনে হিসাব করেই পানি পান করতে হবে। কেউ ঠান্ডা পানি পান করতে ভালোবাসেন, কেউ আবার গরম পানি। চীন দেশে আগে লোকে উষ্ণ পানিই পান করত। আর উষ্ণ পানি পান করে তাঁদের জাতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, এমন খবর এখনও পর্যন্ত নেই। তা বলে ফোসকা পড়া গরম পানি নিশ্চয় কেউ পান করেন না! আর ঠান্ডা পানির প্রসঙ্গে বলা যায়, বহু মানুষ ঠান্ডা পানি পান করতে পছন্দ করেন। আসলে কে, কেমন পানি পান করবে তা মানুষ এবং একটা জাতির অভ্যাসের উপর নির্ভর করে।