ফরিদপুর জিলা স্কুলের ১৮৫তম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানের সমাপনী দিনে বহিরাগতদের ইট-পাটকেল নিক্ষেপের মুখে দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা জেমসের কনসার্ট পণ্ড হয়। এতে আয়োজক কমিটির আহ্বায়কসহ আহত হন ২৫-৩০ জন। এবার বিষয়টি নিয়ে মুখ খুললেন জেমস।
কনসার্ট পণ্ড হওয়ার দায় আয়োজকদের কাঁধে চাপিয়েছেন জেমস। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, এটি সম্পূর্ণ আয়োজকদের অব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থতা।
জেমসের ব্যক্তিগত সহকারী রবিন ঠাকুর বলেন, এ আয়োজনে অংশ নিতে সাড়ে সাতটায় ফরিদপুর পৌঁছাই। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পরেই জানতে পারি সেখানে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। আমরা তখন গেস্ট হাউসেই ছিলাম। রাত সাড়ে ১০টায় বিশৃঙ্খলা চরম আকার ধারণ করলে অনুষ্ঠান বাতিলের কথা আমাদের জানানো হয়। এরপর ঢাকায় চলে আসি।
শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে স্কুল প্রাঙ্গণে জেমসের সংগীত পরিবেশনের কথা ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী ও আয়োজক সূত্রে জানা যায়, পুনর্মিলনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি শুধু নিবন্ধিত প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত ছিল। অনিবন্ধিত কয়েক হাজার বহিরাগত দর্শক সংগীতশিল্পী জেমসের কথা শুনে চলে আসেন। তাদেরকে ভেতরে ঢুকতে না দেওয়ায় তারা পাশের রাস্তা মুজিব সড়কে অবস্থান নেন। পরে আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে গানের পরিবেশনা দেখার জন্য বাইরে দুটি প্রজেক্টর লাগিয়ে দেওয়া হয়। তবে এতেও সন্তুষ্ট না হয়ে বহিরাগতরা দেওয়াল বেয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। এতে বাধা দেওয়ায় স্কুল প্রাঙ্গণের দর্শক ও মঞ্চের দিকে একের পর এক ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন তারা। এ সময় স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে বিক্ষুব্ধরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।পরিস্থিতির অবনতি হলে রাত ১০টার দিকে আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ডা. মুস্তাফিজুর রহমান শামীম মঞ্চ থেকে ঘোষণা দেন, উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে জেমসের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক শ্রাবণ্য তৌহিদা। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি তুলে ধরেছেন সেদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা।
শ্রাবণ্য জানান, অনুষ্ঠান তখন বেশ সুন্দরভাবেই এগুচ্ছিলো। জেমস মঞ্চে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি নিজে মঞ্চে দাঁড়িয়ে র্যাফেল ড্র পরিচালনা করছিলেন। ঠিক তখনই হঠাৎ আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো ইট-পাথর পড়তে শুরু করে।
তিনি লেখেন, হঠাৎ একটি বড় পাথর ঠিক আমার সামনেই এসে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু বদলে গেল। মানুষের চোখেমুখে তখন শুধুই ভয়।
প্রায় ১৫ হাজার মানুষের ভিড় সামলাতে আয়োজকদের তখন হিমশিম খেতে হয়। ইটের আঘাতে অনুষ্ঠানস্থলেই অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থীসহ বহু মানুষ আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় প্রায় তিন ঘণ্টা অনিশ্চয়তার পর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অনুষ্ঠান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় আয়োজক কমিটি।
আয়োজক কমিটির সূত্র জানায়, এই অনুষ্ঠানটি শুধুমাত্র নিবন্ধিত প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত ছিল। তবে জেমসের কনসার্টের খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্কুলের বাইরে ভিড় জমান অসংখ্য অনিবন্ধিত দর্শক। ভেতরে ঢুকতে না পেরে তারা স্কুলের আশপাশে অবস্থান নেন এবং একপর্যায়ে দেয়াল টপকে ঢোকার চেষ্টা করেন।
বাধা দিলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের দিক থেকে স্কুল প্রাঙ্গণ ও মঞ্চ লক্ষ্য করে শুরু হয় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ। এতে আয়োজক কমিটির আহ্বায়কসহ অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জন আহত হন।
ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত নাকচ করে দেয় জেলা পুলিশ ও আয়োজক কমিটি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ইটের আঘাতে অনেকে আহত হলেও নিহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আহতদের মধ্যে ১০ থেকে ১২ জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কড়া নিরাপত্তায় দ্রুত অনুষ্ঠানস্থল ছাড়েন জেমস। তার সঙ্গে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা শিল্পীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
শ্রাবণ্য তৌহিদা আক্ষেপ করে বলেন, শিল্পী হিসেবে তিনি ও জেমস দুজনই পারিশ্রমিক পেয়েছেন। কিন্তু হাজারও মানুষের স্বপ্নভঙ্গ আর যে মানসিক আঘাত তৈরি হয়েছে তা কোনো অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
উল্লখ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা, স্মৃতিচারণা আর আবেগঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে ফরিদপুর জিলা স্কুলের ১৮৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী পুনর্মিলনী উৎসব শুরু হয়েছলি।
বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) সকালে নানা আয়োজনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গৌরবময় পথচলা উদযাপন শুরু হয়। শেষ হওয়ার কথাছলি শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর)।
বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জিলা স্কুল ক্যাম্পাসে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর আগে একটি অ্যাসেম্বলি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। অ্যাসেম্বলিতে পিটি প্রদর্শন করা হয়।
এর আগে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়। পরে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় জাতীয় পতাকা, উৎসবের পতাকা ও জিলা স্কুলের পতাকা উত্তোলন করা হয়। যৌথভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান মোল্লা ও পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম। যৌথভাবে উৎসবের পতাকা উত্তোলন করেন গৌরবময় ১৮৫ বছর পূর্তি ও পুনর্মিলনী উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান এবং সদস্য সচিব ওয়াহিদ মিয়া। জিলা স্কুলের পতাকা উত্তোলন করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রীতিলতা সরকার।
এরপর শান্তির প্রতীক পায়রা অবমুক্ত করা হয় এবং ফেস্টুনসহ বেলুন উড়িয়ে দেওয়া হয়। এ আয়োজন সফল করতে সংশ্লিষ্টরা সার্বিকভাবে কাজ করে আসছিলেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, আমাদের পারস্পরিক ভাববিনিময়ের মাধ্যমে নিজ নিজ ঐতিহ্য ও কৃষ্টি অনুসরণ করে চলতে হবে। জিলা স্কুল যে স্বপ্ন দেখায়, তা যেন যুগ যুগান্তর ধরে আমাদের পাথেয় হয়ে থাকে। এ স্বপ্ন যেন জাতি ধারণ ও লালন করে এ প্রত্যাশা তিনি ব্যক্ত করেন। তিনি আরও বলেন, জিলা স্কুল যে স্বপ্ন দেখায়, সে স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে গেলে দেশ এগিয়ে যাবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব ওয়াহিদ মিয়া। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম এবং ফরিদপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রীতিলতা সরকার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উৎসব কমিটির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান। উপস্থাপনা করেন যুগ্ম আহ্বায়ক মির্জা মো. আরিফুল ইসলাম।
অনলাইন ডেস্ক 

















