মুখোমুখি দুই দল। শোভাযাত্রা বনাম পদযাত্রা। চূড়ান্ত শক্তি পরীক্ষার মহড়ায় ফের রাজপথে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ছয় মাস বাকি থাকতেই রাজপথে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে দল দুটি। সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনের দাবিতে আজ মঙ্গলবার রাজধানীতে বড় সমাবেশের মাধ্যমে ‘পদযাত্রা’ করবে বিএনপি। একই দিন রাজধানীতে ‘শান্তি ও উন্নয়ন শোভাযাত্রা’য় ব্যাপক শোডাউনের মাধ্যমে রাজপথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার শক্তি দেখাবে আওয়ামী লীগ। লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটিয়ে বড় শোডাউনের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি। কোনো অবস্থায় সরকারবিরোধীদের রাজপথ দখল এবং সন্ত্রাস-নৈরাজ্য সৃষ্টির সুযোগ দিতে চায় না তারা। পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন-সাফল্যের গতিধারা এগিয়ে নিতে আওয়ামী লীগের বিজয় প্রয়োজন- জনগণকে এমন সুস্পষ্ট বার্তা তুলে ধরতে চায় দলটি।
মূলত, সরকারের পদত্যাগসহ নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক দফার দাবি আদায়ে গত ১২ জুলাই রাজধানীর নয়াপল্টনে দলীয় সমাবেশ থেকে ১৮ ও ১৯ জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি। পরদিন ১৩ জুলাই ওই দুই দিনই সারাদেশে শান্তি ও উন্নয়ন শোভাযাত্রার কর্মসূচির ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের প্রতিবাদে আজ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনের সামনে থেকে ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবন পর্যন্ত শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। বিকাল ৩টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনের সমাবেশে প্রধান অতিথি থাকবেন ওবায়দুল কাদের। সমাবেশের পর শোভাযাত্রা শুরু হয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, মিলনায়তনের সামনে থেকে ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবন পর্যন্ত শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। বিকাল ৩টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনের সমাবেশে প্রধান অতিথি থাকবেন ওবায়দুল কাদের। সমাবেশের পর শোভাযাত্রা শুরু হয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, শাহবাগ, এলিফ্যান্ট রোড ও সিটি কলেজের সড়ক হয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হবে। আগামীকাল বুধবার ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের ব্যানারে বিকাল ৩টায় রাজধানীর তেজগাঁও সাতরাস্তা থেকে মহাখালী পর্যন্ত শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। শোভাযাত্রার আগে সাতরাস্তায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথি থাকবেন ওবায়দুল কাদের। এছাড়া এদিন আওয়ামী লীগের শান্তি ও উন্নয়ন শোভাযাত্রার কর্মসূচি পালিত হবে ঢাকা, রংপুর, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগের অন্তর্গত সব জেলা ও মহানগরে।
নৌকার শোডাউনে ‘উন্নয়নগাথা’ : বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচির দিনে শান্তি সমাবেশ ও রাজপথে সতর্ক অবস্থান নিয়ে এর আগে থেকেই সক্রিয় ছিল আওয়ামী লীগ। ঢাকাসহ সারাদেশে এ শান্তি সমাবেশ করে আসছিল দলের সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো। তবে আজকের শান্তি সমাবেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। এ কারণে সমাবেশে সর্বোচ্চসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতারা বলছেন, পদযাত্রার নামে বিএনপি সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য করতে চাইলে সমুচিত জবাব দেয়া হবে। সরকারের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের স্পষ্ট উচ্চারণ, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা আগামী নির্বাচন পর্যন্ত মাঠে আছি। কাউকে মাঠ দখলে নিতে দেব না, মাঠ ছেড়েও দেব না। দেশে কাউকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগও দেব না।
শান্তি ও উন্নয়ন শোভাযাত্রা থেকে জনগণকে কী বার্তা দিতে চান- এমন প্রশ্নের জবাবে সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন ভোরের কাগজকে বলেন, বিএনপি-জামায়াতের কর্মসূচি মানেই সন্ত্রাস, অগ্নিসংযোগ, নাশকতার আশঙ্কা। তাদের অতীত কর্মকাণ্ড এই আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। উন্নয়ন ও শান্তির শোভাযাত্রার মাধ্যমে জনগণকে আশস্ত করা এবং শান্তি অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হচ্ছে। সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা শান্তি ও উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে চাই। আর এই ধারা অব্যাহত রাখার জন্য শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। সংবিধান মেনেই নির্বাচন হবে। নির্বাচনে আমরা নৌকার জন্য জনগণের কাছে শান্তি ও উন্নয়ন বার্তা তুলে ধরার পাশাপাশি জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ দমনে সরকারের সাফল্য তুলে ধরব।
পদযাত্রায় ‘গণজোয়ার’ চায় বিএনপি : সরকারের পদত্যাগের দাবিতে এক দফা আন্দোলনের অংশ হিসেবে দুদিনের পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি। আজ ঢাকাসহ দেশের সব জেলা ও মহানগরে পদযাত্রা করবে দলটির নেতাকর্মীরা। একই দাবিতে আগামীকাল বুধবারও ঢাকায় পদযাত্রা করবে দলটি। আজ মঙ্গলবার ঢাকা মহানগরসহ দেশের প্রতিটি মহানগর ও জেলায় পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি। সকাল ১০টায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি গাবতলী থেকে পদযাত্রা শুরু করবে এবং মগবাজারে যুক্ত হবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি। পদযাত্রাটি টেকনিক্যাল মোড়, মিরপুর-১, মিরপুর-১০ গোলচত্বর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, তালতলা (আগারগাঁও), বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, এফডিসি, মগবাজার, মালিবাগ, কাকরাইল, নয়াপল্টন, ফকিরাপুল, মতিঝিল (শাপলা চত্বর), ইত্তেফাক মোড় এবং দয়াগঞ্জ রায়সাহেব বাজার মোড়ে গিয়ে বিকাল ৪টায় ১৩ কিলোমিটারের পদযাত্রা শেষ হবে। আগামীকাল আব্দুল্লাহপুর থেকে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির পদযাত্রা শুরু হবে। পরে বিমানবন্দর, কুড়িল বিশ্বরোড, নতুন বাজার, বাড্ডা, রামপুরা ব্রিজ, আবুল হোটেল, খিলগাঁও, বাসাবো, মুগদাপাড়া, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ীতে (চৌরাস্তা) বিকাল ৪টায় ২৪ কিলোমিটারের পদযাত্রা শেষ হবে। রামপুরা ব্রিজে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি পদযাত্রায় যুক্ত হবে।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচি সফল করতে নেয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। ঢাকার পাশাপাশি সব জেলার পদযাত্রা কর্মসূচির দিকেও কড়া নজর রাখছেন দলটির হাইকমান্ড। সমাবেশের মতোই পদযাত্রায় উপস্থিতি বাড়াতে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশ দিয়েছে বিএনপি। একইসঙ্গে দলের শীর্ষ নেতাদের নিজ নিজ এলাকার পদযাত্রায় অংশ নিতে কড়া বার্তা দেয়া হয়েছে। পদযাত্রায় গণজোয়ার সৃষ্টি করতে চায় রাজপথের এই বিরোধী দল।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, পদযাত্রা জনসমুদ্রে রূপ নেবে। আন্দোলন আরো শক্তিশালী ও বেগবান হয়ে এই সরকারের পতন ঘটাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ‘স্বাভাবিক’ রাজনীতি : রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসবে মুখোমুখি কর্মসূচি ততই বাড়বে। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার ভোরের কাগজকে বলেন, নির্বাচনের আগে এমন পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি স্বাভাবিক। এটিই সজীব এবং প্রাণবন্ত রাজনীতি। নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে মাঠের রাজনীতি এমন উত্তেজনাপূর্ণই হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ কাউকে আক্রমণ না করে ততক্ষণ পর্যন্ত সমস্যা নেই। তিনি বলেন, কথামালার রাজনীতি বাড়বে, মাঠের কর্মসূচি বাড়বে- তবে মাত্রা যেন ছাড়িয়ে না যায়। মারামারি কিংবা বিগত দিনে মানুষ মারার মতো নিষ্ঠুর আচরণ মানুষকে আতঙ্কিত করে তোলে। রাজনৈতিক দলগুলোর এদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে কর্মসূচি পালন করা উচিত।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে কোনো আশঙ্কা রয়েছে কিনা- জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার গোলাম ফারুক ভোরের কাগজকে বলেন, দুই দলের কর্মসূচির গতিপথ দুই দিকে। কর্মসূচি শুরুর সময়ও ভিন্ন। তবে কোনো ধরনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত রয়েছি।
অনলাইন ডেস্ক 




















