রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ৯৬ বছর বয়সে পরলোকগমন করেছেন । দীর্ঘ রোগভোগের পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্কটল্যান্ডের বালমোরাল প্রাসাদে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন দীর্ঘ ৭০ বছর ব্রিটেনের মসনদে থাকা রানি। বাকিংহ্যাম প্যালেস থেকে তার মৃত্যু খবর ঘোষণা করা হয়।
শুক্রবার অর্থাৎ আজ রানির লাশ লন্ডনে নিয়ে আসা হবে। রানি হিসেব তার দীর্ঘ জীবনে তিনি যেমন সাধারণ মানুষের কিছুটা নাগালের বাইরেই থেকেছেন, তেমনি প্রাসাদে থেকেও তাকে ধাক্কা সামলাতে হয়েছে বেশকিছু ঘটনার। বিশেষ করে চার্লস ও ডায়নার বিচ্ছেদ, ডায়নার অস্বাভাবিক মৃত্যুর মতো বিষয়ের ঘটনা তাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। দুনিয়ার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনারও সাক্ষী থেকেছেন তিন। তিনি দেখে গিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির হত্যা, মানুষের চাঁদে পা রাখা, বার্লিন প্রাচীরের ভাঙন ও কোভিডের মতো মহামারী।
* পুরো নাম : এলিজাবেথ আলেকজান্ডার মেরি
* জন্ম : ২১ এপ্রিল, ১৯২৬
* পিতা : ষষ্ঠ জর্জ
* মাতা : এলিজাবেথ বোয়েস-লিয়ন
* রাজ্যাভিষেক : ২ জুন, ১৯৫৩
* সন্তান : চার ছেলে-মেয়ে- যুবরাজ চার্লস (৭৩) (উত্তরাধিকারী), রাজকুমারী অ্যান (৭২), যুবরাজ অ্যান্ড্রিউ (৬২) ও যুবরাজ এডওয়ার্ড (৫৮)।
* ১৯৩৬ সালে রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের পর সিংহাসনে আরোহন করেন এলিজাবেথের পিতা রাজা ষষ্ঠ জর্জ।
* রাজা ষষ্ঠ জর্জের সিংহাসনে আরোহণের সময় থেকেই উত্তরাধিকারী দ্বিতীয় এলিজাবেথ।
* দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রানি ব্রিটিশ স্থলসেনাবাহিনীর নারী বিভাগ অক্সিলিয়ারি টেরিটোরিয়াল সার্ভিসে কর্মরত ছিলেন।
* ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার বাবা জর্জ মারা যান।
* ২ জুন এলিজাবেথের রাজ্যাভিষেক।
* এলিজাবেথ কমনওয়েলথের প্রধান ও সাতটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশের রেজিমেন্টের প্রধান হন।
* ১৯৪৭ সালের ২০ নভেম্বর গ্রিক ও ডেনমার্কের প্রাক্তন রাজপুত্র ডিউক অফ এডিনবরা ফিলিপকে বিয়ে করেন এলিজাবেথ।
* ১৯৯৭ সালে তাঁর প্রাক্তন পুত্রবধূ ডায়ানা ও প্রিন্সেস অফ ওয়েলসের মৃত্যু।
* ২০২২ সালে দেশজুড়ে তার রাজ্যাভিষেকের ৭০ বছর পূর্তি উদযাপন করা হয়।
* রানি এলিজাবেথই সবচেয়ে দীর্ঘজীবী এবং দীর্ঘকাল শাসনকারী ব্রিটিশ শাসক
* রানি এলিজাবেথ বিশ্বের ইতিহাসের দীর্ঘতম শাসনকারী নারী রাষ্ট্রপ্রধান।
ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় সিংহাসন অলংকৃত করে রেখেছিলেন তিনি। মাস কয়েক আগেই তার সিংহাসনে আরোহণের ৭০ বছর উদযাপন করা হয়েছিল। ১৯৫২ সালে ব্রিটিশ সিংহাসনে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের অভিষেক ঘটে। অভিষেক অনুষ্ঠান হয়েছিল ১৯৫৩ সালে।

২০০৪ সালের ১১ এপ্রিল ইস্টারের পরবের সময় উইন্ডসর ক্যাসেলে ঘোড়ার পিঠে রানি এলিজাবেথ, তার মেয়ে প্রিন্সেস অ্যান এবং তার নাতনি জারা ফিলিপস। ছবি: সংগৃহীত
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ব্রিটেনের ইতিহাসে অন্য যে কোনো শাসকের চেয়ে দীর্ঘদিন ধরে সিংহাসনে আসীন ছিলেন। সারাবিশ্বে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে যারা শাসনকাজ পরিচালনা করেছেন তাদের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তার সিংহাসনে আরোহনের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চলতি বছরের জুনে চার দিনের বিশাল আয়োজন করে রাজ পরিবার।
তার আগে কোনো ব্রিটিশ শাসকেরই টানা সাত দশক সিংহাসনে আসীন থাকার ইতিহাস নেই। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্ম ২১ এপ্রিল ১৯২৬ সালে। ১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মাত্র ২৫ বছর বয়সে ব্রিটেনের সিংহাসনে বসেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ।

১৯৯৬ সালের ৯ জুলাই ব্রিটেন সফররত নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে বাকিংহাম প্যালেসে রানি এলিজাবেথ। সংগৃহীত ছবি।
এলিজাবেথের বাবা ষষ্ঠ জর্জ ১৯৩৭ সালে ব্রিটেনের রাজা হন। এলিজাবেথ ছিলেন তখন ব্রিটিশ সিংহাসনের একমাত্র উত্তরাধিকারী। ষোল বছর বয়সে তিনি প্রথম জনসম্মুখে আসেন। আঠার বছর বয়সে সামরিক বাহিনীতে প্রশিক্ষণের জন্য যোগদান করেন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ব্রিটিশ রাজা ষষ্ঠ জর্জ মৃত্যুর পর এলিজাবেথ সিংহাসনে বসেন।
এরপর ১৯৪৭ সালের ২০ নভেম্বর যুবরাজ ফিলিপের সঙ্গে বিয়ে হয়। তবে দ্য টেলিগ্রাফের মতে, ফিলিপের সঙ্গে এলিজাবেথের প্রথম বাগদান সম্পন্ন হয় ১৯৪৬ সালে। যদিও ১৯৪৭ সালের পহেলা এপ্রিল এলিজাবেথ ২১ বছরে পদার্পণের পর সেটি স্বীকৃতি পায়।

১৯৬১ সালের ৫ জুন বাকিংহাম প্যালেসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি এবং ফার্স্ট লেডি জ্যাকুলিন কেনেডির সাথে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও প্রিন্স ফিলিপ। ছবি: সংগৃহীত।
গত বুধবার এক ভার্চুয়াল বৈঠক শেষে বেরিয়ে যাওয়ার পর রানি এলিজাবেথকে বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। এরপরই তার স্বাস্থ্য নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে উদ্বেগ। কয়েক মাস আগেই তার সিংহাসনে আরোহনের ৭০ বছর উদযাপন করেছে ব্রিটেন।
বেশ কিছুদিন থেকেই তিনি স্কটল্যান্ডের বালমোরাল প্রাসাদে ছিলেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে কয়েক মাস ধরেই জনসম্মুখে আসা কমিয়ে দিয়েছিলেন রানি। বালমোরাল প্রাসাদেই তাকে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছিল। সেখানেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ।
ডায়ানা ও এলিজাবেথ
রানির কাছে শেষ পর্যন্ত তিনি ছিলেন ‘সেই ত্যাড়া মেয়ে।’ ডায়ানা অবশ্য বলতেন, তার শাশুড়িকে তিনি ‘দারুণ শ্রদ্ধা’ করেন এবং তার জন্য সব কিছু করতে রাজি আছেন।
কিন্তু মনে হয় না রানি তেমনটা অনুভব করতেন, কারণ রানি দেখেছিলেন ডায়ানা তার জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর রাজতন্ত্রের উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলেছিলেন।
রাজ পরিবারের বাইরে থেকে এসে রাজ পরিবারের কাউকে বিয়ে করা একটা সাহসী পদক্ষেপ- এমনকি ডায়ানার মতো একজনের পক্ষেও যিনি রাজ পরিবারের ধারা সম্পর্কে অতি পরিচিত ছিলেন।
এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম হয়েছিল ডায়ানার, ছোটবেলায় তার বছর কয়েক কেটেছিল পার্ক হাউস নামে এক বাড়িতে যেটি ছিল রানির অন্যতম একটি আবাস স্যান্ড্রিংহামের ঢিল-ছোঁড়া দূরত্বে।
রানি নিঃসন্দেহে মনে করতেন, এ মেয়েটির রাজ পরিবারে প্রিন্সেস হবার সবরকম যোগ্যতা আছে।
তবে খুব শিগগিরি এটা বেশ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে আবেগপ্রবণ উঠতি বয়সের তরুণী ডায়ানা প্রাসাদের কঠোর মধ্যযুগীয় নিয়মনীতি নির্ভর জীবনের জন্য তখনো তৈরি ছিলেন না।
এ ব্যাপারে তার ভাবী স্বামীর সাহায্যও তিনি পাননি। চার্লসের রাশভারী চরিত্র ছিল ডায়ানার উচ্ছ্বল ও বর্হিমুখী চরিত্রের বিপরীত। এছাড়াও চার্লসের মনেপ্রাণে তখনো ছায়া ফেলে রেখেছিলেন তার সাবেক প্রেমিকা ক্যামিলা পার্কার-বোলস্।
চার্লস ও ডায়ানার বাগদানের পর এক টিভি সাংবাদিক যখন চার্লসকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি কি ডায়ানার প্রেমাসক্ত- তখন চার্লসের দায়সারা গোছের জবাব, ‘ওই প্রেম বলতে যা বোঝায় আর কী’- সেটাই ওই দম্পতির সম্পর্ক কেমন হতে যাচ্ছে সে বিষয়ে একটা ইঙ্গিত দিয়েছিল।
রানি তার ছেলেমেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে খুব কমই নাক গলানোর নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন।
মুডের সমস্যা
অনেক ভাষ্যকার বলেছেন রানির আসলে উচিত ছিল রাজ পরিবারে নতুন সদস্য যারা আসছেন, তাদের পরিবারের রীতিনীতি সম্পর্কে পরামর্শ ও নির্দেশ দেয়া।
ডায়ানা রাজ পরিবারের এসে অসহায় ও বিচ্ছিন্ন বোধ করতেন- বুঝতে পারতেন না তার কাছে প্রত্যাশা কী-এবং ভালো কিছু করলে কখনও প্রশংসা না পেয়ে হতাশ বোধ করতেন।
প্রিন্স চার্লসের মত রানিও প্রিন্সেস ডায়ানার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে অস্বস্তি বোধ করতেন- বুঝতে পারতেন না কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। রানির বড় হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। তার সময়ে মনের ভাব বা অনুভূতি প্রকাশ করার চল ছিল না।
ডায়ানার মেজাজ-মর্জি এবং নজর কাড়ার জন্য তার নেয়া নাটকীয় কিছু পদক্ষেপ তারা কিভাবে সামলাবেন আসলে সেটা তারা বুঝতে পারতেন না।
অনেকে মনে করতেন জনমত কীভাবে নিজের দিকে টানতে হয়, সে ব্যাপারটা ডায়ানা ভালো বুঝতেন এবং তা ব্যবহারও করতেন। রাজ পরিবার এব্যাপারেও অদক্ষ ছিল।
রানি দেখলেন ডায়ানা এবং চার্লসের বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। অথচ এই বিয়ে থেকে অনেক কিছু আশা করেছিলেন তিনি।
তিনি পাশ থেকে শুধু শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিলেন এক্ষেত্রে তার ছেলের ব্যর্থতা এবং পরিণামে এই বিয়ের ব্যর্থতা রাজতন্ত্রের ভবিষ্যতের উপর একটা বড়ধরনের আঘাত হয়ে আসবে।
শেষ চেষ্টা
চার্লস আর ডায়ানার মধ্যে সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটার পর রানি ছেলের বিবাহিত জীবনে নাক না-গলানোর যে নীতি মেনে চলছিলেন তার থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দুজনকে কথা বলতে ডেকে পাঠান এবং তাদের অনুরোধ করেন এই বিয়ে টিঁকিয়ে রাখতে তারা যেন শেষবারের মতো চেষ্টা করেন।
কিন্তু তাতে কোনো ফল হল না। ডায়ানা বিবিসির প্যানোরামা অনুষ্ঠানে এক সাক্ষাৎকারে তার কাহিনি বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর রানি আবার এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিলেন।
তিনি দুজনকেই আলাদা করে চিঠি লিখে বললেন, তাদের সামনে এখন একটাই পথ খোলা আছে- বিবাহবিচ্ছেদ।
নাতিদের কথা মাথায় রেখে রানি ডায়ানার সঙ্গে ভাল সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু তাদের ডিভোর্সের পর রানি ও ডায়ানার সম্পর্কে আরও অনেক দূরত্ব তৈরি হয়।
ডায়ানার মৃত্যুর পর রানির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি জনগণের মনমানসিকতা বুঝতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। রানি তখন তার শোকাহত দুই নাতিকে সান্ত্বনা দিতে ছিলেন বালমোরাল প্রাসাদে।
এই ঘটনার পর বহু সংবাদপত্রে ডায়ানার মৃত্যুতে রানির প্রতিক্রিয়ার প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণ নাটকীয় নানা শিরোনাম আসায় আর জনমতেও এর প্রতিফলন ক্রমশ বাড়তে থাকায় তিনি লন্ডনে ফিরে আসতে বাধ্য হন।
ডায়ানার শেষকৃত্যের আগের দিন রানি নজিরবিহীন এক টেলিভিশন ভাষণ দেন, যাতে তিনি তার পুত্রবধূ সম্পর্ক খোলামেলা কথা বলেন।
তার সেই সম্প্রচার ছিল যুগান্তকারী। এতে রানি, রাজকুমারী ডায়ানার আবেগ এবং সমাজে তার অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
বলা হয়, রানি তার এই ভাষণের মধ্যে দিয়ে রাজতন্ত্রকে একটা বিপর্যয়ের দোরগোড়া থেকে উদ্ধার করেছিলেন।
রাজকুমারী ডায়ানার লাশ নিয়ে কফিন বাকিংহাম প্রাসাদের ফটক অতিক্রম করার সময় রানি তার পুত্রবধূকে শেষ বিদায় জানিয়েছিলেন।
যে তরুণ রাজকুমারী এত লাখ লাখ মানুষের ভালোবাসা আর সম্মানে সিক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু শাশুড়ির কাছে থেকে গিয়েছিলেন একটা হেঁয়ালি হয়ে, সেই নারীর শেষ বিদায়ে মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন রানি এলিজাবেথ।
রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের বিশেষ ক্ষমতাগুলো
ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের জীবনটা ঠিক কেমন? একজন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার ভূমিকা প্রায় পুরোটাই আনুষ্ঠানিক এবং তার থাকা অনেক ‘বিশেষ ক্ষমতা’-ও এখন ধীরে ধীরে মন্ত্রী পরিষদের হাতে চলে যাচ্ছে, তারপরও যখন ব্রিটিশ সরকার যখন কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করে, বা কোনো চুক্তি সই করে, তার কর্তাব্যক্তিত্ব সেখানে অবশ্যই থাকতে হয়।
আর এগুলো ছাড়াও তার রয়েছে বিভিন্ন অদ্ভুত অদ্ভুত ক্ষমতা, যেগুলো হয়তো পৃথিবীর আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানেরই নেই৷ এগুলোর কোনোটা হয়তো আপনাকে বিস্মিত করবে, কোনোটা হাসাবে, কিন্তু কোনোটাই সাধারণ বলে উড়িয়ে দিতে পারবেন না আপনি। তো চলুন দেখে নেয়া যাক ব্রিটেনের রানীর অদ্ভুত কিছু ক্ষমতা।
১। ব্রিটেনের সবগুলো ডলফিনের মালিকানা তার
১৩২৪ খ্রিস্টাব্দে রাজা দ্বিতীয় এডওয়ার্ডের রাজত্বকালে এমন একটি বিধান গ্রহণ করা হয়, যেখানে বলা হয়- ব্রিটেনের রাজতন্ত্রের প্রধান দেশের সব স্টার্জন (একপ্রকার মাছ), তিমি এবং ডলফিনগুলোর মালিক। অদ্ভুত এই আইনটি এখনো বেশ ভালোভাবেই বহাল। যুক্তরাজ্যের সমুদ্রধারের তিন মাইলের মধ্যে যদি কোনো ডলফিন বা তিমি ধরা পড়ে, সেগুলোকে গ্রহণ করার জন্য রানীকে অনুরোধ করা হয়- এমনটাই বলা আছে টাইম ম্যাগাজিনের একটি আর্টিকেলে।
২। টেমস নদীর সবগুলো রাজহাঁসও রানীর মালিকানাধীন
রয়েল ফ্যামিলির অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ব্রিটেনের জলাশয়ের সব রাজহাঁসই প্রকৃতপক্ষে রানীর মালিকানাধীন, কিন্তু রানী তিনি এই ক্ষমতা শুধুমাত্র টেমস ও তার শাখানদীগুলোর ক্ষেত্রেই খাটান।
প্রতি বছর ব্রিটেনে একটি রাজহাঁসদের নিয়ে একটি রাজকীয় অনুষ্ঠানও হয়, যেখানে টেমস নদীর সব রাজহাঁসকে ধরে তাদের রাজকীয় রাজহাঁস হিসেবে চিহ্নিত করে আবার ছেড়ে দেয়া হয়। অনুষ্ঠানটির নাম ‘সোয়ান আপিং।’
৩। রানী গাড়ি চালাতে পারেন কোনো লাইসেন্স ছাড়াই
ব্রিটেনের জনসাধারণের ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করতে হয় তাদের রানীর নামেই, কিন্তু সমগ্র ব্রিটেনে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যার গাড়ি চালাতে কোনো লাইসেন্স বা নাম্বারপ্লেটের প্রয়োজন হয় না।
তবে লাইসেন্স না থাকলেও গাড়িটা রানী বেশ ভালোই চালাতে পারেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি একটি ফার্স্ট-এইড ট্রাক চালিয়েছিলেন উইমেন্স অক্সিলিয়ারি টেরিটরিয়াল সার্ভিসের জন্য। উইমেন্স অক্সিলিয়ারি টেরিটরিয়াল সার্ভিস তখন ছিল ইংল্যান্ডের নারীদের জন্য পৃথক সেনাবাহিনীর স্বরূপ। হ্যাঁ, এই সেনাবাহিনীর অংশ হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল রানী এলিজাবেথের।
৪। রানীর প্রয়োজন হয় না কোনো পাসপোর্টেরও
ব্রিটেনের রাজপরিবারের সবারই পাসপোর্টের প্রয়োজন হয়, একমাত্র রানী ব্যতীত। পাসপোর্ট ছাড়াই রানী ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিশ্বের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে, আর যতই বয়স বাড়ছে তার ঘুরে বেড়ানোও বাড়ছে সমান তালেই।
৫। রানীর রয়েছেন একজন ব্যক্তিগত কবি
ব্যক্তিগত অনেক কর্মচারীই থাকে বড় পদের মানুষদের। থাকে সেক্রেটারি, অ্যাসিস্ট্যান্ট কিংবা ড্রাইভার। কিন্তু ব্যক্তিগত কবি? তা বোধহয় শুধু ব্রিটেনের রানীরই আছে।
ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের অফিসিয়াল সাইট থেকে জানা যায়, রানী একজন কবিকে মনোনয়ন দিতে পারেন তার ব্যক্তিগত কবি বা পোয়েট লরিয়েট হিসেবে। সেই কবি হবেন এমন একজন কবি, যার কাজের রয়েছে জাতীয় তাৎপর্য। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে এই কবির সম্মানী দেয়া হয় একটি বিশেষ ধরনের ওয়াইন দিয়ে
বর্তমানে ক্যারল অ্যান ডাফি আছেন এই পদে এবং আগামী বছর পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল থাকবেন।
৬। রানী কর দিতে বাধ্য নন
ব্রিটেনের কোনো আইনে রানীর কর দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু ১৯৯২ সাল থেকে রানী স্বেচ্ছায়ই আয়কর এবং মূলধনী কর দিয়ে আসছেন।
৭। রানী সম্পূর্ণ অস্ট্রেলিয়ার সরকারকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা রাখেন
অস্ট্রেলিয়ার আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ স্বয়ং। এই পদের কারণে অস্ট্রেলিয়ার সরকারের উপর রানীর বেশ কিছু ক্ষমতা আছে। যেমন ১৯৭৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় রানীর প্রতিনিধি গভর্নর জেনারেল স্যার জন কের তৎকালীন অস্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রীকে বহিষ্কার করে দিয়েছিলেন। ৩ ঘণ্টার মধ্যে কের সম্পূর্ণ সরকারকেই বন্ধ করে দেন। নতুন করে নির্বাচন হয়ে নতুন সরকার গঠিত হয়ে এরপর। তৎকালীন সরকার অর্থনৈতিকভাবে ধসে পড়ছিল বলে এমনটা করা হয়েছিল তখন।
যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও রানী আরো ১৪টি রাষ্ট্রের প্রধান। কানাডা, জ্যামাইকা, নিউজিল্যান্ড, পাপুয়া নিউ গিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। এই সবগুলা রাষ্ট্রকে বলা হয় কমনওয়েলথ রাষ্ট্র। উল্লেখ্য যে, ৫৩টি সদস্য দেশ দ্বারা তৈরি সংগঠন ‘কমনওয়েলথ অফ নেশনস’ এবং এই কমনওয়েলথ রাষ্ট্র এক নয়। কমনওয়েলথ রাষ্ট্র শুধু ব্রিটেনের রাজতন্ত্রের অধীনে থাকা রাষ্ট্রগুলোকেই বলা হয়।
৮। রানী একটি ধর্মের প্রধান ধর্মগুরু
ষোড়শ দশকে রাজা সপ্তম হেনরি রোমান ক্যাথলিক চার্চ থেকে ব্রিটেনকে পৃথক করে ফেলেন এবং ‘চার্চ অব ইংল্যান্ড’ হয় ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় ধর্ম। বর্তমানে সেই চার্চ অব ইংল্যান্ডের প্রধান হচ্ছেন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, এবং তিনি চার্চের জন্য বিশপ এবং আর্চবিশপদের মনোনয়নও দিয়ে থাকেন।
এই নিয়মটির অবশ্য খুব মজার একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। এই নিয়মের কারণে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের যেকোনো প্রধানকেই অবশ্যই চার্চ অব ইংল্যান্ডের অনুসারী হতে হয়। অন্য কোনো ধর্মের মানুষ ব্রিটেনের রানী বা রাজা হতে পারবেন না, এমনকি ক্যাথলিক হলেও না। যেমন প্রিন্স চার্লস এখন যদি ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়ে যান, রানী এলিজাবেথের উত্তরসূরী তিনি আর হতে পারবেন না।
৯। তাকে আদালতে অভিযুক্ত করার ক্ষমতা কারো নেই
যেহেতু যেকোনো ব্রিটেনের আদালতের বিচারকার্য রানীর নামেই সম্পন্ন করা হয়, রানীকে অভিযুক্ত করা বা সাক্ষী দিতে বাধ্য করার ক্ষমতা কারো নেই।
তাত্ত্বিকভাবে, রাজতন্ত্রের প্রধানের পক্ষে কোনো অপরাধ করা সম্ভব নয়, বিজনেস ইনসাইডারকে দেয়া এক ইন্টারভিউতে বলেছেন ব্রিটেনের আইনের পণ্ডিত জন কার্কহোপ। তবে এই ক্ষমতা সম্পর্কে ২০০২ সালে ব্যারিস্টার হেলেনা কেনেডি বিবিসিকে বলেছিলেন, “রানীর এই ক্ষমতা অবশ্যই প্রশ্নের উর্ধ্বে নয়।”
১০। যেকোনো আইন পার্লামেন্টে গৃহীত হতে রানীর সম্মতি অত্যাবশ্যক
যেকোনো বিলকে পরিপূর্ণ আইনে পরিণত করতে অবশ্যই রানীর সম্মতি থাকতে হয়। একটি প্রস্তাবিত আইন ব্রিটেনের দু’টি পার্লামেন্টেই পাস হবার পর তার পরবর্তী গন্তব্য হয় রাজপ্রাসাদে। সেখানে অনুমোদন পেলেই তা আইন হিসেবে গৃহীত হয়। ব্যাপারটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘রয়েল অ্যাসেন্ট’ বা রাজকীয় সম্মতি। তবে এই রয়েল অ্যাসেন্ট দিতে সাধারণত কোনো রাজা-রানীই কার্পণ্য করেন না। সর্বশেষ রয়েল অ্যাসেন্ট দিতে অপারগতা প্রকাশের উদাহরণ পাওয়া যায় ১৭০৮ সালে, তখন ক্ষমতায় ছিলেন রানী অ্যান।
এই ‘রয়েল অ্যাসেন্ট’ ছাড়াও রানীর আরেকটি সম্মতি দেবার জায়গা আছে, তার নাম ‘কুইন্স কনসেন্ট।’ কোনো আইন যদি ব্রিটেনের রাজতন্ত্রকে কোনোভাবে প্রভাবিত করে, তবে সেই আইন পার্লামেন্টে বিল হিসেবে তোলার আগেই রানীর সম্মতি নিতে হয়। এখনো পর্যন্ত এই নিয়মটির প্রয়োগ হয়েছে ৩৯ বার।
এছাড়াও রানীর রয়েছে আরো বিভিন্ন অদ্ভুত অদ্ভুত ক্ষমতা। আর এসব ক্ষমতাগুলোই তার ব্যক্তিত্বকে দিয়েছে স্বকীয় এক রাজকীয়তা, যার কারণে সমগ্র পৃথিবী তাকে দেখে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে।
সূত্র : জি নিউজ, বিবিসি