ঢাকা ০৯:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মিয়ানমারের ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা জারি, ২০ বছরে এই ধরনের তীব্র ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটেনি

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:০৪:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ মার্চ ২০২৫
  • ১৭২ Time View

শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর মিয়ানমারের ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা জারি করেছে দেশটির সামরিক জান্তা সরকার।

সাগাইং, মান্দালাই, ম্যাগওয়ে, বাগো, ইস্টার শান রাজ্য এবং নেপিডো অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে যে, কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতির তদন্ত করবেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধারকাজ সমন্বয় শুরু করবেন।

উল্লেখ্য, আজ শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে মিয়ানমারে। এর কেন্দ্রস্থল ছিল দেশটির উত্তর-পশ্চিমের শহর সাগাইং থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে। এলাকাটি রাজধানী নেপিডো থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ২০ বছরে মিয়ানমারে এই ধরনের তীব্র ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটেনি। রাজধানী ও অন্যান্য স্থানে একাধিক দফায় কম্পন অনুভূত হয়েছে এবং আফটার শক বা পরাঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭.৭। এটি মিয়ানমারের মান্দালয় এলাকায় ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তি ঘটে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ভূমিকম্পের মাত্রা ৭.৩ বলে জানিয়েছে, তবে এটি একটি বড় মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ঢাকা থেকে মান্দালয়ের দূরত্ব ৫৯৭ কিলোমিটার, এবং ভূমিকম্পের প্রভাব বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অনুভূত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার জানান, মিয়ানমারের সেন্ট্রাল বেসিনে ‘সাগাইং ফল্ট’ নামে একটি ফল্ট লাইন রয়েছে, যেখানে এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এই এলাকা ভূমিকম্পপ্রবণ, এবং এখানকার ফল্ট লাইন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভূমিকম্পের প্রভাব ফেলতে পারে।

এলাকাটি ‘ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোনে’ অবস্থিত, যেখানে দুটি টেকটোনিক প্লেট সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং একটি প্লেট অন্যটির নিচে চলে যায়। এই সাবডাকশন জোনের বিস্তৃতি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায়ও রয়েছে, যা ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।

অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার আরও বলেন, গত ২০ বছরে এই ধরনের ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প মিয়ানমারে ঘটেনি, তাই এবারের ভূমিকম্পটি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল এবং এর প্রভাব বিস্তীর্ণ এলাকায় পড়েছে। প্রথমে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর, উৎপত্তিস্থল থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ৬.৪ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়েছে, যা আফটার শক হতে পারে। তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে আরও কিছু পরাঘাত হতে পারে।

ভূতাত্ত্বিকভাবে, বাংলাদেশসহ ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকা এবং হিমালয়ের পাদদেশের এলাকা ভূমিকম্পপ্রবণ। এই অঞ্চলে ভূমিকম্পের সংখ্যা বাড়ছে এবং এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ২৮টি ভূমিকম্প হয়, ২০২৩ সালে যার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১-এ, এবং গত বছর তা ৫৪-এ পৌঁছেছে।

এরপর আরও বেশ কয়েকটি আফটার শক অনুভূত হয় আশপাশের অঞ্চলে।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, মিয়ানমারে ভূমিকম্পের তীব্রতায় রাস্তাঘাট ফাটল দেখা গেছে এবং ভবনের টুকরো খসে পড়েছে।

মিয়ানমারের ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা হতাহত এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করার জন্য ইয়াঙ্গুনে অনুসন্ধান শুরু করেছি এবং ঘুরে দেখছি। এখনও পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।’

Tag :

মিয়ানমারের ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা জারি, ২০ বছরে এই ধরনের তীব্র ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটেনি

Update Time : ১২:০৪:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ মার্চ ২০২৫

শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর মিয়ানমারের ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা জারি করেছে দেশটির সামরিক জান্তা সরকার।

সাগাইং, মান্দালাই, ম্যাগওয়ে, বাগো, ইস্টার শান রাজ্য এবং নেপিডো অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

মিয়ানমারের জান্তা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে যে, কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতির তদন্ত করবেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধারকাজ সমন্বয় শুরু করবেন।

উল্লেখ্য, আজ শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে মিয়ানমারে। এর কেন্দ্রস্থল ছিল দেশটির উত্তর-পশ্চিমের শহর সাগাইং থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে। এলাকাটি রাজধানী নেপিডো থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ২০ বছরে মিয়ানমারে এই ধরনের তীব্র ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটেনি। রাজধানী ও অন্যান্য স্থানে একাধিক দফায় কম্পন অনুভূত হয়েছে এবং আফটার শক বা পরাঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭.৭। এটি মিয়ানমারের মান্দালয় এলাকায় ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তি ঘটে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ভূমিকম্পের মাত্রা ৭.৩ বলে জানিয়েছে, তবে এটি একটি বড় মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ঢাকা থেকে মান্দালয়ের দূরত্ব ৫৯৭ কিলোমিটার, এবং ভূমিকম্পের প্রভাব বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অনুভূত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার জানান, মিয়ানমারের সেন্ট্রাল বেসিনে ‘সাগাইং ফল্ট’ নামে একটি ফল্ট লাইন রয়েছে, যেখানে এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এই এলাকা ভূমিকম্পপ্রবণ, এবং এখানকার ফল্ট লাইন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভূমিকম্পের প্রভাব ফেলতে পারে।

এলাকাটি ‘ইন্দো-বার্মা সাবডাকশন জোনে’ অবস্থিত, যেখানে দুটি টেকটোনিক প্লেট সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং একটি প্লেট অন্যটির নিচে চলে যায়। এই সাবডাকশন জোনের বিস্তৃতি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায়ও রয়েছে, যা ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।

অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার আরও বলেন, গত ২০ বছরে এই ধরনের ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প মিয়ানমারে ঘটেনি, তাই এবারের ভূমিকম্পটি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল এবং এর প্রভাব বিস্তীর্ণ এলাকায় পড়েছে। প্রথমে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর, উৎপত্তিস্থল থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ৬.৪ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়েছে, যা আফটার শক হতে পারে। তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে আরও কিছু পরাঘাত হতে পারে।

ভূতাত্ত্বিকভাবে, বাংলাদেশসহ ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকা এবং হিমালয়ের পাদদেশের এলাকা ভূমিকম্পপ্রবণ। এই অঞ্চলে ভূমিকম্পের সংখ্যা বাড়ছে এবং এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ২৮টি ভূমিকম্প হয়, ২০২৩ সালে যার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১-এ, এবং গত বছর তা ৫৪-এ পৌঁছেছে।

এরপর আরও বেশ কয়েকটি আফটার শক অনুভূত হয় আশপাশের অঞ্চলে।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, মিয়ানমারে ভূমিকম্পের তীব্রতায় রাস্তাঘাট ফাটল দেখা গেছে এবং ভবনের টুকরো খসে পড়েছে।

মিয়ানমারের ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা হতাহত এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করার জন্য ইয়াঙ্গুনে অনুসন্ধান শুরু করেছি এবং ঘুরে দেখছি। এখনও পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।’