বর্তমানে করোনা মহামারী কেবল আমাদের দেশেই নয়, সমগ্র বিশ্বে ভয়াবহ ব্যাধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই ব্যাধি সম্পর্কে নির্লিপ্ত থাকার কোনো সুযোগ নেই। ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে চিকিৎসা থেকে মানুষকে বিরত রাখার অপচেষ্টা করা মারাত্মক অপরাধ। অবশ্য এ কথা অনস্বীকার্য, ইসলামী জীবনবিধান তথা কুরআন-সুন্নাহের আলোকে জীবন পরিচালনা করলে মানবদেহে রোগব্যাধি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। যেমন, হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। ইসলামী জীবনবিধান প্রতিপালন করলে, মানুষকে পরিচ্ছন্ন জীবনবিধান পালন করতে হয়। অজু, গোসল, পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করা ইসলামের বিশেষ দিক। বাড়ির তৈজসপত্র ও পরিচ্ছন্ন আহারাদি খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা শরিয়াতের এক বিশেষ দিক।
ইসলামী জ্ঞান না থাকার কারণে অনেকে কুসংস্কারবশত রোগব্যাধি বিপদাপদ থেকে মুক্তিলাভের জন্য মাজারের মাটি খায়, গায়ে মাখে, গাঁজা সেবন করে, ময়লা জামাকাপড় গায়ে রাখে। অথচ ইসলামী জীবনবিধান মানুষকে সর্বাবস্থায় পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করতে নির্দেশ প্রদান করেছে। চলমান করোনা মহামারীর সময়ে একশ্রেণীর মানুষ চিকিৎসাবিধি গ্রহণের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করছে যা খুবই অন্যায়। মহানবী সা: স্বয়ং রোগ ব্যাধির জন্য চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমের রা: বর্ণিত, হজরত উমর রা: সিরিয়া যাত্রা করলেন। তিনি যখন সারগ নামক স্থানে উপস্থিত হলেন, তিনি খবর পেলেন যে, সিরিয়ায় প্লেগ মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। তখন আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা: বললেন, মহানবী বলেছেন, যখন তোমরা শোন যে, কোনো স্থানে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, তবে তোমরা সেখানে যেও না। আবার যখন কোনো স্থানে তা দেখা দেয়, আর তোমরাও সেখানে অবস্থান করতে থাকো, তবে সেখান থেকে বাইরে যেও না (বুখারি)।
হাদিস শরিফে আরো বর্ণিত হয়েছে, হজরত ইবনে আনাস রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কয়েকজন লোক রোগাক্রান্ত ছিল। তারা আরজ করল, হে আল্লাহর রাসূল সা: আমাদের আশ্রয় দিন এবং খাবার দিন। তারা সুস্থ হয়ে বলল, মদিনার আবহাওয়া অনুকূল নয়। তখন নবী করিম সা: তাদের হাররা নামক স্থানে নিজস্ব কয়েকটি উটসহ এই বলে পাঠিয়ে দিলেন, তোমরা এ উটের দুধ পান করতে থাকো। যখন তারা সুস্বাস্থ্যবান হয়ে গেল, তখন তারা নবী করিম সা:-এর উটের রাখালকে হত্যা করল এবং উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে গেল (বুখারি)। এ হাদিসের আলোকে বলা যায় যে, পরিবেশগত বা আবহাওয়াজনিত কারণে প্রয়োজনে অসুস্থ-রোগাক্রান্ত মানুষকে চিকিৎসার জন্য পৃথক করে রাখা শরিয়তবিরোধী নয়। কোনো যুগেই ইসলাম চিকিৎসাবিজ্ঞান ও চিকিৎসাপদ্ধতিকে অবজ্ঞা বা অস্বীকার করেনি। মধ্যযুগে ইবনে সিনা ছিলেন পৃথিবী বিখ্যাত চিকিৎসিক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর লিখিত তার বিখ্যাত বই ‘আল কানুন ফিততিব্ব’ চিকিৎসা বিজ্ঞানের অমূল্য সম্পদ।
অনেক ক্ষেত্রে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার আমাদেরকে শিরক ও বিদয়াতের সাথে সম্পৃক্ত করে ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে অতি ভক্তি আমাদেরকে কুসংস্কার বা বিদয়াতের দিকে ধাবিত করে। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, হজরত মুগীরাহ ইবনে শোবা রা: হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসূল সা:- এর সময়ে যেদিন (তার পুত্র) ইব্রাহিম রা: ইন্তেকাল করলেন সেদিন সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। লোকেরা তখন বলল, ইব্রাহিমের মৃত্যুর জন্যই সূর্যগ্রহণ হয়েছে। তখন রসূল সা: বললেন, কারো মরা-বাঁচার কারণে কখনো সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। তোমরা যখন (গ্রহণ) দেখবে তখন নামাজ পড়বে এবং আল্লাহর শরণ প্রার্থনা করবে (বুখারি)। এ হাদিসের আলোকে আমরা জানতে পারলাম, অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মহানবী সা: সর্বদা তার অনুসারীদের মুক্ত থাকার শিক্ষা প্রদান করেছেন। রোগ জ্বরা ব্যাধি আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়। হজরত আবু হুরাইরা রা: থেকে বর্ণিত মহানবী সা: বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার ওষুধ সৃষ্টি করেননি (বুখারি)। সে কারণে বলা যায়, রোগের চিকিৎসার জন্য ওষুধ সেবন করা সুন্নাত। এ বিষয়ে কোনো কুসংস্কারের আশ্রয় গ্রহণ করে চিকিৎসা থেকে বিরত থাকা অথবা ধর্মের দোহাই দিয়ে অন্যকে বিরত রাখার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। অবশ্য বিপদাপদে সর্বাবস্থায় ধৈর্য ধারণ করা ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা সবার কর্তব্য। পবিত্র কালামে পাকে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘মৌমাছির উদর বা পেট থেকে নির্গত হয় বিবিধ বর্ণের পানীয়, এতে মানুষের জন্য আরোগ্য আছে, নিশ্চয় এতে জ্ঞানী জাতিদের জন্য নিদর্শন রয়েছে’ (সূরা নাহল আয়াত নং-৬৯)।
রাসূল সা:- চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে দেহ থেকে অতিরিক্ত রক্ত বা দূষিত রক্ত ঝেড়ে ফেলার জন্য দেহের বিশেষ অঙ্গে শিঙ্গা লাগিয়ে রক্ত ক্ষরণ করিয়েছেন। তিনি তার সহচরবৃন্দকে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন ওষুধের ব্যবস্থা করেছেন। হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা: থেকে বর্ণিত, একদা এক ব্যক্তি নবী করিম সা:-এর কাছে আগমন করে বলল, আমার ভ্রাতার পেটে অসুখ করেছে। নবী করিম সা: বললেন, তাকে মধু পান করাও। সে পুনরায় এলো (এবং একই কথা বলল)। এবারো তিনি বললেন, তাকে মধু পান করাও। লোকটি তৃতীয়বার আগমন করল (এবং একই কথা বলল)। এবারো তিনি বললেন, তাকে মধু পান করাও। এর পরে লোকটি পুনরায় এলো এবং বলল, (আপনি যা বলেছেন, তদনুযায়ী) কাজ করেছি। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কালাম সত্য; কিন্তু তোমার ভাইয়ের পেট সত্য নয়। (আবার যাও) তাকে মধু পান করাও। অতঃপর লোকটি গিয়ে তাকে মধু পান করাল এবং সে ভালো হয়ে গেল (বুখারি)। এ হাদিস শরিফের মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম, মহানবী সা: তার রোগাক্রান্ত সহচরদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন করার জন্য শুধু অনুমতি নয়, নির্দেশ প্রদান করেছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইসলামের বিশেষ অবদান রয়েছে। কোনো যুগেই ইসলাম চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পদ্ধতিকে অবজ্ঞা করেনি। আমরা জানি, কেবল মুসলিম বিশ্বেই নয়, সমগ্র পৃথিবীতে ইবনে খালদুন বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী হিসেবে খ্যাত। তার রচিত ‘আল কানুন ফিততিব্ব’ নামক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপরে রচিত বইটি সমগ্র পৃথিবীতে সমাদৃত।
বর্তমান করোনাকালীন পরিস্থিতিতে চিকিৎসাক্ষেত্রে যে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে, তা জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করে সমাধান করা সবার নৈতিক দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে কুসংস্কার বা পশ্চাৎপদ চিন্তার কোনো অবকাশ নেই। সূত্র: নয়া দিগন্ত
অনলাইন ডেস্ক 


















