মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা যখন আবারও চরমে উঠেছে তখন ইরান হঠাৎ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে সতর্ক করেছে যে এই পথ দিয়ে কোনও জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলেই সেটিতে হামলা করা হবে। ইরানের নৌবাহিনী এই হুঁশিয়ারি দিয়েছে। যুদ্ধবিরতির মাঝেই তেহরানের এই অবস্থান পাল্টে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে এবং এই সমুদ্রপথ দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা যেকোনও জাহাজকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হবে বলে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নৌবাহিনী জানিয়েছে। প্রণালিটি পুনরায় খোলার ঘোষণা দেয়ার ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে এই অবস্থান বদলানো হলো।
ইরানের স্টুডেন্ট নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে শনিবার আইআরজিসি নৌবাহিনী জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজ ও বন্দরের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত প্রণালি বন্ধ থাকবে। তাদের মতে, এই অবরোধ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে অবস্থানরত কোনও জাহাজ যেন নোঙর না ওঠায়। হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়া শত্রুর সঙ্গে সহযোগিতা হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।’
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং ওয়াশিংটন-তেহরান আলোচনার অন্যতম জ্যেষ্ঠ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে’। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে আমেরিকা অবরোধের ঘোষণা দিচ্ছে। এটি একটি অপরিণামদর্শী ও অজ্ঞতাপূর্ণ সিদ্ধান্ত।’
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরান সাময়িকভাবে প্রণালিটি খুলে দিয়েছিল। ইসরায়েল-লেবানন ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তেহরান। গত শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছিলেন, সমুদ্রপথটি ‘সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য পুরোপুরি খোলা’। এর পর বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম কমে যায় এবং এক ডজনের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ প্রণালি দিয়ে পার হয়। তবে এরপরই আইআরজিসি আবার অবস্থান বদলায়।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, শনিবার ইরানি গানবোট দুটি বাণিজ্যিক জাহাজের দিকে গুলি ছুড়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে দুটি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ ‘গুলিবর্ষণের’ মুখে পড়েছে। এছাড়া ওই অঞ্চলের কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ আইআরজিসি নৌবাহিনীর কাছ থেকে রেডিও বার্তা পেয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে, কোনও জাহাজকে প্রণালি দিয়ে যেতে দেয়া হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে তেহরান ওয়াশিংটনকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করতে পারবে না। তিনি সতর্ক করেন, আগামী বুধবারের মধ্যে কোনও চুক্তি না হলে যুদ্ধবিরতি বাতিল করা হবে। তিনি আরও বলেন, মার্কিন নৌ অবরোধ ‘পূর্ণ শক্তিতে বহাল থাকবে’।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, ইরানের নৌবাহিনী তাদের শত্রুদের ওপর ‘নতুন তিক্ত পরাজয়’ চাপিয়ে দিতে প্রস্তুত।
আল জাজিরার প্রতিবেদক জেইন বাসরাভি বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আবারও আগের অবস্থানে ফিরে গেছে। তিনি বলেন, ‘২৪ ঘণ্টা আগেও বিশ্বনেতারা এটিকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছিলেন। ধারণা করা হচ্ছিল, ইরান আস্থা তৈরির পদক্ষেপ হিসেবে প্রণালি খুলেছে, যা হয়তো যুদ্ধবিরতি চুক্তির দিকে নিয়ে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদিও এটি হতাশাজনক, তবু খুব অপ্রত্যাশিত নয়। এখন পরিস্থিতি আবার শূন্যে ফিরে গেছে’ এবং বর্তমানে ‘দুটি পাল্টাপাল্টি অবরোধ’ চলছে।
তেহরান থেকে আল জাজিরার আলি হাশেম জানান, ইরান হরমুজ প্রণালিকে বার্তা দেয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, ‘ইরান এমন এক পরিস্থিতিতে রয়েছে, যেখানে তারা নিশ্চিত নয় সামনে কী আছে। তাই হরমুজ প্রণালি এখনও একমাত্র ক্ষেত্র, যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বার্তা দিচ্ছে এবং নিজেদের প্রভাব দেখাচ্ছে, যদিও সেটি নেতিবাচকভাবেই করছে তারা।’
আন্তজার্তিক ডেস্ক 









