ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস, আজ ৭ জুন। ১৯৬৬ সালের এ দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ছয় দফা দাবির পক্ষে দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলনের সূচনা হয়। ওইদিন আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে টঙ্গী, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে তৎকালীন পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে মনু মিয়া, শফিক ও শামসুল হকসহ ১১ জন বাঙালি শহীদ হন। এরপর থেকেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আপসহীন সংগ্রামের ধারায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের দিকে এগিয়ে যায় পরাধীন বাঙালি জাতি।
প্রতিবছর বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়ে এলেও বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসে সৃষ্ট সংকটের কারণে এ বছর ঐতিহাসিক এই দিনটিতে ব্যাপক জনসমাগম এড়িয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে দিবসটির কর্মসূচি পালন করবে আওয়ামী লীগ। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ সূর্যোদয়ের ক্ষণে বঙ্গবন্ধু ভবন, কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন। এছাড়া সকাল ৯টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হবে।
ঐতিহাসিক ৬ দফাকে বাঙালির জাতির ম্যাগনা কার্টা বা মুক্তির সনদ হিসেবে দেখেন এ প্রজন্মের আওয়ামী লীগ নেতারা। ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবসকে কীভাবে দেখেন জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনে ৬ জন নেতা বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফার মাধ্যমে মূলত এক দফা স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে বাঙালি জাতিকে সংগঠিত করে ছিলেন। এই ৬ দফাকে কেন্দ্র করে এক পর্যায়ে বাঙালি জাতির স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন জোরদার হয়। পরবর্তীতে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির অভু্্যদয় ঘটে।
এই ছয় নেতা হচ্ছেন, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন, কৃষকলীগের সভাপতি কৃষিবিদ সমীর চন্দ, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক বাবু আফজালুর রহমান, জাতীয় শ্রমিকলীগের সাধারণ সম্পাদক আযম খসরু ও যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আখতার।
১৯৬৬ সালের এই দিনে ৬ দফা দাবির পক্ষে দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলনের সূচনা হয়। এই দিনে আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে টঙ্গী, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জে পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে মনুমিয়া, শফিক, শামসুল হক, মুজিবুল হকসহ মোট ১১ জন বাঙালি শহীদ হন।
এর আগে ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে “৬ দফা দাবি” পেশ করেন। এ দাবি সেখানে গৃহীত না হলে নিজেই ৬ ফেব্রুয়ারি এই সম্মেলন বর্জন করেন তিনি। ১৯৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ছয় দফা প্রস্তাব এবং দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের কর্মসূচি সংগৃহীত হয়।
বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা। ১৯৬৬ সালে ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে তৎকালীন পাকিস্তানের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলন হয়। সেখানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বঙ্গবন্ধু যোগদান করে ছয় দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু প্রস্তাব গৃহীত না হলে বঙ্গবন্ধু সেই সম্মেলন বয়কট করে চলে আসেন। ১১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন তেজগাঁও বিমানবন্দরে ৬দফা সংক্ষিপ্তভাবে ব্যাখ্যা করেন বঙ্গবন্ধু।
২০ফেব্রুয়ারি বত্রিশ নম্বর বাড়িতে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে ৬দফা উত্থাপন করা হয়। আওয়ামী লীগের সকল নেতা এতে একমত পোষণ করেন। এই বৈঠকে ৬ দফা প্রস্তাব পাস হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু চলে যান চট্টগ্রামে। লালদীঘির ময়দানে এক জনসভায় ছয় দফার পটভূমিকা ব্যাখ্যা বাঙালি জাতির জন্য ছয় দফার অপরিহার্যতা তুলে ধরেন। তার পর তিনি ওই অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় জনসভা করে ৬ দফার পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। ১৮ মার্চের আওয়ামী লীগের সম্মেলনেও একই আহ্বান জানান তিনি। সেই আহ্বানের কারণে ৮ বার জেলে যেতে হয়ে ছিল তাঁকে।
ছয় দফা দাবি আদায় প্রসঙ্গে ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগ কর্মীরা যথেষ্ট নির্যাতন ভোগ করেছে। ছয় দফা দাবি যখন তারা দেশের কাছে পেশ করেছে তখনই প্রস্তুত হয়ে গিয়াছে যে তাদের দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হবে। এটা ক্ষমতা দখলের সংগ্রাম নয়, জনগণকে শোষণের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য সংগ্রাম।’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘আমার বিশ্বাস আছে আওয়ামী লীগের ও ছাত্রলীগের নিঃস্বার্থ কর্মীরা, তাদের সঙ্গে আছে। কিছু সংখ্যক শ্রমিক নেতারা যারা সত্যই শ্রমিকদের জন্য আন্দোলন করে- তারাও নিশ্চয়ই সক্রিয় সমর্থন দেবে। এত গ্রেপ্তার করেও এদের দমাইয়া দিতে পারে নাই।’
পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক ছয় দফাভিত্তিক নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনই ধাপে ধাপে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামে পরিণত হয়। এ দাবির সপক্ষে বাঙালি জাতির সর্বাত্মক রায় ঘোষিত হয় ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বাঙালিরা বিজয়ী করে। অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর দলকে জনগণ বিজয়ী করলেও স্বৈরাচারী পাকিস্তানের শাসকরা বিজয়ী দলকে সরকার গঠন করতে না দিলে আবারো বঙ্গবন্ধু জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলন শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন :
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ছয় দফার সময়ে এটা কেবল স্বায়ত্তশাসনের দাবি, অর্থনৈতিক মুক্তির দাবি নয়- এমন বিতর্ক ছিল। তিনি বলেন, ’৭০-এর নির্বাচন ছিল ছয় দফার প্রশ্নে ম্যান্ডেট।
সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ছয় দফা মুক্তির সনদ না হলেও এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের একটা মাইল ফলক, যা অতিক্রম করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছিল।
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নূহ-উল আলম লেনিন বলেন, পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই স্বাধীন বাংলাদেশের বিষয়টি বঙ্গবন্ধুর মাথায় ছিল। তাই ছয় দফা হঠাৎ কোনো ব্যাপার ছিল না। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনীতির লক্ষ্যই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। ছয় দফার ভেতর দিয়েই প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফীন সিদ্দিক বলেন, ছয় দফাই এনে দিয়েছে আমাদের তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর দূর দৃষ্টি, অন্তঃদৃষ্টি ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এতই প্রখর ছিল, তিনি ছয় দফাকে এক দফার দাবিতে পরিণত করে বাংলার স্বাধীনতার আন্দোলনের ডাক দেন।
অনলাইন ডেস্ক 


















