নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই দুশ্চিন্তা বাড়ছে মেয়র পদে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দুই প্রার্থীর শিবিরে। স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী বিএনপি থেকে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া তৈমূর আলম খন্দকারের সমর্থকদের মধ্যে বাড়ছে গ্রেফতার আতঙ্ক। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর সমর্থকদের মূল অস্বস্তি শামীম ওসমান ও তার অনুসারীদের নিয়ে।
তৈমূর আলম খন্দকারের কর্মী-সমর্থকরা বলছেন, নাসিক নির্বাচনে প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তাদের ১৭ নেতাকর্মীকে পুরোনো ও গুরুত্বহীন মামলায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল বুধবার রাতেও দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এটা স্পষ্টতই নির্বাচন উপলক্ষে পুলিশি হয়রানি। ভোটের আগের দুই দিন গ্রেফতারের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এ কারণে তারা সবাই আতঙ্কে আছেন।
নারায়ণগঞ্জের বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, কেন্দ্র থেকে তৈমূর আলমকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা তার নির্বাচনী প্রচারণায় কাজ করে যাচ্ছেন। নির্বাচনের দিন তৈমূরের নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্য থেকেই তালিকা করা হচ্ছে। ওই তালিকায় যেসব নেতাকর্মীর নাম রাখা হচ্ছে তাদেরই গ্রেফতার করছে পুলিশ।
তৈমূরের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব এ টি এম কামাল বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের বড় সমস্যা পুলিশের হয়রানি। পুলিশ আমাদের নেতাকর্মীদের হয়রানি করছে, গ্রেফতার করেছে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি করছে। ভয়ে নেতাকর্মীরা বাড়িতে থাকতে পারছেন না। একটা আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গতকাল বুধবার রাতেও বন্দর উপজেলায় যুবদলের কর্মী আশরাফ ও আইনজীবী ফোরামের নেতা আলম প্রধানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও দুই-তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই মুহূর্তে তাদের নাম মনে নেই।’
নির্বাচনের আগে গ্রেফতারের মাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে এ টি এম কামাল বলেন, ‘আমি নিজেও একটা ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছি। যেকোনো সময় আমাকে গ্রেফতার করা হতে পারে। আসলে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা এখনো ঐক্যবদ্ধ আছি আর বিপরীতে আওয়ামী লীগের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে। তাই পুলিশ আমাদের নেতাকর্মীদের পুরোনো বিভিন্ন মামলার গ্রেফতার ও হয়রানি করছে।’
মেয়র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, ‘ভোটের পরিবেশ ভালোই ছিল। কিন্তু পুলিশ আমার নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে গভীর রাতে হয়রানি করছে। আমার কর্মী-সমর্থকরা যখন প্রচারণা চালাচ্ছে তখন পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে।’
এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে নির্বাচনী প্রচারে নেমে তৈমূর বলেন, ‘সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে পুলিশ। এটা অব্যাহত থাকলে ভোটের পরিবেশ নষ্ট হবে। গত কয়েক দিনে জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়কসহ ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিদেশি দূতাবাসের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তৈমূর বলেন, ‘বিদেশি দূতাবাসে যারা আছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ, আপনারা নির্বাচনের দিন মাঠে থাকুন।’
দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করুন। পুলিশকে জিজ্ঞাসা করুন, কেন তারা আমার নেতাকর্মী ও সমর্থকদের হয়রানি করছে।’
এদিকে সরকার দলীয় মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর সমর্থক ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশের অভিযোগ, শামীম ওসমানের সমর্থকদের যে অংশটি প্রচারণায় নেমেছে তারা ভেতরে-ভেতরে আইভীর বিপক্ষে আর স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে। বিভিন্ন জায়গায় শামীম ওসমানের অনুসারীরা গোপনে তৈমূরের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন তারা। এছাড়া শামীমের সহযোগী জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ কোনো নেতা আইভীর পক্ষে মাঠে নামেননি বলেও জানান তারা।
আইভীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দায়িত্বে থাকা নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণার আর মাত্র একদিন বাকি আছে। এখন মাঠে নামলেই কী আর না নামলেই কী। শামীম ওসমানের অনুসারীদের একটা অংশকে প্রচার চালাতে দেখা গেছে। কিন্তু নগর আওয়ামী লীগের অনেক সিনিয়র নেতা (শামীম ওসমান গ্রুপ) মাঠে নেই। তারা যুক্ত না হলেও আমরাই জিতব। প্রচারণায় আমরা তেমন সাড়াই পাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচারে নামার চেয়ে বড় কাজ হচ্ছে দায়িত্ব নেওয়া। একইসঙ্গে সেটা বাস্তবায়ন করা। সেটা করতে আমরা তাদের দেখছি না।’
এদিকে বৃহস্পতিবার বিকেলে আইভীর পক্ষে নির্বাচনী পথসভা করেন শামীম ওসমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা। নারায়ণগঞ্জ শহরের শহীদ মিনারে আয়োজিত সভায় খোকন সাহা বলেন, ‘নেত্রী (শেখ হাসিনা) আইভীকে মনোনয়ন দিয়েছেন। তিনি আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন তার পক্ষে কাজ করতে। আমরা ঘরে বসে নেই। কাজ করছি, কাজ করাচ্ছি। নেত্রী প্রার্থী নির্বাচনে কোনো ভুল করেননি। আমাদের কিছু নেতা মাঠে নেমেছে দলকে বিতর্কিত করার জন্য।’
আজ নাসিকের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে নির্বাচনী প্রচারণাকালে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, আমি তো সারাদিন ব্যস্ত। আমি কোনো সহিংসতার সঙ্গে জড়িত না। কখনো কাউকে বলিনি ওকে ধরেন, ওইটা করেন। আমি চাই ভোট কেন্দ্র যেন পরিষ্কার থাকে, কোনো সন্ত্রাসী যেন ঝামেলা লাগাতে না পারে। ভোটাররা যেন ঠিকমতো ভোট দিতে যেতে পারেন। প্রত্যেক নির্বাচনের আগে এমন পরিস্থিতি হতেই পারে। এজন্য প্রশাসন সচেতন, তারা এ বিষয়গুলো দেখভাল করবে। আমি আমার ভোটারদের বলব, তারা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে যাবে।
নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কা আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আইভী বলেন, ‘আমি সহিংসতার বিপক্ষে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আমার সম্পর্কে চাচা। আমাদের বাসায় তার অনেক আগে থেকে যাতায়াত রয়েছে। তার সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। কিন্তু ভোটযুদ্ধে আমরা প্রতিপক্ষ।’
আইভী বলেন, ‘সহিংসতা হলে আমারই ক্ষতি হবে। আমার যে কেন্দ্রগুলো জমজমাট, ভোট বেশি, সেখানে অন্যরা সমস্যা করতে পারে। যাতে আমার ভোটাররা কেন্দ্রে না আসতে পারে। আমি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলেছি। তারা যেন সজাগ থাকে সেটা বলেছি।’
কেন্দ্রীয় নেতারা নির্বাচন প্রভাবিত করার জন্য এখানে আসছে এমন অভিযোগের জবাবে আইভী বলে, ‘ঢাকা থেকে নির্বাচনী পরিবেশ পর্যবেক্ষণে এসেছে তারা। এখানে কোনো ঝামেলা হচ্ছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণ করছে। তারা আমার জয় নিয়ে শঙ্কিত নয়, কখনো ছিল না। তাই প্রভাবিত করার কিছু নেই।’
আগের নির্বাচনগুলোর চেয়ে এই নির্বাচন কঠিন হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আইভী বলেন, ‘সবগুলো নির্বাচনই চ্যালেঞ্জিং ছিল। এই নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ একটু বেশি। এর বিভিন্ন কারণ রয়েছে।’
তৈমূর বলেন, নারায়ণগঞ্জে যদি জনতার রায়ের মাধ্যমে আশার প্রতিফলন ঘটে, তাহলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। নির্বাচন কমিশনকে আমরা অত্যন্ত আস্থার সঙ্গে অনেকগুলো অভিযোগ করেছিলাম, সেগুলোর ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং সে সব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এটা থেকে বোঝা যায় নির্বাচন কমিশন ঠুঁটো জগন্নাথ।
তিনি আরও বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক তার কিছু সঙ্গী নিয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি অবশ্য বলেছেন, তিনি নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে যাননি। কিন্তু তার বক্তব্য ও দেখা করতে যাওয়ার সময়ের সঙ্গে কোনো সমন্বয় নেই। প্রথমত তিনি নির্বাচনের আগে কোনোভাবেই প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না। তিনি নারায়ণগঞ্জের নাগরিকও নন। এটা আইনগনভাবে আমি অন্যায় মনে করি। তিনি জনমনে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছেন। এমন একজন উচ্চ পর্যায়ের সম্মানিত নেতার কাছ থেকে আমরা এটা আশা করি না।
নির্বাচন কমিশন ঠুঁটো জগন্নাথ : তৈমূর
তৈমূর বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জনগণ সন্দিহান হয়ে পড়েছে। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, নারায়ণগঞ্জের মানুষ প্রত্যাশা করে আপনি এ দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক হয়ে নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনকে নির্বিঘ্ন, স্বচ্ছ এবং সুন্দরভাবে করার জন্য ব্যবস্থা নেবেন।
তিনি বলেন, গুজব ছড়ানো হচ্ছে- আমি নাকি বসে পড়ব। বসে পড়ার জন্য নির্বাচনে নামিনি। নির্বাচন করার জন্য নেমেছি। আমি একটা দল করি। আমি বিএনপির একজন সক্রিয় সদস্য। এই দলের জন্য রাজপথে গুলিবিদ্ধ হয়েছি। মিডিয়াতে দেখেছেন পুলিশ কতবার শারীরিকভাবে নির্যাতিত করেছে। তখন আমি দলের ক্যান্ডিডেট ছিলাম। নেত্রীর নির্দেশে আমি সরে দাঁড়াই। আজ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করিনি কেন আমাকে সরিয়ে দেওয়া হলো। কারণ, আমি মনে করি, আমি দল করি, দলের প্রতি আমার অনুগত থাকা দরকার। ২০১৬ সালে আমাকে মনোনীত করা হলেও আমি নির্বাচন করিনি। শহরবাসীর দুর্ভোগ লাঘবের জন্যেই আজ আমাকে নির্বাচনে নামতে হয়েছে।
উল্লেখ্য, এবার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী মোট ছয়জন। তারা হলেন– আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিন, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা মো. মাসুম বিল্লাহ এবং বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির প্রার্থী মো. রাশেল ফেরদৌস।
আগামী ১৬ জানুয়ারি নাসিক নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
অনলাইন ডেস্ক 















