ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আনন্দ-উদ্দীপনা ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে গতকাল পালিত হলো শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমী। আজ দুর্গোৎসবের শেষ দিন। পালিত হবে বিজয়া দশমী। দেবী দুর্গা মর্ত্য থেকে আবারও কৈলাশে ফিরে যাবেন। সন্ধ্যায় হবে প্রতিমা বিসর্জন।
গতকাল সকালে সারা দেশের পূজা মণ্ডপগুলোয় মহানবমী বিহিত পূজা প্রশস্তা ও ব্রতোপবাস অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্র ও চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে দেবীকে আসন, বস্ত্র, নৈবেদ্য, স্নানীয়, পুষ্পমাল্য, চন্দন, ধূপ ও দীপ দিয়ে পূজা করা হয়। পূজা শেষে মায়ের চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেন ভক্তরা। সাধারণত মহা অষ্টমীর শেষ এবং মহানবমী তিথির সংযুক্ত সময়ে সন্ধিপূজা অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ কারণে সন্ধিপূজা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই সন্ধিক্ষণেই দেবী দুর্গার হাতে অসুর বধ হয়েছিল।
দুর্গা দেবীকে বিদায় জানানোর আগে শেষবারের মতো আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠেছিল সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
সকালে বিহিত পূজার মাধ্যমে শুরু হয় নবমী পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পুরাণ মতে, এই তিথিতে দেবী দুর্গার আশীর্বাদ নিয়ে লঙ্কার রাজা রাবণকে বধ করেছিলেন দশরথ পুত্র শ্রীরামচন্দ্র। এছাড়া ১০৮টি নীলপদ্ম দিয়ে দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন রামচন্দ্র। তাই এ মহানবমীতে ষোড়শ উপাচারের সঙ্গে ১০৮টি নীলপদ্মে পূজিত হয়েছেন দেবী দুর্গা। নবমী সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয়েছে সন্ধিপূজা। মহিষাসুর বধের সময় দেবী দুর্গা প্রচণ্ড ক্রোধে কৃষ্ণবর্ণ রূপ ধারণ করেছিলেন। তাই পূজার এ আচারের সময় দেবীকে চামুণ্ডা রূপে পূজা করা হয়েছে।
শাস্ত্রে আছে, নবমী পূজার মাধ্যমে মানবকুলে সম্পদলাভ হয়। শাস্ত্র অনুযায়ী, শাপলা, শালুক ও বলিদানের মাধ্যমে গতকাল দশভুজা দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নীল অপরাজিতা ফুল নবমী পূজার বিশেষ অনুষঙ্গ। নবমী পূজায় যজ্ঞের মাধ্যমে দেবী দুর্গার কাছে আহুতি দেয়া হয়। ১০৮টি বেল পাতা, আম কাঠ, ঘি দিয়ে এই যজ্ঞ করা হয়। পূজা শেষে যথারীতি অঞ্জলি। বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপে গতকালও ছিল ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ভিড়। অনেক রাত পর্যন্ত চলেছে প্রতিমা দর্শনের পালা। কারণ মহানবমীর দিনটি ছিল দেবীকে প্রাণভরে দেখার দিন।
তবে আনন্দের মধ্যেও ছিল কিছুটা বিষাদের সুর। কারণ আজই দেবী দুর্গাকে বিসর্জন দিতে হবে। দুর্গোৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমীতে সকালে দুর্গাদেবীর দশমী বিহিত পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জন হবে। এরপর শোভাযাত্রাসহকারে অশ্রুসিক্ত চেখে প্রতিমা বিসর্জন করা হবে। এভাবেই শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপ্তি হবে। ভাঙবে পাঁচদিনের মিলনমেলা।
বিজয়া দশমী উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির দিন। এ উপলক্ষে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পক্ষ থেকে বিকেলে বিজয়া দশমীর বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা হবে।
শাস্ত্র মতে, দুর্গোৎসবের ষষ্ঠী থেকে মহানবমী পর্যন্ত প্রতিমার পূজা করা হয়। তবে বিজয়া দশমীর দিন বিসর্জনের মধ্যদিয়ে প্রতিমাকে নিরাকার করা হয়। দেবী তখন আবার ভক্তদের হৃদয়ে আসন নেন। পৃথিবী আসুরিক শক্তিমুক্ত হয় বলে সবাই তখন আনন্দ আলিঙ্গন করেন। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সবাই বিজয়ার আনন্দ উপভোগ করেন।
করোনার সংক্রমণ কম থাকলেও এ বছরও বিজয়ার শোভাযাত্রা হবে না। তাই পূজার সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমা বিসর্জন করা হবে। তবে আজ জুমার নামাজ থাকায় নামাজের সময় দুপুরে বিসর্জন অনুষ্ঠান করা হবে না। বিকাল ৪টা থেকে শুরু হবে প্রতিমা বিসর্জন। এর আগে বিবাহিত নারীদের সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে হবে দেবী বরণ।
দুর্গাপূজায় সর্বশেষ রীতিটি হচ্ছে ‘দেবী বরণ’। রীতি অনুযায়ী, সধবা নারীরা স্বামীর মঙ্গল কামনায় দশমীর দিন সিঁদুর, পান ও মিষ্টি নিয়ে দুর্গা মাকে সিঁদুর ছোঁয়ান। দেবীর পায়ে সিঁদুর ছোঁয়ানোর পর সেই সিঁদুর প্রথমে সিঁথিতে মাখান পরে একে-অন্যের সিঁথি ও মুখে মাখেন। মুখ রঙিন করে হাসিমুখে মাকে বিদায় জানানোর জন্যই এই সিঁদুর খেলা। ভক্তদের বিশ্বাস, দুর্গা আগামী বছর আবারো সঙ্গে করে শাঁখা সিঁদুর সঙ্গে নিয়ে আসবেন। সেই শাঁখা সিঁদুর ধারণ করেই স্বামীর মঙ্গল হবে।
দেবী দুর্গা এবার মর্ত্যলোকে এসেছিলেন ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে। এর ফল হচ্ছে ছত্রভঙ্গ। আর দেবী সপরিবারে স্বর্গালোকে বিদায় নেবেন দোলায় (পালকি) চড়ে। যার ফল হচ্ছে মড়ক। দেবীর আসা ও যাওয়ার লক্ষণ শুভ না হলেও ভক্তের বিশ্বাস, দেবী মঙ্গলময়ী। তিনি জগতের মঙ্গলই করবেন। সন্তানদের আশীষ দেবেন দু’হাত ভরে। বিজয়া দশমী উপলক্ষে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ অন্যান্য বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিও স্টেশন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা স¤প্রচার করবে। জাতীয় দৈনিকগুলোও এ উপলক্ষে রেখেছে বিশেষ আয়োজন।
শাস্ত্রমতে, বিজয়া দশমীর দিনে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়েই মা দুর্গা তার সন্তান কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীসহ কৈলাশে স্বামীর গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন।
অনলাইন ডেস্ক 


















