প্রতিদিনের মৃত্যু ও সংক্রমণের গতিও একই বার্তা দিচ্ছে। গতকালও সরকারি হিসেবে করোনায় প্রাণহানি হয়েছে ২২০ জনের। এর বাইরে করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরো দুই শতাধিক মানুষ। নমুনা পরীক্ষায় পাওয়া সংক্রমণও আগের দিন থেকে ১ হাজার ৮৯৪ জন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৭৬৮ জনে।
নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ২৪ শতাংশে- যা আগের দিন ছিল ২৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এমন সংকটময় সময়ে এসেও সরকার ঈদ উৎসব ও ঈদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে ১৫ জুলাই থেকে লকডাউন শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
করোনায় মৃত্যু ও সংক্রমণ ভয়ঙ্কর রূপ নিলেও পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চলমান লকডাউনকে শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে ঈদের পরদিন ২২ জুলাই পর্যন্ত ৮ দিনের জন্য কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তে লকডাউন শিথিল করা হচ্ছে।
এ সময় অর্ধেক আসন খালি রেখে সারা দেশে চলবে গণপরিবহন (বাস-ট্রেন-লঞ্চ)। চালু হবে কোরবানীর পশুরহাট। খুলবে দোকাপাট-শপিংমলও। বিধিনিষেধ সুস্পষ্ট করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মঙ্গলবার প্রজ্ঞাপন জারি করবে বলে তথ্য বিবরণীতে জানিয়েছে তথ্য অধিদফতর। তবে আগামী ২৩ জুলাই থেকে আবার কঠোর লকডাউন আরোপ করা হবে বলেও জানা গেছে।
এদিকে চলমান কঠোর লকডাউনের ১২ দিনেও করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মহামারী পরিস্থিতি করুণ হয়ে উঠতে পারে বলে গত রবিবার আশঙ্কা প্রকাশ করেন খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র রোবেদ আমিন।
তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতি’ বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, করোনার ভয়াবহতা যখন দিনদিন অবনতির দিকে যাচ্ছে তখনই লকডাউন শিথিল করা সর্বনাশের দিকে টেনে নিয়ে যাবে- যা এক সময় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ একটি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, সংক্রমণ দিন দিন বাড়ছে। আগামী দিনগুলোতে এই সংক্রমণ আরো খারাপ হতে পারে। এই অবস্থায় আসছে ঈদে মানুষ দলে দলে বাড়ি গেলে, জনসমাগম করে কোরবানির পশুসহ অন্যান্য জিনিসপত্র কেনাকাটা করলে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, করোনা ঊর্ধ্বগতির দিকে এখনো চলমান রয়েছে। এই অবস্থায় কঠোর লকডাউন বাস্তবায়ন ও করোনা পরীক্ষা বাড়ানোর বিকল্প নেই। এই অবস্থায় লকডাউন শিথিল করার অর্থ হলো করোনার অবাধ বিস্তারের সুযোগ করে দেয়া। এর মধ্য দিয়ে মানুষের মৃত্যু বাড়বে, ভোগান্তি বাড়বে এবং অবস্থা আয়ত্বের বাইরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র রোবেদ আমিন বলেন, সংক্রমণের সংখ্যা কিছুতেই কমছে না। যে হারে দেশে সংক্রমণ বাড়ছে, তাতে আগামী সাত থেকে ১০ দিন পর আর হাসপাতালে শয্যা পাওয়া যাবে না। গতকালও (শনিবার) রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকায় নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ ছিল। এমন পরিস্থিতিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ঘোষিত কঠোর বিধিনিষেধ যারা অমান্য করছেন, তাদেরকে আরো কঠোর আইনের আওতায় আনার অনুরোধ করে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একাধিক কর্মকতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামনে কোরবানির ঈদ। বসবে পশুরহাট। মানুষ কোরবানির পশু কিনতে বাজারে যাবে। তাই এই সময়ে লকডাউন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক নিয়মেই এটি বড় ধরনের চাপ। এছাড়াও স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঈদের সময় শত প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে মানুষ বাড়ি যেতে মারিয়া হয়ে উঠে। ঘরমুখো মানুষের চাপ সামাল দিয়ে যাত্রা নির্বিঘ্ন করতেই অর্ধেক আসন খালি রেখে গণপরিবহন চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। রোজার ঈদে মানুষজন যেভাবে বাড়ি গিয়েছেন, সে বিষয়গুলোকে এবার চিন্তায় রেখেছেন সরকারের নীতি নির্ধারকরা। তাই গণপরিবহন খুলে দেয়াকে অপেক্ষাকৃত ভালো সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন তারা।
রোজার ঈদে বাসসহ সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ রেখেছিল সরকার। কিন্তু এসব বাধা উপেক্ষা করে ঈদের আগে ঘরমুখী হয় মানুষ। ফেরিঘাটে ঘরমুখী মানুষের ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেয়েছিল সরকার। কর্তৃপক্ষের অনুরোধ তোয়াক্কা না করে বাড়িমুখী হয়েছিল লাখ লাখ মানুষ। গত ১২ মে মাদারীপুরের বাংলাবাজারে দুটি ফেরি থেকে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে ভিড়ের চাপে পাঁচজনের মৃত্যুও হয়। ওই ঘটনায় পদদলিত হয়ে আহত হয় অর্ধশতাধিক। এসব ঘটনা এড়াতেই এবারের ঈদে গণপরিবহন চালু রাখতে চাচ্ছে সরকার।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, গ্রামের গরিব মানুষ যারা সারা বছরে পালিত পশু বিক্রির জন্য কোরবানির এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করে, সেদিকটি বিবেচনায় নিয়ে চলমান লকডাউন শিথিল করা হয়েছে।
ট্রেনের টিকিট কাটতে হবে অনলাইনে: আগামী ১৫ জুলাই থেকে সকল স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে ট্রেন চলাচল করবে বলে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন।
তিনি বলেন, ট্রেনের টিকিট শুধু অনলাইনে পাওয়া যাবে। কাউন্টারে কোনো টিকিট দেয়া হবে না। তবে শুধু কমিউটার ট্রেনগুলোর টিকিট কাউন্টারে পাওয়া যাবে। ঈদের টিকিট বিক্রি কবে থেকে শুরু হবে তা পরে জানিয়ে দেয়া হবে।সূত্র: মানবকণ্ঠ
Reporter Name 




















